গণপরিবহনে নৈরাজ্য-২

সংরক্ষিত আসন চাইলেই ‘আপত্তি, কটাক্ষ, খোঁচা’

তানিয়া আক্তার, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০৯ জুলাই ২০১৯, ১০:২৮

সাবিহা সিঁথি। ঢাকার একটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়েন। বাসে করে ফার্মগেট থেকে মৌচাক যাওয়ার পথে সংরক্ষিত আসনে বসতে চাওয়ায় পুরো বাসের যাত্রীদের কটাক্ষ আর অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে।

ঢাকা টাইমসকে সিঁথি বলেন, ‘বাসে ওঠেই দেখি সংরক্ষিত সব আসনগুলোতেই বসে রয়েছে পুরুষেরা। বাসে একমাত্র নারী শুধু আমি। অথচ উঠতে বলায় একজন পুরুষ যাত্রী কুতর্ক শুরু করে দেন। পরে পুরো বাসেই সেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সমঅধিকার থেকে শুরু করে একেকজনের একেক যুক্তি শুনতে শুনতে দাঁড়িয়েই মৌচাক আসতে হলো। ভীষণ অপমানিত হয়েছিলাম সেদিন।’

এভাবে বাসে সংরক্ষিত নারী আসনে বিশেষ করে লোকাল বাসগুলোতে পুরুষ যাত্রীরা ভীষণভাবে আপত্তি তুলছে প্রায়ই। চাপের মুখে মেয়েদেরকে আসন ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেও কটূ কথা বলছে তারা প্রায়ই।

বাসে যৌন হয়রানি আর স্পর্শকাতর স্থানে হাত বুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা তো আর বিরল নয়। কিন্তু চলতে হবে, তবু এসব শারীরিক লাঞ্ছনা আর কটূক্তি উপক্ষা করেই বাসে চড়েন নারীরা।

বড় বাসে নয়টি আর ছোট বাসে চার থেকে ছয়টি আসন নারী শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত থাকার কথা। অর্থাৎ এগুলোতে কেবল মেয়েরাই বসবে। তবে বাকি যেকোনো আসনেও তাদের বসার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়নি। কিন্তু বাসগুলোতে প্রায়ই পুরুষ যাত্রীদের কেউ কেউ নারীদের সংরক্ষিত আসনের বাইরে অন্য আসনে বসা নিয়ে বিতর্ক তুলতে দেখা যায়। বিশেষ করে সংরক্ষিত আসনে বসে থাকা যাত্রীদের উঠে যেতে বললেই অনেক সময় কটূক্তি আর ‘পুরুষ আসনে’ বসার খোঁটা শুনতে হয়।

তাও বাসে উঠা গেলে হতো।

‘মহিলা সিট নাই, উঠেন কেন’ বলে চালকের সহকারীর ধমক না শুনে এই শহরে যাতায়াতের উপায় নেই বললেই চলে। সেই সঙ্গে বাসের ভেতরের যাত্রীদের চিৎকার, ‘ওই সিট নাই, মহিলা উডাস কেন?’। যেন নারীরা চলবে না।

পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০ বছরে যত ছেলের কর্মসংস্থান হয়েছে, তার চেয়ে বেশি হয়েছে মেয়েদের। ফলে তাদের আগের চেয়ে বেশি বাইরে যেতে হচ্ছে, বাসেও চড়তে হচ্ছে। কিন্তু নারী যাত্রী বাড়লেও তাদের জন্য নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের গবেষণা বলছে, গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। নারীরা মনে করেন, কাগজে কলমে তাদের জন্য আসন সংরক্ষণ হলেও এর প্রয়োগের অভাবের কারণে এই হয়রানি বেশি।

গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে মোহাম্মদপুর থেকে পরীস্থান পরিবহন লিমিটেডের বাসে উঠতেই নজরে এল নারী আসন পুরুষদের দখলে। এরমধ্যে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী যাত্রী উঠলে সংরক্ষিত আসন না পেয়ে তিনি পেছনের সারিতে গিয়ে বসেন। পুরো বাসে মাত্র তিনজন নারী থাকলেও দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন তারা।

সহকারী ভাড়া তুলতে এলে সংরক্ষিত আসন থাকার পরও নারীদের দাঁড়িয়ে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করতেই তেঁতিয়ে উঠে বলেন, ‘মাইয়্যা দেখলে উঠব ক্যান?  সবাই তো টাকা দেয়।’

বিকাল চারটার দিকে আগারগাঁওয়ের তালতলায় দাঁড়িয়ে থাকা নারী যাত্রীদের বাসগুলো নিচ্ছিলই না। অথচ পুরুষরা ঠিকই উঠছেন, নামছেন বাসে।

বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর খাজা বাবা পরিবহনের একটি বাস থামতেই দেখা গেল, নারী আসনগুলোতে পুরুষরা বসে। সেই আসন পাবার আশায় পাশের চল্লিষোর্ধ্ব নারী ভিড় ঠেলে জোর করে উঠতে চাইলেন। কিন্তু কটূক্তি করে স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়ে প্রায় ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দিলেন সহকারী। তখন বাসের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল অসংখ্য পুরুষ কন্ঠে মিলিত একটি বাক্য ‘এমনিতেই সিট নাই, মহিলা উঠাও ক্যান?’

এরপর আগারগাঁও তালতলা থেকে আয়াত পরিবহনে উঠার সুযোগ হলেও নারী আসন সংরক্ষণের কোনো প্রমাণ মেলেনি। ইঞ্জিনের বনেটের উপর সিটগুলোতে দুজন পুরুষ কমলাপুর পর্যন্ত বসেই রইলেন। অথচ পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী পুরো সময়টা দাঁড়িয়ে গেলেন।

বাসে চালকের সহকারী প্রথমে ‘বাসটি সিটিং তাই পুরুষেরা বসে আছে’ এমন বক্তব্য দিলেও পরে দাঁড়িয়ে থাকা নারীদের প্রশ্নের তোপের মুখে পড়েন। পরে বলেন, ‘বাস মালিক তো ল্যাইখ্যা দ্যায় নাই যে এইহানে মহিলারাই বসব। অহন আমরা কি করতাম?’

অথচ মোহাম্মদপুরগামী এফটিসিএল পরিবহনে নারীদের জন্য প্রথম নয়টি আসন বরাবরই খালি দেখে এসেছেন প্রায় প্রত্যেক যাত্রীরা। সকাল ১০ টায় সায়েন্সল্যাব থেকে মোহাম্মদপুরগামী এক পুরুষ সহযাত্রী বলেন, ‘উঠার সময়ই সামনের তিনটি সারি ছেড়ে অন্য সিটে বসি। প্রতিদিন সবাইকে দেখে নিজের মধ্যেও একরকম সহজাত অভ্যাস হয়ে গেছে।’

ঢাকায় বেড়ে ওঠা একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাবিহা সিঁথি বলেন, ‘এই রুটে বেশিরভাগ বাস বিশেষ করে রাজা সিটি পরিবহনের বাসগুলোতে নারীদের সিট নিয়ে কখনোই খুব ঝগড়া করতে দেখিনি। যদিও সংরক্ষিত সিটগুলো ফাঁকা থাকলে পুরুষেরা বসে। তবে নারীদের কেউ এলেই বিনাবাক্যে ছেড়ে দেয়। এটা এমন আহামরি কোনো নিয়ম মনে হয় না।’

গণপরিবহনে এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা কমবেশি সব নারীদেরই রয়েছে। আর এই ভোগান্তি কমাতে নারীদের জন্য নির্ধারিত আসনে পুরুষ যাত্রী বসলে বা বসতে দিলে এক মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার বিধান যুক্ত করে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৭-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। কিন্তু আইন কমিশন থেকে বিধানটি নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি হাজী আবুল কালাম বলেন, ‘বাস ছাড়ার সময়ই নারীরা উঠেন তবে তো সিট পাবেন। তবে নারীদের পাওয়া না গেলে সেই সংরক্ষিত সিটগুলো পুরুষদেরকে বসিয়ে দেওয়া হয়।’

সংরক্ষিত সিটে বাস চালক ও হেলপাররা পুরুষদের কেন বসতে দেন এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘খালি যাবে নাকি...ব্যবসা পোষাবে কীভাবে?’

বাসে দাঁড়িয়ে থাকাই যৌন হয়রানির অন্যতম কারণ মনে করেন অনেক নারী। সংরক্ষিত নারী আসনে পুরুষদের বসতে না দেওয়া কিংবা নারী আসার পর আসনগুলো খালি করে দিতে হেলপারদের ভাষা কেমন হওয়া উচিত সে সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দরকার বলেও মনে করেন তারা।

সড়ক অব্যবস্থাপনা ও যাত্রীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘নারী যাত্রীদের জন্য অবশ্যই নির্ধারিত আসনগুলো খালি রাখা উচিত। আরেকটি বিষয়ে পরিবর্তন আনা দরকার। ইঞ্জিনের তপ্ত বনেটের উপর থেকে সিটগুলো সরাতে হবে। সেখানে বসে থাকাই কষ্টের। এছাড়া উঁচু বিধায় উঠে বসতেও ঝামেলা। কখনো কখনো বাসচালক লুকিং গ্লাস দেখতে সমস্যা হওয়ার পাশাপাশি মনোযোগও নষ্ট হয়।’

সামাজকর্মী খুশি কবির ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এদেশে আইন হলে কেউ মানতে চায় না। বাসে সংরক্ষিত আসনের বিষয়টিও এমন। যতই বাস মালিকদের অনিয়ম থাকুন এ ব্যাপারে তাদের কঠোর হতেই হবে। শুধু বসতেই দেয় না এমন নয়, নারীদের উঠতেই দেয় না। এ ব্যাপারটার সুনিশ্চিত সমাধান করতেই হবে।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই রাব্বানী বলেন, ‘আমি নিজে অনেক বাসে গেছি। সেখানে সংরক্ষিত আসন নিয়ে কোনো ঝামেলা ছিল না। যদি কোনো অনিয়ম হয় তবে ওই গাড়ি সম্পর্কে লিখিত অভিযোগ করলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেব।’

ঢাকাটাইমস/৯জুলাই/টিএ/এমআর

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :