রিকশা নিয়ে বিপাকে রাজধানী

বোরহান উদ্দিন
| আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৯, ২১:২১ | প্রকাশিত : ০৯ জুলাই ২০১৯, ২০:৫১

বিকল্প কোনও ব্যবস্থা না করেই রাজধানী ঢাকার প্রধান তিনটি সড়কে রিকশা বন্ধের প্রতিবাদে সড়কে নেমেছে মালিক-চালকেরা। সিদ্ধান্তটি কার্যকরের প্রথমদিন সোমবার রাজধানীর কয়েক জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে প্রতিবাদ জানালেও মঙ্গলবার বড় আকারে বিক্ষোভ দেখিয়েছে তারা। ফলে মুগদা-খিলগাঁও-বাসাবো-মালিবাগ-রামপুরা-বাড্ডার মূল সড়কে যান চলাচল কার্যত বন্ধই হয়ে পড়ে। আর এ স্থবিরতার রেশ ছড়িয়ে পড়ে গোটা রাজধানীজুড়ে। আর এর জন্য ভুগতে হয়েছে রাজধানীবাসীকে। এমনকি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সও রেহাই পায়নি ভোগান্তি থেকে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মঙ্গলবার দুপুরে ওই সড়কগুলো দিয়ে কোনো ধরণের যান চলাচল করতে না পারায় বিকল্প সড়ক দিয়ে চলাচলে তৈরি হয় বাড়তি চাপ। এর পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজটের। আর জট সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় ট্রাফিক পুলিশদের।

দক্ষিণের মেয়র সাইদ খোকন রিকশা চালকদের চায়ের আমন্ত্রণ জানিয়ে আলোচনায় ডেকেছেন। তবে এ বৈঠকটি কবে নাগাদ হবে সে বিষয়ে দক্ষিণ সিটির দায়িত্বশীল কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মেয়রের প্রস্তাবে রিকশা চালক-মালিকরা তাদের দাবি মেনে নেয়ার প্রত্যাশায় আপাতত আলোচনায় যাবেন বলে জানালেও আজকেও তারা রাস্তায় নামার ঘোষনা দিয়েছে।

এদিকে যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ তিন রুটে রিকশাসহ অননুমোদিত যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রিকশা চালকদের আন্দোলন নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ঢাকার দুই মেয়র। কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে মুগদা-খিলগাঁও-বাসাবো-মালিবাগ-রামপুরা-বাড্ডার মূল সড়কে অবস্থান নিয়ে রিকশা চালকরা বিক্ষোভ করায় পুরো ঢাকাই এক রকম স্থবির হয়ে পড়েছে। ওই সড়কগুলো দিয়ে কোনো ধরণের যান চলাচল করতে না পারায় বিকল্প সড়ক দিয়ে চলাচল করায় বাড়তি চাপ তৈরী হয়েছে। ফলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। সকাল থেকে এই কর্মসূচি শুরু হওয়ায় ওই রুটের বেশিরভাগ মানুষকে পায়ে হেঁটে কর্মস্থলে যেতে হয়েছে। রিকশা চালকরা রোগি বহনকারী গাড়িও কোথাও কোথাও আটকে দিয়েছেন।

বিকল্প কোনও ব্যবস্থা না করে এভাবে রিক্সা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত কতোটা কার্যকরী সে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর বিশেষজ্ঞরাও। তাদের মতে, ঢাকায় যানজট নিরসনে প্রধান কয়েকটি সড়কে রিক্সা তুলে দেয়ায় একমাত্র সমাধান নয়। বরং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে যুগোপযোগী ও আধুনিক করাই রাজধানীবাসীর যাতায়াতে ভোগান্তি কমতে পারে।

এদিকে চলাচলে নিষেধ্বাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ বেশ কিছু দাবিতে আন্দোলন করা রিকশা চালক ও মালিকরা গতকাল হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সামনের দিকে আরো কঠোর কর্মসূচির। অন্যদিকে শুরুতে আমলে না নিলেও আন্দোলনের মুখে কিছুটা নমনীয় হয়ে রিকশা চালক ও বৈধ মালিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিয়েছেন ঢাকা উত্তরের মেয়র সাঈদ খোকন।

মেয়র বলেছেন, ‘সবাই মিলে বসে আলোচনা করে যে কোনো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। তাই আমি লাইসেন্সধারী রিকশাচালক-মালিকদের নগর ভবনে চায়ের দাওয়াত দিচ্ছি। তাদের আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমরা আলোচনা করে এ সমস্যার সমাধান করতে পারি।’

তবে তিনি আন্দোলনের গতিবিধি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের সঙ্গে রিকশার মালিক এবং কিছু অচেনা মুখও দেখা গেছে। রাস্তায় রিকশা বন্ধ করা হয়েছিল যানজট কমানোর জন্য। কিন্তু তারা রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করায় পুরো শহর স্থবির হয়ে পড়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক।’

তবে মেয়রের এই প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানিয়ে রিকশা-ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি হারুন অর রশিদ দুপুরের দিকে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ঢাকা দক্ষিণের মেয়র আমাদের চায়ের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমরা মনে করি তিনি এই সমস্যার সমাধান করবেন, আমাদের দাবি মেনে নিবেন। সেই কারণে আজকে আমরা কর্মসূচি বন্ধ রাখছি। পরে বিকাল চারটার দিকে বাড্ডা-রামপুরা রোডের অবরোধ তুলে নেয় আন্দোলনকারীরা। ফলে ওই সড়কে শুরু হয় যান চলাচল।

গত ৩ জুলাই পৃথক তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। গত রবিবার থেকে এই ঘোষণা কার্যকর হয়। যে তিনটি সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ করা হয়েছে সেগুলো হলো গাবতলী থেকে মিরপুর রোড হয়ে আজিমপুর; সায়েন্সল্যাব থেকে শাহবাগ এবং কুড়িল থেকে বাড্ডা, রামপুরা, খিলগাঁও হয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত প্রধান সড়কে। ভবিষ্যতে রিকশা চলাচল বন্ধের তালিকায় আরও সড়ক যুক্ত হতে পারে বলে আভাস দেয় কর্তৃপক্ষ।

সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধে সিটি করপোরেশনের এমন সিদ্ধান্তের পর বিক্ষোভে ফেটে পড়েন রিকশা চালকরা। এর প্রতিবাদে গত সোমবার মুগদায় সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে তারা। গতকাল মঙ্গলবার রামপুরা, বাড্ডা, কুড়িল বিশ্বরোড ও মুগদায় সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছে তারা। অনেককে রাস্তায় ক্রিকেট খেলতেও দেখা যায়।

রাস্তায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভের কারণে প্রগতি সরণি হয়ে মালিবাগ থেকে রামপুরা হয়ে কুড়িলের দিকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া মালিবাগ থেকে সায়েদাবাদ যাওয়ার সড়কেও যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। আন্দোলনকারীরা রাস্তায় আড়াআড়িভাবে রশি দিয়ে আটকে দিয়ে সড়ক বন্ধ করে দেয়। এর প্রভাব পড়েছে অন্য সড়কগুলোতে।

পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যান নগরবাসী

রিকশা চালকদের অবরোধের কারণে রাজধানীর ব্যস্ততম সড়ক প্রগতি সরণি, মালিবাগ রামপুরা হয়ে উত্তর বাড্ডা পর্যন্ত সড়কে গণপরিবহণ সহ সব ধরণের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এসময় বিপরীত দিকের সড়ক পুরোটাই ফাঁকা হয়ে যায়। বাস থেকে নেমে মানুষ পায়ে হেঁটে চলাচল করে। কুড়িল বিশ্বরোড থেকে  মোটরসাইকেলও ঢুকতে দেয়নি আন্দোলনকারীরা।  

উত্তরা থেকে মুগদা যেতে চেয়েছিলেন রিয়াদ মাহমুদ। যানবাহন না পেয়ে হেঁটেই গন্তব্যে যান। ঢাকা টাইমসকে বলেন, জরুরি কাজ থাকায় আমাকে পায়ে হেঁটেই গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। রিকশাচালকদের সড়ক অবরোধের কারণে সব ধরনের যানবাহন বন্ধ আছে। তাই বাধ্য হয়ে আমার মতো হাজার যাত্রীদের পায়ে হেঁটে যেতে হয়েছে। আধাঘন্টা সময়েরও বেশি সময় ধরে হেঁটে কুড়িল থেকে উত্তর বাড্ডা পর্যন্ত এসেছি। এখন বাকি পথও হেঁটে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় দেখছি না।

আরেকজন পথচারী বলেন, আমাদের মতো সাধারণ যাত্রীদেরই সব ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হয়। একবার ছাত্র আন্দোলন, একবার রিকশাচালকদের অবরোধ। আমরা আসলে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে চাই। আমাদের মতো অনেক সাধারণ মানুষ আছে যারা স্বল্প দূরত্বে রিকশায় যাতায়াত করে। তাদের জন্য গণপরিবহনের কোনো ব্যবস্থা না করে হঠাৎ রিকশা বন্ধ করে দেয়া হলো। 

রফিকুল ইসলাম নামে বেসরকারি একটি কোম্পানির চাকরিজীবী ঢাকা টাইমসকে বলেন, বিশ্বরোড থেকে নতুনবাজার আসতে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। বাস যেন এগোচ্ছেই না। দুই মিনিট চললে ২০ মিনিট যানজটে আটকে থাকে।

বিশ্বরোড এলাকায় জামান নামে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী জানান, তার অফিস রামপুরায়। তিনি দুই ঘণ্টা ধরে বসে আছেন। তীব্র গরমে বাসে বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত বোধ করছেন তিনি। শেষমেষ হেটেই গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হন তিনি।

এদিকে বশির উদ্দিন নামের একজন রিকশাচালক ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘দাবি মেনে না নেয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবেই। আমাদের পেটে লাথি মেরে সড়কে রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত মানি না। রিকশা চলতে দিতে হবে। আমাদের দাবি মেনে নিলে তবেই আমরা সড়ক ছেড়ে দেব।’

ঢাকাটাইমস/০৯জুলাই/ডিএম

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজধানী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :