পপির খুশির কান্নায় অন্যের আনন্দ

সিরাজুম সালেকীন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৯, ২৩:৫০ | প্রকাশিত : ১০ জুলাই ২০১৯, ১৯:৫৩

পপি আক্তার। পড়ালেখার পাশাপাশি চাকরি করতেন একটি পোশাক কারখানায়। বাবা ইদ্রিস মিয়া ১২ বছর ধরে মানসিক ভারসাম্যহীন। তিন বোনের এক বোন শারীরিক প্রতিবন্ধী। মা সুফিয়া বেগম চট্টগ্রামে মানুষের বাসা বাড়িতে কাজ করেন। এর মধ্যে পপি কুমিল্লা জেলা থেকে এ বছর পুলিশে নিয়োগ পেয়েছেন। আর নিয়োগপ্রাপ্তদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তার খুশির কান্না ছুঁয়ে গেছে মানুষকে।

মঙ্গলবার পপিকে সংবর্ধনা দেয় কুমিল্লা জেলা পুলিশ। অনুষ্ঠানে তিনি শোনান তার জীবনের গল্প। এ সময় পুলিশ সুপারসহ অনেক পুলিশ কর্মকর্তার চোখ পানিতে ভিজে যায়। এর ভিডিও সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরালও হয়েছে।

এ বছর কুমিল্লা জেলায় পুলিশ কনস্টেবল পদে ৩০৭ জনকে চাকরি দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সুপার ঘোষিত ১০৩ টাকায় চাকরি পেয়েছে ১৩৪ জন নারী ও ১৭৩ জন পুরুষ। সোমবার রাতে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের নাম ঘোষণা করা হয়।

গরিব ও মেধাবি ছাড়া অন্য কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেননি পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম। ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ‘অন্য সময় যেমন তদবির আসে বা আনুসঙ্গিক অনেক বিষয় থাকে। এবার সেগুলো কোনো তোয়াক্কা করিনি। একটা জায়গা তৈরি করে গেলাম, আগামিতে সেটা চলমান থাকুক।’

পপি আক্তার বলেন, ‘আমি কখনও আশা করিনি ১০৩ টাকা দিয়ে .....আমার চাকরি হবে। আমার মায়ের জন্য আমি হাজার দোয়া করি। আজকে মায়ের হাসি দেখে আমার প্রাণটা ভরে গেছে। মায়ের মুখে হাসি দেখে আমার যে কত আনন্দ লাগছে.... (বলে কান্না শুরু করেন)। কখনও বিশ্বাস করতে পারিনি- আমি ১০৩ টাকা দিয়ে চাকরি পাব।’

‘আমি সব স্যারেদেরকে (পুলিশ অফিসার) আমার পক্ষ থেকে সালাম ও দোয়া করি। নামাজ পড়ে সবার জন্য দোয়া করি, যাতে যত গরিব ছেলে-মেয়েরা আছে তাদের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনরা চাকরি পায়।’ এটা বলে অঝরে কাঁদতে থাকেন পপি।

পপি কুমিল্লার ভাঙ্গুরা বাজার উপজেলা শ্রীরামপুর গ্রামের ইদ্রিস মিয়ার মেয়ে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) সৈয়দ নুরুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সে (পপি) গোটা পরিবারের একমাত্র চাকরিক্ষম ব্যক্তি। একটা গার্মেন্টসে চাকরি করত। তার বাবা ১০ বছরেরও বেশি দিন ধরে মানসিক ভারসাম্যহীন। কনসটেবল নিয়োগ পরীক্ষার রেজাল্ট দেখতে আসবে সেই সামর্থ্য তার ছিল না। আট-দশবার ফোন করার পরও ফোন ধরছিল না। একবার ফোন ধরার পর যখন শুনছে লিখিত পরীক্ষায় চান্স পেয়েছে। ভাইবা দিতে আসতে হবে। এটা শুনে সেন্সলেস হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়ে। শেষে আমরা গার্মেন্টেসের ম্যানেজারকে বলে তাকে নিয়ে আসি।’

‘৩০৭ জনকে নিয়োগ দিয়েছি শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং কারও ১০৩ টাকার বেশি খরচ হয়নি। প্রথম দিক থেকে মেধাকে অগ্রাধিকার দেয়ার চেষ্টা করেছি। মাঠে বাছাই থেকে লিখিত পরীক্ষা পর্যন্ত। লিখিত পরীক্ষায় বিশেষ কোড বসিয়ে খাতা দেখিয়েছি; যাতে দৃষ্টিভঙ্গী একই থাকে।’

‘ভাইভাতে লিখিত পরীক্ষায় যারা ভালো নম্বর পেয়েছে তাদের মেধাকে বিভিন্ন ভাবে বিচার করেছি। যেমন- ভালো নম্বর পাওয়ার কারণ কী? লিখিত পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার কারণ কী? কীভাবে লিখে এসব। যেহেতু কনস্টেবল এজন্য একটা বিষয় খুব গুরুত্ব দিয়েছি। তারা কে কোন পরিবার থেকে এসেছে। সেগুলো নিয়ে স্টাডি করেছি। উত্তীর্ণদের পরিবারের বর্ণনা মন দিয়ে শুনেছি; নোট করেছি। যারা ভালো রেজাল্ট করেছে তাদের মেধা তালিকায় প্রথম দিকে এবং দরিদ্র পরিবার থেকে যারা আসছে তারা পরের ধাপে রেখেছিলাম।’

পুলিশ সুপার বলেন, ‘একটা ছেলে টোল প্লাজাতে লাইন ম্যানের কাজ করত তিন হাজার টাকা বেতনে। এই বেতনে সে পড়াশোনা করতে চাকরির পাশাপাশি। আমরা রাজমিস্ত্রির কাজ করে, রিকশা চালকের ছেলে, পিতা মারা গেছে কারও, খুবই দরিদ্র এমন অনেককে চাকরি দিয়েছি। আর সেটা করেছি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। আমরা মানবিক দৃষ্টিকোণটা দেখেছি। ভাইবা বোর্ডে যখন ওদের বক্তব্য শুনেছি তখন আমাদের চোখ দিয়ে পানি এসেছে। ’

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘একটা মেসেজ দেওয়ার চেষ্টা করেছি চাকরি পেতে মেধা এবং নিজের যোগ্যতা সর্বোচ্চ। গ্রামীণ জনপদের গরিব সন্তানগুলো চাকরি পাওয়ার প্রত্যাশা করে না। সেই ভীতিটা আমি দূর করার চেষ্টা করেছি। এটা একটা মাইলফলক হোক সেটা বলব। জায়গাটা তৈরি করে গেলাম, আগামীতে সেটা চলমান থাক।’

গত ১ জুলাই কনস্টেবল পদে এই জেলায় ছয় হাজার নিয়োগপ্রত্যাশী শারীরিক পরীক্ষায় অংশ নেন। সেখান থেকে দুই হাজার ৬৫৪ জনকে লিখিত পরীক্ষার জন্য মনোনীত করা হয়। লিখিত পরীক্ষায় দুই হাজার ৬৫৪ জনের মধ্যে ৬১০ জন উত্তীর্ণ হয়েছিল।  

ঢাকাটাইমস/১০জুলাই/এসএস/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :