যৌন হয়রানি হচ্ছে ছেলেশিশুও

তানিয়া আক্তার, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১৬ জুলাই ২০১৯, ১১:০৬
প্রতীকী ছবি

একের পর এক ধর্ষণের খবরে মেয়েশিশু নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ স্পষ্ট। কিন্তু শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংগঠনের গবেষণা বলছে, ছেলেশিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও একইভাবে সতর্ক হতে হবে বাবা-মাকে। কারণ, তারাও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন আরও বলছে, মেয়েশিশু তার লাঞ্ছনার বিষয়টি স্বজনদের জানালেও ছেলেশিশুদের বিষয়টি জানতে অভিভাবকদের গলদঘর্ম হতে হয়। আর এই বিষয়টি শিশুটির জীবনে ভীষণভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতার জন্ম হতে পারে, আবার তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বড় হতে পারে।

একটি গ্রামে ১০ বছর বয়সী এক ছেলেশিশু ঈদে ফুফুর বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল। টিভিতে ফুফুর তরুণ দেবরের সঙ্গে কার্টুন দেখছিল সে। সেই তরুণ কার্টুন সম্পর্কিত বিভিন্ন গল্প বলার সময় হঠাৎ মুঠোফোনের পর্নোগ্রাফি মেলে ধরল শিশুটির সামনে। শিশুটি প্রথমে অনাগ্রহ থাকলেও কৌতূহল হয়ে দেখতে থাকল। আর তখনই তরুণটি দরজা বন্ধ করে ছেলেশিশুটিকে বলাৎকারের চেষ্টা করে। হতবাক শিশুটির চিৎকার করায় দরজা খুলে দিতে বাধ্য হয় তরুণটি।

রাজধানীতে সাড়ে সাত বছর বয়সী একটি ছেলে স্যালুনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সেখানকার ইলেক্ট্রিশিয়ান এক তরুণ পাশের বাসায় টিভি ঠিক করতে শিশুটিকে তার সঙ্গে নিয়ে যায়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় তার হাতে একটি টর্চ দিয়ে কাজে সাহায্য করতে বলেন। এরপর ‘তুই বস, তোর জন্য চকলেট আর চিপস এনে দেব’ বলে শিশুটির হাত তার স্পর্শকাতর স্থানে চেপে ধরেন। ছেলেটি তখন চিৎকার করে বের হয়ে আসে।

মফস্বলে বেড়ে ওঠা ১৩ বছর বয়সী অষ্টম শ্রেণিতে পড়–য়া ছেলেটি তার খালার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিল। তার বিশ^বিদ্যালয় পড়–য়া খালাতো বোনটিও ছুটিতে বাসায় আসে। খালা-খালু কর্মজীবী থাকায় বাসা ফাঁকা থাকে। সে সুযোগে বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া মেয়েটি ছেলেটির স্পর্শকাতর অঙ্গ নিয়ে বিভিন্ন কথা বলতে থাকে। ছেলেশিশুটি খুবই বিব্রত হতে থাকে। ছেলেটি আর আগাতে না চাওয়ায় তাকে নিয়ে তাচ্ছিল্য করতে থাকে।

‘তোর তো কিছুই নেই’ এমন বাক্যবাণে পুরুষত্ব নিয়ে কটাক্ষ করতে থাকে। একপর্যায়ে ছেলেটির মনে আঘাত লাগে এবং ‘দেখো আমার কী আছে’ বলে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়।

এই ঘটনার পর ছেলেটি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পড়াশোনাও তার ক্রমেই খারাপ হতে থাকে। পরীক্ষায় বরাবর ভালো ফলাফল করা ছেলেটি দুই বিষয়ে ফেলও করে বসে। একপর্যায়ে মাকে সব খুলে বলে ছেলেটি। আর এরপর মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সহায়তাও নিতে হয়েছে।

এর প্রতিটিই সত্য ঘটনা। বেসরকারি সংস্থা ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর গবেষণায় ছেলেশিশু ধর্ষণ বা ধর্ষণ চেষ্টার আরও অসংখ্য উদাহরণ আছে। বাসাবাড়িতে স্বজন, এলাকার বড় ভাই, পরিচিতজনদের দ্বারা মেয়েশিশুদের মতো ছেলেশিশুরাও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আছে অজ¯্র উদাহরণ। এর ফলে মৃত্যুর ঘটনাও বিরল নয়। কিন্তু এসব ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা একেবারেই কম। ব্যক্তিগত পর্যায়ে এ নিয়ে হাস্যরস হলেও পরিস্থিতির গুরুত্ব সেভাবে উঠে আসে না। 

‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর পরিচালক (কর্মসূচি ও পরিকল্পনা) জাহিদুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘চুপ থাকার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। তা না হলে বিকৃতদের কাছ থেকে ছেলেশিশুদের রক্ষা করা যাবে না।’

১৬ বছর ধরে শিশুদের নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতায় জাহিদুল বলেন, ‘ছেলেশিশুরা মেয়েশিশুদের মতোই ধর্ষিত হচ্ছে। কিন্তু তুলনামূলক প্রচারণা কম। আর সেটিই ধর্ষকদের জন্য এটি বড় অস্ত্র। কারণ, এই যৌন নির্যাতনকারীদের একটি বড় অংশ তাদের নিজস্ব বলয়ের ক্ষমতার প্রয়োগ করেই এ ধরনের কাজ করে থাকে। ফলে তারা ভেবেই নেয় তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই ছেলেশিশুরা যদি পরিবারে সব পরিস্থিতির কথা বলতে পারে তবেই এই ধর্ষকরা ভয় পাবে।’

‘পরিবার ছাড়া আরেকটি বড় ভূমিকা রাখে বিদ্যালয়। যদিও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যৌনতার বিষয়টি আংশিকভাবে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষকরা পাঠদানে পুরোপুরি তা নিশ্চিত করতে পারছে না। তারা যদি গল্পচ্ছলে ‘খারাপ স্পর্শ’, ‘ভালো স্পর্শ’ থেকে শুরু করে অন্যান্য বিষয়গুলো শিশুর মনে গেঁথে দিতে পারে তবে শিশুরা সচেতন হতো।

ছয় মাসে দুই মৃত্যুর তথ্য

শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ধর্ষণের কারণে দুটি ছেলেশিশুর মৃত্যু হয়েছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছে চারটি ছেলেশিশু।

সেভ দ্য চিলড্রেনের চাইল্ড রাইট গভর্নমেন্স অ্যান্ড চাইল্ড প্রটেকশনের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ ছেলেশিশুদের যৌন সুরক্ষার ব্যাপারে বেশ নির্ভার থাকে। ফলে ছেলেশিশু কার সঙ্গে যাবে, মেহমান এলে কার সঙ্গে শোবে এ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা চোখ-কান খোলা রাখে না। আর এই অবাধ মেশার সুযোগ থাকায় ছেলেশিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়।’

‘এ ছাড়া ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর মামলা করতে গেলে বিভ্রান্তিতেও পড়তে হয়। কারণ, আইনে শুধু নারী ও শিশু বলা আছে। ফলে সাধারণরা অনেকেই জানে না শিশু বলতে ছেলেশিশুকেও বোঝায়। তাই আইনে ছেলেশিশু ও মেয়েশিশু আলাদা উল্লেখ করা প্রয়োজন।’

বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ছয়টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ৪০৮টি সংবাদ বিশ্লেষণের পর এক প্রতিবেদনে ধর্ষণের পর একটি ছেলেশিশুর মৃত্যুসহ দুই শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে। আর এসব ঘটনা ছেলেশিশুর বাড়ির একেবারে আশপাশে, নিজ চত্বরেই ঘটেছে।

বিবিসির তথ্যমতে, বাংলাদেশে ছেলেশিশু ধর্ষণের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী বা পথশিশুরা প্রচুর ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। লঞ্চ বা বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, মার্কেট যেসব জায়গায় এই আশ্রয়হীন মানুষ রাতযাপন করে সেসব জায়গায় এমন ঘটনা ঘটছে।

একটি গণমাধ্যমের নিজস্ব জরিপ বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত ১০টি ছেলেশিশু ধর্ষণের ঘটনা পত্রিকায় এসেছে। ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার ছেলেশিশুদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয় ১৩টি। বলাই বাহুল্য ঘটনার খুব অল্পই আসে সংবাদ হয়ে।

জরিপের ফলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হচ্ছে অনূর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সী শিশুরা।

শিশু অধিকার ফোরাম মনে করে, বাস্তবে ছেলেশিশু ধর্ষণের সংখ্যাটা অনেক বেশি।

শিশুদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেন এমরানুল হক চৌধুরী। বর্তমানে ‘অন্তর’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থার প্রধান উপদেষ্টা। নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘পরিবার যখন ছেলে শিশুর যথাযত দায়িত্ব নিতে না পারে তখনই এমন অবস্থার তৈরি হয়। এজন্য দরকার পরিবার এবং সমাজের সমন্বয়ে সার্বিক সচেতনতা। তবে যে কারণগুলো চূড়ান্ত ঘটনার সৃষ্টি করে সেগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।’

‘রাজধানীর চেয়ে মফস্বলে বেশি ঘটে গ্রামে। তাই প্রতিটা ইউনিয়ন পরিষদে এ ব্যাপারে সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। আতঙ্কিত না হয়ে সার্বিক প্রচারণা বাড়াতে হবে।’

সমাজে ছেলেদের অবাধ বিচরণ বিকৃত রুচির মানুষের কাম চরিতার্থ করার সুযোগ তৈরি করছে বলে মনে করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তাজুল ইসলাম। তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘অনেক আগ থেকেই ছেলে শিশুরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। ছেলেশিশুরা অবাধ মেলামেশার সুযোগ পাওয়ায় তারা বিভিন্ন ধরনের মানসিকতার মানুষের সংস্পর্শে চলে যায়। এর মধ্যে কিছু মানুষের টার্গেট এই শিশুরা।’

‘যেমন, অনেক দিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন পুরুষ বা একাকী নারীর যৌন ক্ষুধার শিকার হয় তারা। এ ছাড়াও সমকামী থেকে শুরু করে পিডোফেলিয়া বা বিকৃত রুচির মানুষেরা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী ছেলেদের প্রতি দুর্বার আকর্ষণ বোধ করে। আর সমাজব্যবস্থা ও ছেলেশিশুর ব্যাপারে ব্যাপক উদাসীনতা বিকৃতদের কাম চিরতার্থ করার সুযোগ করে দিচ্ছে।’

সম্প্রতি গণমাধ্যমে ধর্ষণের প্রকাশ বেড়ে যাওয়ায় শিশুরা পরিবারের সঙ্গে বলার সুযোগ পাচ্ছে। এটা ‘ভালো লক্ষ্মণ’ হিসেবে দেখছেন এই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।

ঢাকাটাইমস/১৬এপ্রিল/টিএ/এমআর

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :