‘আমার মা নাই’

বাড্ডায় মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়েছিলেন রেনু

সৈয়দ ঋয়াদ
| আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৯, ২২:৩৭ | প্রকাশিত : ২১ জুলাই ২০১৯, ২০:২৩

রাজধানী বাড্ডায় মধ্যবয়সী নারী তাছলিমা বেগম রেনুকে পিটিয়ে হত্যার মর্মান্তিক ঘটনার পর বিষয়টির খোঁজে গিয়ে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো তথ্য মিলেছে। দুই বছর ধরে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হওয়া এই নারী স্কুলে গিয়েছিলেন তার চার বছরের মেয়েকে ভর্তির বিষয়ে কথা বলতে।

রেনুরা পাঁচ বোন এক ভাই। তিনি সবার চেয়ে ছোট। মহাখালীর ওয়ারলেস গেটে বৃদ্ধা মা আর চার বছরের মেয়ে তাসনিম তুবাকে নিয়ে থাকতেন। ১১ বছরের ছেলে তাসিন আল মাহির থাকেন তার ফুপুর সঙ্গে। 

মার কী হয়েছে, বোঝার বয়স হয়নি তুবার। সে কেবল বলে যাচ্ছিল, ‘আমার মা নাই।’ কাঁদছিল স্বজনরা। উপস্থিত গণমাধ্যমর্কীদের চোখের কোনাতেও পানির ধারা। বাবা পাশে নেই, নানি শয্যাশায়ী, এখন কী হবে শিশুটির- এই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে উঠেছে।

আগের দিন উত্তর পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় রেনুকে। প্রধান শিক্ষিকার কক্ষ থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে এনে স্কুলের মাঠে বেদম পেটানো হয় তাকে।

চার থেকে পাঁচ জন যুবক তাকে পিটিয়েছেন অজানা আক্রোশে। শত শত মানুষ দেখেছে ঘটনাটি, কেউ এগিয়ে আসেনি বাঁচাতে। এই হত্যার ভিডিও প্রকাশ হয়েছে গণমাধ্যমে। মর্মান্তিক এই দৃশ্য দেখার মতো নয়। সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়েছে তা। কিন্তু কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

পদ্মাসেতু নির্মাণে এক লাখ মানুষের মাথা লাগবে এবং সে জন্য ৪২টি দল বের হয়েছে বলে ফেসবুক-ইউটিউবে ছড়ানো উদ্ভট কথায় বিশ্বাস করেছে মানুষ। আর একের পর এক গণপিটুনি দেওয়া হচ্ছে কাউকে চিনতে না পারলেই, বিশেষ করে শিশুর পাশে থাকলেই।

রেনুকে হত্যার ঘটনায় তার ভাগিনা সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু অজ্ঞাত চার থেকে পাঁচশ জনের বিরুদ্ধে বাড্ডা থানায় হত্যা মামলা করেছেন। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, দেড় দুই বছর আগে রেনু মানসিক ভাবে অসুস্থ হন। তখন চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করা হয়। তবে মানসিক অসুস্থতার কারণে তার আচরণ অস্বাভাবিকতা ছিল। এ জন্য স্কুলের অনেকেই তাকে সন্দেহ করছিল। স্কুলের কয়েকজন অভিভাবক মহিলা তার পরিচয় জিজ্ঞেস করে। কিন্তু তিনি সব প্রশ্নের জবাব দিতে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন।

এক পর্যায়ে লোকজন তাকে ধরে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা শাহনাজ বেগমের কক্ষে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে ‘ছেলেধরা’ ‘ছেলেধরা’ রব উঠলে বাইরে থেকে একদল ছেলে ও নারী এসে রেনুকে বাইরে নিয়ে যায়। স্কুল মাঠে অভিভাবক, উৎসুক জনতাসহ অনেকে গণপিটুনি দেয়। পুলিশ তাকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তাররা সকাল ১০টা ২১ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করে।

বাড্ডা থানার উপপরিদর্শক সোহরাব হোসেন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘তদন্ত চলছে, শিগগিরই জানা জানা যাবে মূল ঘটনা।’

স্কুলের প্রধান শিক্ষক শাহনাজ বেগম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘রেনু নামের ওই মহিলা সম্ভবত স্কুলে বাচ্চা ভর্তি করানোর বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে এসেছেন। বাসা কোথায় জানতে চাইলে তিনি একবার আলীর মোড়, একবার ওয়্যারলেস গেইট বলেছেন। সেকারণেই অভিভাবকরা তাকে সন্দেহ করে। পরে আমার কক্ষে নিয়ে আসে। তার একটু পরে হৈ হৈ শব্দে একদল জনতা তাকে টেনে হিচড়ে বের করে মারতে থাকে।’

আপনি পুলিশকে ফোন করেছেন কি না জানতে চাইলে এই শিক্ষিকা বলেন, ‘এত মানুষ এসেছে, আমি কিছু বোঝার আগেই তারা তাকে জোর করে নিয়ে যায়। পরে পুলিশকে ফোন করলে তারা এসে হাসপাতালে নিয়ে যায়।’

যারা রেনুকে নিয়ে গেছে তাদের কাউকে চেনেন কি না এমন প্রশ্নে শিক্ষিকা বলেন, ‘অনেক অভিভাবক আসে নিচে থাকে। বাচ্চাদের জন্য অপেক্ষা করে। আমরা তো সবার চেহারা মনে রাখতে পারি না।’

মহাখালীর ওয়্যারলেস গেটের যে বাড়িতে নিহত তাছলিমা বেগম রেনু বসাবাস করতেন সে বাড়িতেই প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে নিড়াপত্তা কর্মী হিসেবে কাজ কারছেন রমজান আলী। রেনু সম্পর্কে জানতে চাইলে এই প্রবীণ আবেগ আপ্লুত কন্ঠে বলেন, ‘রেনু আমাদের হাতেই বড় হইছে, তার বিয়ে হইছে। তার মতো ভালো মেয়ে এলাকায় একটাও নাই। হাসি ছাড়া কথাও বলত না।’

‘তার মা খুব অসুস্থ। মায়ের সঙ্গেই সে এখানে থাকে। কিছু ছেলেময়ে পড়াতো আগে। আড়ংয়েও চাকরি করত জানি। ’

প্রতিবেশী মাজেদা বেগম বলেন, ‘রেনুরে ছোটবেলা থেকে চিনি। ওর জন্মকর্ম সবইতো এখানে। তারা শিক্ষিত পরিবার। অনেক পড়ালেখা খুব ভালো মেয়ে।

আরেক প্রতিবেশি হীরা আক্তার বলেন, ‘রেনু আপার মতো শান্তশিষ্ট মানুষের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে আর বাকি মানুষের কী হবে? তার মতো একজন ভালো মানুষ আমাদের মহল্লায় দ্বিতীয়টা  নাই। ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট পড়াতেন। তার বড় বোন নাজমা আপাও শিক্ষকতা করেন।’

ওয়্যারলেস গেটের যে বাসার তৃতীয় তলায় থাকতেন রেনু, ওই বাসার চতুর্থ তলার বাসিন্দা আবদুল আহাদ হোসেন বলেন, ‘সেদিন সকালেই রেনুর সঙ্গে আমার দেখা। জিজ্ঞেস করলাম কোথায় যাচ্ছে। জানালো একটি স্কুলে যাচ্ছে। আমি খেয়াল করিনি।’

পাশেই দাড়িয়ে থাকা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘শুনছিলাম তিনি  (রেনু) আমেরিকা চলে যাবেন তার একমাত্র ভাইয়ের কাছে। তিনি ছেলেধরা হলে এই দেশে সবাই ছেলে ধরা।’

যে স্কুলের সামনে রেনু নিহত হন সেই স্কুলের সামনে নাসির নামের এক ফল বিক্রেতা বলেন, ‘কেউ একজন চোর বলে দৌড়ানি দিলে এই দেশে তার আর রক্ষা নাই। এই মহিলা প্রধান আফার রুমে গেছে, হেরে বাইর কইরা মাইরা ফালাইলো এইডা কেমন কতা।’

আপনি দেখেছেন কি না এমন প্রশ্নে ওই ফল বিক্রেতা বলেন, ‘আমি পড়ে আইসা জটলায় মারামারি করতে দেখছি।’

ঢাকাটাইমস/২১জুলাই/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :