চতুর জিয়া ও বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে কালিমা লেপনের অপচেষ্টা

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু
 | প্রকাশিত : ১৫ জুলাই ২০১৯, ১৮:১২

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে খুনিরা খন্দকার মোস্তাককে ক্ষমতায় বসায়ষ এই সময় জেনারেল শফিউল্লাহকে সেনাবাহিনী প্রধান থেকে সরিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত করা হয় পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কৌশলে জিয়া দেশের সবচেয়ে শক্তিধর ব্যক্তিতে পরিণত হন। এই সময় তার আশেপাশে যারা ছিলেন তারা সবাই ছিলেন পাকিস্তান ফেরত সেনা কর্মকর্তাষ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এদের কোনো ভূমিকা ছিল না এছাড়াও সাথে ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন সুবিধাবাদী বাঙালি মুক্তিযুদ্ধা সেনা কর্মকর্তাষ এদেরই সহযোগিতায় দেশে সামরিক আইন জারি করেন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমষ

সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান, বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এম জি তওয়াব ও নৌবাহিনীর প্রধান রিয়াল এডমিরাল এম এইচ খানকে ডেপুটি মার্শাল ল’ এডমিনিস্ট্রেটর করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে ক্যান্টনমেন্টের সমর্থনে এইসময় মূলত দেশের আসল ক্ষমতা ছিল জিয়ার হাতেই। তাই তিনি পরবর্তী সময়ে সায়েম ঘোষিত নির্বাচন বাতিল করে দেন। সায়েম অনেকটা পুতুলের মতো ক্ষমতায় ছিলেন। অবশেষ আর অপেক্ষা না করে ১৯৭৭ সালের ২ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সায়েমকে পদত্যাগে বাধ্য করে জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। ওইসময় জিয়ার বয়স ছিল ৪১ বছর।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালীন সামরিক বাহিনীতে তার বিরুদ্ধে কয়েকবার ব্যর্থ অভ্যুত্থান হয়েছে। এসব অভ্যুথানে অনেক সেনা অফিসারকে সামরিক কোর্টে বিচারের করে ফাঁসি দেওয়া হয়েছেষ এদের অনেকেই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধাষ বঙ্গবন্ধুর শাসন আমল থেকেই মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসার ও পাকিস্তান ফেরত অফিসারদের মধ্যে সেনাবাহিনীতে দ্বন্দ্ব ছিল। কারণ মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের বঙ্গবন্ধু সরকার যার যার পদে সিনিয়রিটি দিয়েছিলেন যা পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা সামরিক অফিসাররা গ্রহণ করতে পারেননিষ  জিয়া নিজে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও তিনি পাকিস্তান ফেরত সেনা কর্মকর্তাদের কাছে টেনে আনেন এবং এসব ব্যক্তিকে সামরিক বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল করেনষ কারণ জিয়ার মতে, ক্ষমতায় থাকতে হলে তাকে মুক্তিযুদ্ধের বিকল্প শক্তিকে পাশে রাখতে হবেষ আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তিকে কাছে আনতে হবেষ এই কারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যতদিন পাকিস্তান ফেরত সামরিক অফিসারদের আধিপত্য ও প্রাধান্য ছিল ততদিন জিয়ার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বাজাদল) শক্তিশালী অবস্থানে ছিলষ

জিয়া তার রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠালগ্নে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তিকে কাছে টানেনষ এসব পরিচিত ব্যক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক হানাদারদের সাথে হাত মিলিয়ে বাঙালিদের হত্যা, ধর্ষণসহ নানা অমানবিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেষ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে প্রতিষ্ঠিত জেনারেল জিয়ার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এসব লোককে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেষ জিয়ার দলে আসা বেশিরভাগ লোকই ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ও পাক বাহিনীর সহযোগীষ  জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তিকে পাশে রেখে মুক্তিযুদ্ধের মিথ্যা ইতিহাস ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে জনগণের কাছে বিভিন্নভাবে ছোট করে তোলার ষড়যন্ত্রে সক্রিয় ছিলেনষ

বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাসভবনে তল্লাশির মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার এই ষড়যন্ত্রষ পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা করার পরপর সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল জিয়া পুলিশকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তল্লাশি চালান- তার এই তল্লাশিতে বেরিয়ে আসে নানা মিথ্যা তথ্যষ এখানে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে পাওয়া স্বর্ণ অলঙ্কারের একটা বিশাল ভুয়া হিসাব মিডিয়ায় তুলে ধরা হয়ষ বাংলাদেশের জনগণকে জানিয়ে দেওয়া হলো যে ব্যক্তি (বঙ্গবন্ধু) একদিন মেয়েদের স্বর্ণের পরিবর্তে বেলি ফুলের মালা দিয়ে বিয়ে করার জন্য বলেছেন আজ তারই ঘরে পাওয়া গেল ভরি ভরি সোনাষ

জিয়ার এই মিথ্যা অপবাদ প্রচারের সাথে সাথেই সাড়া দিলেন মরহুম হুমায়ুন ফরীদির প্রাক্তন স্ত্রীষ সম্ভবত তার নাম মিনাষ সরকারি চাকরিজীবী এই মহিলা বর্তমানে অবসরে আছেনষ মিনা সেদিন মিডিয়ায় বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করে বলেন, যিনি আমাদের বেলি ফুলের মালা দিয়ে বিয়ে করার কথা বলেন আজ তারই ঘরে পাওয়া যায় ভরি ভরি সোনাষ যেটুকু জানি এই মহিলা এখনো জীবিত আছেনষ তিনি বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত জনৈক সচিবের স্ত্রীষ সেদিন তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কেন এধরনের কথা মিডিয়ায় বলেছিলেন তার উত্তর নিশ্চই তার কাছে আছেষ তিনি কেন সেদিন জিয়ার এই মিথ্যা অপবাদের ফাঁদে পা রাখলেন বলতে পারবেন কি?

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বঙ্গবন্ধুর কথা অনুযায়ী হুমায়ুন ফরীদি ও মিনা সেদিন বেলি ফুলের মালা দিয়ে বিয়ে করেছিলেন এবং জাতির জনক তাদের দুজনকে ব্যক্তিগতভাবে শুভেচ্ছাও জানানষ

এই সময় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা চিন্তা করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু নেতার দুই পুত্র শেখ কামাল ও শেখ জামালের বিয়ের অনুষ্ঠানে পরোটা আর মাংস দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়িত করেছিলেন- ব্যক্তিগতভাবে আমি সেদিন সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলামষ আমার সাথে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগ কমিটির সভাপতি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, আব্দুর রউফ শিকদার, মোহাম্মদ ইউনুসসহ আরও অনেকে ছিলেনষ আমরা বঙ্গবন্ধুর পা ছুঁয়ে সালাম করার সময় নেতা আমাদের পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন, আমার নগর পালরা এসেছেষ অতি সাধারণভাবে বঙ্গবন্ধু এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেনষ অথচ এমনি একজন মহান নেতার বিরুদ্ধে সেদিন জিয়াউর রহমান মিথ্যা অপবাদ প্রচার করেছিলেনষ  

তবে সেদিনের এই মিথ্যা অপবাদের বাস্তব ছিল ভিন্নষ আমার বাবা মরহুম আলী মেহেদী খান (বঙ্গবন্ধুর সিকিউরিটি অফিসার) সেদিন খুব দুঃখ কষ্ট করে বলেছিলেন, একজন সৎ, দেশপ্রেমিক মহান নেতা বঙ্গবন্ধুকে তারা এভাবে জনগণের কাছে কেন ছোট করলো? এরা কি মানুষ না অন্য কিছু? ক্ষমতায় থাকবে থাকো কিন্তু তাই বলে এত বড় একজন রাজনৈতিক নেতাকে এভাবে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে জনগণের কাছে নিচু করবে?

সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য বঙ্গবন্ধুর বাসায় বাবার দৈনন্দিন আসা-যাওয়া ছিল- বাসার ভেতরের সবকিছুই বাবার নিজের চোখে দেখা- কারণ বঙ্গবন্ধুর অন্দরমহলে বাবার যাওয়ার অনুমতি ছিলষ আর এই অনুমতি দিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুষ বাবা বললেন, সোনার পরিমাণ কী কী জিনিসের ওপর ভিত্তি করে ধরা হয়েছে তার একটা বৃত্তান্ত সাথে দেওয়া উচিত ছিলষ তাহলে জনগণ বঙ্গবন্ধুকে ভুল বুঝতো নাষ কারণ সব সোনার বেশিরভাগই ছিল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সভায় বঙ্গবন্ধুকে উপহার দেওয়া সোনার নৌকাষ এছাড়া বিভিন্ন দেশে ভ্রমণকালে ওইসব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের দেওয়া উপহারষ চতুর জিয়া এগুলোকে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সোনা বলে চালিয়ে দেনষ পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পরবর্তীতে এভাবেই  জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর পরিবার তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি নানা অপপ্রচার চালায়ষ জিয়ার বাজাদল সহ আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধবাদীরা এখনো এধরনের অপবাদ ছড়িয়ে জনগণের চোখে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করছেষ 

লেখক: জুরি স্টকহল্ম আপিল কোর্ট, ইলেক্টেড মেম্বার সুইডিশ পোস্টাল ট্রেড ইউনিয়ন স্টকহল্ম সাউথ ব্রাঞ্চ

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :