শশীকাহন: পৌরাণিক উপাখ্যান ফ্যান্টাসি থ্রিলার সিরিজ, পর্ব- তিন

ড. রাজুব ভৌমিক
 | প্রকাশিত : ২৭ জুলাই ২০১৯, ২২:০৯

এদিকে দেবী আজ্রিয়া আকাশপথে কাঁদতে কাঁদতে চন্দ্রগ্রহে এসে পৌঁছায়। দেবী আজ্রিয়ার অশ্রু পড়ে চন্দ্রগ্রহের বিভিন্ন জায়গা বিশাল বিশাল আগ্নেয়গিরি তৈরি হয়। আগ্নেয়গিরির গরম লাভা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বহু শশীদের অকাল মৃত্যু হয়। শশীদের বহু বাড়ি-ঘর ও ক্ষেতের ফসল ধ্বংস হয়ে যায়। পুরো চন্দ্রগ্রহে যেন এক হাহাকার সৃষ্টি হয়। শশীরা ভয়ে এদিক ওদিক দৌড়ুচ্ছে। চন্দ্রগ্রহের বাতাস শশীদের আর্তনাদে ভারী হয়ে গেছে।  কিছুক্ষণ আকাশ পথে ভাসতে ভাসতে দেবী আজ্রিয়ার একটি অশ্রু কণা হিরাসী পর্বতের উপর পড়ে। সাথে সাথে পর্বতের একপাশে বিশাল এক অগ্নিকুণ্ডের তৈরি হয়। কিন্তু দেবী আজ্রিয়া এতই আবেগের ঘোরে ছিলেন যে তিনি ভূমিতলে কি হচ্ছে তা বিন্দুমাত্রও দেখতে পায়নি। এদিকে অগ্নিকুণ্ড থেকে উৎপন্ন হওয়া আগুনের মাধ্যমে চারিদিকে সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

হিরাসী পর্বতবাসীরা সবাই দৌড়তে দৌড়তে ঋষি অখিলের আশ্রমে আসে। লাগগিন্তা রাজ্যের বড় যুবরাজ অখিলকে সবাই ঋষি অখিল বলে জানে। ঋষি অখিল দুপুরের ভোজন শেষ করে তার আশ্রমের আঙ্গিনায় একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। হঠাৎ হাঁপাতে হাঁপাতে এক হিরাসী পর্বতবাসী ঋষি অখিলকে বলল, ‘মুনিবর আমাদের বাঁচান। সব শেষ হয়ে যাচ্ছে প্রভু। হিরাসী পর্বতকে দেবী আজ্রিয়া ধ্বংস করে দিচ্ছে।’ 

অখিল উঠে দেখে বহু হিরাসী পর্বতবাসী তার আশ্রমের সামনে এসে হাজির। সবার চোখে-মুখে ভয় আর আর্তনাদ। কি হয়েছে ঋষি অখিল কিছু বুঝতে পারছে না। তখন অখিলের এক শিষ্য বিহগ্ন বলে, ‘মুনিবর, দেবী আজ্রিয়ায় আমার পুরো পরিবারকে বিনা কারনে হত্যা করেছে।’ এই বলে বিহগ্ন অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। কয়েকজন পর্বতবাসী বিহগ্নকে সেবা-শশ্রুষা করতে ব্যস্ত। কিন্তু বিহগ্নের জ্ঞান কিছুতেই ফিরছে না। 

কিছুক্ষণ পর ঋষি অখিল একটু বাহিরে তাকিয়ে দেখে পর্বতের চারিদিকে শুধু আগুন আর আগুন। তীব্র আগুনে একে একে পর্বতের সব গাছ, জঙ্গল, ও বাড়ি পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আকাশের মধ্যে দেবী আজ্রিয়া অন্যমনস্ক হয়ে গালে হাত দিয়ে বসে কাঁদছে। এ দেখে ঋষি অখিল ভীষণ ক্রোধিত হয়। সাথে সাথে অখিল তার অখিলাস্ত্র আহ্বান করে। অখিলাস্ত্র আহ্বান করার ফলে সারা আকাশ বাতাস কেঁপে উঠে। দেবী আজ্রিয়া তখনও তার শোকের ঘোরে কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। পূর্বে অখিল তার সাধনার দ্বারা চন্দ্রগ্রহের সর্বোত্তম অস্ত্র অখিলাস্ত্র তৈরি করে। অখিলাস্ত্র অনেক শক্তিশালী একটি অস্ত্র। এই অস্ত্র দিয়ে শশীরা দেবতাকেও বধ করতে পারবে। অখিল মূলত এই অস্ত্র তৈরি করে আকাশের মেঘকে আঘাত করে বৃষ্টি আনার জন্য যাতে করে গ্রীষ্মের ক্ষরায় শশীদের ফসলের জন্য বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে না থাকতে হয় বা ফসল না হওয়ার কারণ না খেয়ে থাকতে হয়।  প্রতিবছর বৃষ্টির অভাবে বহু শশীদের ফসল ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু অখিলাস্ত্র আকাশ ছুঁড়ে মারলে সাথে সাথে বৃষ্টি হয়। তাই ঋষি অখিল প্রথমে তার অখিলাস্ত্র আকাশ নিক্ষেপ করে। সাথে সাথে প্রচুর বজ্রপাত তৈরি হয় এবং ঝরঝর করে বৃষ্টি নেমে আসে। অখিলাস্ত্র আকাশে নিক্ষেপের পরপরই বৃষ্টির জলে হিরাসী পর্বতের সব আগুন নিভে যায়। দেবী আজ্রিয়া এখনও আকাশপথে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। অখিল এতে আরো ক্ষেপে যায়। 

‘দেবী!!! দুঃসাহসের একটি সীমা থাকা উচিত!!’ অখিল দেবী আজ্রিয়াকে সতর্ক করে বলল। দেবী আজ্রিয়া অখিলের কথা শুনতে পায়নি। ঋষি অখিল পুনরায় অখিলাস্ত্র আহ্বান করে এবং দেবী আজ্রিয়ার দিকে অখিলাস্ত্র ছুঁড়তে উদ্যত হয়। হঠাৎ দেবী আজ্রিয়ার দৃষ্টি নিচে পড়ে। দেবী আজ্রিয়া দেখতে পায় ঋষি অখিলের হাতে সে দেবতাদের মারণাস্ত্র অখিলাস্ত্র জ্বলজ্বল করছে। দেবী এ অস্ত্র অখিলের হাতে দেখে ভয় পেয়ে যায়। তাড়াতাড়ি দেবী আকাশ থেকে নিচে নেমে আসে। ‘দেবী!! এতক্ষণ আমরা আপনার অনেক দুর্বিচার সহ্য করেছি! আর নয়!’ ঋষি অখিল বলল। দেবী আজ্রিয়া চারিদিকের ধ্বংসস্তুপ তাকিয়ে বুঝতে পায় যে এ সবি তারই কাণ্ড। দেবী তা দেখে নিজেকে অনেক অপরাধী বোধ করে। 

‘মুনিবর, বিশ্বাস করুন, এ আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আমায় ক্ষমা করুন। দয়া করে অখিলাস্ত্র ফিরিয়ে নিন।’ দেবী আজ্রিয়া ঋষির কাছে প্রার্থনা করে বলল। দেবী তখন ঋষি অখিলকে সবকিছু বুঝিয়ে বলে। ‘আমার ভালবাসার জন্য আজ আমি সূর্য গ্রহ থেকে বিতাড়িত। পিতাশ্রী আমাকে তাজ্য করেছে। আমি সে দুঃখে নিজের অজান্তে চন্দ্রগ্রহের বিশাল ক্ষতি করেছি। আমাকে দয়া করে ক্ষমা করুন।’ সবকথা শুনে ঋষি অখিল কিছুটা শান্ত হয়। 

এর মধ্যে ঋষি অখিলের শিষ্য বিহগ্নের জ্ঞান ফিরে আসে। তার চোখের সামনে দেবী আজ্রিয়াকে দেখে বিহগ্ন ভীষণ ক্রোধিত হয়। ‘দেবী, আপনি বিনা কারনে আমার স্ত্রী ও পুত্রকে হত্যা করেছেন। কি দোষ ছিল ওদের? দয়া করে উত্তর দিন!’ বিহগ্ন দেবী আজ্রিয়াকে বলল। দেবী আজ্রিয়া তার ভুল বুঝতে পারে। তাই কিছু না বলে দেবী ব্যথিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এতে বিহগ্ন ক্ষেপে যায়। স্ত্রী ও পুত্র হারানোর বেদনায় বিহগ্ন এখন জর্জরিত। তাই বিহগ্ন তার সারাজীবনের তপস্যার ক্ষমতাবলে দেবী আজ্রিয়াকে তার স্ত্রী ও পুত্র হত্যার জন্য অভিশাপ দেয়। 

‘দেবী, আমি সারাজীবন জগতের মঙ্গলের জন্য সাধনা করেছি। আজ আপনি বিনা কারনে আমার প্রিয় স্ত্রী মোচাসি ও পুত্র কর্নদ কে মেরে ফেলেছেন। আমাকে সারাটা জীবনের জন্য স্ত্রী ও পুত্রের ভালবাসা থেকে বঞ্চিত করেছেন। আমার জীবনের সব সাধনার ফল দিয়ে আজ আমি আপনাকে অভিশাপ দিলাম। আমার অভিশাপে আপনি যাকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসেন তার বিয়োগে সারাজীবন আপনাকে কাটাতে হবে। আজ আপনি আমাকে আমার সন্তানহীন করেছেন। তেমনি আপনিও একদিন সন্তানের শোকে হাহাকার করবেন।’ বিহগ্ন বলল। দেবী আজ্রিয়া বিহগ্নের অভিশাপ শুনে মনে বড় কষ্ট পায়। রাগে দুঃখে দেবী হিরাসী পর্বত ছেড়ে চলে যায়। বিহগ্ন তার স্ত্রী ও পুত্র বিয়োগ সহ্য করতে না পেরে তৎক্ষণাৎ ঋষি অখিলের সামনে মন্ত্র-বলে দেহত্যাগ করে। এই দৃশ্য থেকে ঋষি অখিল মনে মনে প্রচণ্ড ব্যথা পায়। 

দেবী আজ্রিয়া লাগগিন্তা রাজ্যের সুমেরু বনে তপস্যা করতে চলে যায়। অন্যদিকে, লাগগিন্তা রাজ্যে শশীরা তাদের বাড়ি, ফসল, এবং আত্মীয়-স্বজন হারিয়ে মহারাজা শশাঙ্কের রাজপ্রাসাদের বাহিরে হাজির হয়। মহারাজ শশাঙ্ক অত্যধিক প্রজা-প্রিয়। লাগগিন্তা রাজ্যের প্রজাদের কাছে মহারাজ শশাঙ্ক দেবতাদের মত। মহারাজ শশাঙ্কও প্রজাদের তার সন্তানের মত ভালবাসে। প্রজাদের দুঃখের কথা শুনে মহারাজ শশাঙ্ক এক জরুরি সভা ডাকে।  সভায় শশাঙ্ক তার মন্ত্রী সিনাতিকে নির্দেশ দেয় যাতে প্রাসাদের সামনে অবস্থিত সব প্রজাদের কোন সমস্যা না হয়। মহারাজ শশাঙ্ক সভায় উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি প্রজাদের ব্যথ্যায় চরম দুখী। নিশ্চয় আমরা কোন পাপ করেছি। দেবতারা আমাদের উপরে খুশি নন। তাই হঠাৎ করে আমার রাজ্যে আগুনের গোলার সৃষ্টি। হে প্রভু, আমাদের ক্ষমা করে দিও। আমার প্রজাদের উপরে দয়া করে আর কোন অত্যাচার করবেন না। এর সাথে সাথে ঘোষণা করছি যে, আজ থেকে যতদিন আমার প্রজারা তাদের নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে না পারবে ততদিন আপনাদের সবাইকে প্রজাদের সাথে দিন কাটাতে হবে। তাদের সেবা করতে হবে। যাতে তাদের কষ্ট আর দীর্ঘ না হয়।’  মহারাজ শশাঙ্ক আরো বলেন, ‘আমিও আজ থেকে রাজপ্রাসাদে না অবস্থান করে আপনাদের মত প্রজাদের সঙ্গে দিন কাটাব। আমার প্রজাদের যাতে কোন কিছুতে অসুবিধা না হয় সার্বক্ষণিক তা দেখব। আমার ইচ্ছা আপনারা সবাই আমার সহযোগিতা করবেন।’ মন্ত্রীসভার সব সদস্য গণ রাজা শশাঙ্কের এই উদ্যোগের জন্য সাধুবাদ জানান। এক মন্ত্রী বলেন, ‘মহারাজ সত্যিই আপনি দেবতাতুল্য। আপনাকে আমরা রাজা হিসেবে পেয়ে সত্যিই ধন্য। আপনার আদেশ পালনের জন্য আমরা সবাই প্রস্তুত।’ 

সভাশেষে মহারাজ শশাঙ্ক প্রাসাদের তৈরি করা সব খাবার নিয়ে প্রাসাদের বাহিরে আসে। প্রাসাদের বাহিরে বিশাল এলাকা জুড়ে তাবু করে অনেক প্রজা এখন দিন কাটাচ্ছে। আগ্নেয়গিরির আগুন ও লাভাতে  এদের কারো বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, কারো ফসলের মাঠ ধ্বংস হয়ে গেছে, এবং কারো পরিবারের সবাই মারা গেছে। অনেক দূর্ভাগার আবার বাড়ি, ফসল, ও পরিবার সব ধ্বংস হয়ে গেছে। তাবুতে প্রজাদের কান্নায় আজ আকাশ অনেক ভারী। কিন্তু হঠাৎ সবাই তাদের প্রিয় রাজা শশাঙ্ককে খাবার হাতে দেখে কান্না থামায়। রাজা তাবুতে এসে সবার সাথে কথা বলে। তাদের খোঁজ খবর জানতে চায়। রাজা মন্ত্রী সিনাতিকে নির্দেশ দেয় প্রজাদের ক্ষয়ক্ষতির একটি লিস্ট তৈরি করার জন্য এবং জরুরী ভিত্তিতে প্রজাদের অন্যত্র পুনর্বাসন করার জন্য আদেশ দেন। মন্ত্রী সিনাতিকে মহারাজা শশাঙ্ক বলেন, ‘মন্ত্রী, প্রত্যেক প্রজার জন্য ফসল ফলানোর জায়গা সহ একটি বাড়ি করে দিবেন। আর শুনুন, পুনর্বাসন কাজে ও তাদের সুরক্ষার জন্য আমাদের দশ আজ্রিয়া সেনাদের ব্যবহার করবেন। ভুলে যাবেন না দেবী আজ্রিয়া এই দশ সেনাদের কি বর দিয়েছেন। এই দশ সেনা যখনি রাজ্যের জন্য কাজ করবে তখন তাদের প্রত্যেকের একহাজার হাতির শক্তি হবে। সে শক্তি ব্যবহার করলে প্রজাদের পুনর্বাসন কাজ তাড়াতাড়ি সম্পূর্ণ করা যাবে।’ মন্ত্রী বলল, ‘মহারাজ, আপনার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালণ করা হবে।’ এই বলে মন্ত্রী শশাঙ্ক তাবুতে কর্মরত এক সেনাকে আদেশ করে দশ আজ্রিয়া সেনাদের খবর পাঠানোর জন্য। 

এভাবে বহুদিন চলে যায়। মহারাজা ও মন্ত্রীরা প্রজাদের জন্য কাজ দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছে। দশ আজ্রিয়া সেনাদের সহায়তায় অবশেষে সব প্রজাদের জন্য পুনর্বাসন কাজ শেষ হয়। প্রজারা একে একে সবাই রাজপ্রাসাদের বাহিরের তাবু ছেড়ে তাদের নিজ নিজ জায়গাতে চলে যাচ্ছে। রাজার আদেশ অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রজার জন্য ফসল ফলানোর জায়গা সহ একটি বাড়ি করে দেয়া হয়। প্রজারা মহারাজা শশাঙ্কের উপর অনেক খুশি। শুধু প্রজারাই না, সূর্যগ্রহের দেবতাগন মহারাজা শশাঙ্কের কর্মকাণ্ডগুলো মহালয় থেকে বেশ কিছু দিন ধরে  গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। তারা শশাঙ্কের নেতৃত্বে অত্যন্ত মুগ্ধ। সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ দেবতা শিশক্র। শিশক্রু ধন-সম্পদের দেবতা। মহারাজার শশাঙ্কের প্রজাদের প্রতি ভালাবাসা দেখে দেবতা শিশক্র লাগগিন্তা রাজ্যে সব কৃষকের মাঠে মাঠে ফসলে ভরিয়ে দেয়। লাগগিন্তা রাজ্যে এখন চারিদিকে ফুল, ফল, ও ফসলে ভরা। 

মহারাজা শশাঙ্ক ও মন্ত্রী সভার সব সদস্য তাদের নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যায়। মহারাজা শশাঙ্ক রাজপ্রাসাদে কয়েকদিন বিশ্রাম নেয়। এর মধ্যে আর কোন রাজসভা বসেনি। হঠাৎ শশাঙ্কের মনে পড়ে তার রাজসভায় ঘোষিত পুত্র নিম্বের বিয়ের কথা। তিনি মহারাণী কুর্নষাকে বলেন, ‘বুঝলে রাণী, আমি এতদিনে নিম্বের বিয়ের কথা একদম ভুলে গেলাম।’ রাণী কুর্নষা বলল, ‘মহারাজ, আপনিতো প্রজাদের পুনর্বাসনে ব্যস্ত ছিলেন। তাছাড়া এসময়ে কি রাজপুত্রের বিয়ে মানায়? প্রজারা ভীষণ কষ্টে ছিল। আপনার জন্য আজ সব প্রজারা তাদের নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে গেছে। প্রজারা আমাদের সন্তানেরই মত। আপনি এক সন্তানের কথা ভুলে হাজার হাজার সন্তানের জন্য কাজ ঠিকই করে গেছেন।’ মহারাজা শশাঙ্ক বলল, ‘ঠিকই বলেছ রাণী। প্রজাদের পুনর্বাসনের কাজ শেষ। এখন ভাল একটি দিন দেখে যুবরাজ নিম্ব এবং দেবী আজ্রিয়ার বিয়ের অনুষ্ঠানটি শেষ করতে পারলে বাঁচি। এক কাজ কর রাণী, তুমি জোতিষি সরনান্দকে ডেকে পাঠাও। জ্যোতিষীকে দিয়ে ভাল দিনক্ষণ ধার্য করে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানটি শেষ করতে চাই।’ 

‘ঠিক আছে মহারাজ। আমি আজই জোতিষি কে আনার জন্য খবর পাঠাচ্ছি।’ মহারাণী কুর্নষা বলল। 

এদিকে, দেবী আজ্রিয়া লাগগিন্তা রাজ্যের সুমেরু বনে তপস্যা করছে শুনে যুবরাজ নিম্ব দেবী আজ্রিয়াকে দেখার জন্য সুমেরু বনের উদ্দেশে যাচ্ছে। সুমেরু বন লাগলিন্তা রাজ্যের একদম শেষ প্রান্তে। প্রায় তিনিদিন আকাশে উড়তে উড়তে যুবরাজ ক্লান্ত হয়ে গেছে। সুমেরু বন এখনো বহুদূরে। যুবরাজ রাজপ্রাসাদের ঈগলরথ না নিয়ে, কাউকে কিছু না বলে চলে এসেছে। শুধু এক দাসীকে বলে এসেছে যে সে সুমেরু বনে দেবী আজ্রিয়ার সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। এদিকে যুবরাজ নিম্ব ভেবেছে রাজ্যের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে যেতে যেহেতু ঈগলরথের আকাশে দুইদিন সময় লাগে। সেহেতু নিম্ব তার পাখা ব্যবহার করলে আরো দ্রুত সুমেরু বলে  পৌছতে পারবে। তাই ঈগলরথের ভরসা না করে একা একা যুবরাজ আকাশ পথে উড়তে উড়তে চলে যায়। যুবরাজ তিনদিন কোন বিশ্রাম না করে আকাশ পথে উড়তে থাকে। কিন্তু সুমেরু বনের যেন কোন দেখা নেই। অবশেষে যুবরাজ নিম্ব খুব তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে। যুবরাজ নিম্ব আকাশপথ থেকে ভূমিতলে নেমে আসে। পরণে কোন রাজ-পোশাক নেই। নিম্ব আশেপাশে কোন বাড়িঘর দেখছে না। নিম্ব হতাশ হয়ে যায়। কিছু দূর হাঁটতে হাঁটতে নিম্ব একটি পুকুর দেখতে পায়। নিম্বের অনেক তেষ্টা পেয়েছে তাই দেরী না করে তাড়াতাড়ি পুকুরের জল পান করতে শুরু করে। কিন্তু ঐ পুকুরের জল ছিল বিষাক্ত। বিষাক্ত জল পান করে নিম্বের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। কিছুক্ষণের মধ্যে নিম্ব জ্ঞান হারায়। 

ভাগ্যক্রমে ঐ সময় আকাশপথে এক কৃষকের কন্যা সন্তায়ু উড়ে যাচ্ছিল। সন্তায়ু উপর থেকে নিম্বকে দেখে বুঝতে পারে এ কোন বিদেশি হবে কারণ এ এলাকার সবাই জানে এই পুকুরটির জল বিষাক্ত। এই পুকুরে একসময় একটি বিশাল বিষাক্ত সাপ থাকত। বিষাক্ত সাপটির ছোবলে অনেকে মারা যায়। তখন সন্তায়ু তার সঙ্গীদের নিয়ে একদিন বিষাক্ত সাপটির সাথে যুদ্ধ করে মেরে ফেলে কিন্তু মৃত্যুর পর বিষাক্ত সাপটির সব বিষ পুকুরে মিশে সব জলকে বিষাক্ত করে ফেলে। তারপর থেকে কেউ এই পুকুরের জল ধরেও দেখে না। 

যুবরাজ নিম্ব তৃষ্ণার্ত ছিল তাই কিছু না বুঝে জল পান করে ফেলল। সন্তায়ু সব বুঝতে পেরে নিচে নামে। সুদর্শন নিম্বকে দেখে সন্তায়ু মুহূর্তের মধ্যে নিম্বের প্রেমে পড়ে যায়। ‘এরকম সুদর্শন পুরুষ চন্দ্রগ্রহে আছে? নিশ্চয় সে কোন বড় ঘরের সন্তান হবে।’ সন্তায়ু মনে মনে ভাবল। সন্তায়ু বিষক্রিয়া কমাতে তাড়াতাড়ি বিভিন্ন লতাপাতা দিয়ে ঔষধ বানিয়ে নিম্বের মুখে দেয়। নিম্বের জ্ঞান এখনো ফেরেনি। সন্তায়ু নিম্বকে নিয়ে তাদের বাড়িতে যায়। সন্তায়ু প্রায় চারদিন একটানা নিম্বের সেবা করে। এতে নিম্বের জ্ঞান ফিরে আসে। 

চোখ খুলে নিম্ব দেখতে পায় সন্তায়ু তার বিছানার এক কোণে বসে পাখা দিয়ে নিম্বকে বাতাস করছে। ‘কে আপনি? আমি এখানে কেন?’ নিম্ব সন্তায়ু কে বলল। সন্তায়ু তখন নিম্বকে সব খুলে বলে। ‘আপনি আমাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। তার জন্য আমি আপনার কাছে চিরঋনী থাকব।’ নিম্ব বলল। নিম্ব এখনো তার পরিচয় সন্তায়ুকে দেয়নি। নিম্ব এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেনি। সে ভাবল রাজবংশের পরিচয় দিলে যদি কোন ক্ষতি হয়ে যায়। একটু জেনে শুনে নিম্ব তার আসল পরিচয় দিবে বলে ঠিক করে। এদিকে নিম্বের জ্ঞান ফিরে আসার পর সে দেখছে কিভাবে সন্তায়ু তাকে সারা দিন ও রাতে একনিষ্ঠভাবে সেবা করে যাচ্ছে। নিম্ব সন্তায়ুর সেবাতে অনেক প্রসন্ন হয়। ‘সন্তায়ু, আমি জানি নে পূর্বে কোন পূর্ণকর্মের জন্য তোমার দেখা পেয়েছি। তুমি আমার প্রাণ দিলে। আমায় একনিষ্ঠভাবে সেবা করে সুস্থ করে তুললে। সত্যিই আমি তোমার কাছে চিরদিন ঋণী থাকবো। তোমার এ উপকারের কথা কভু ভুলবো না।’ নিম্ব বলল। নিম্বের কথায় সন্তায়ুর চোখের জল পড়ছে আর সে বারবার তা মুছচে।  ‘কি হল সন্তায়ু? আমি কি খারাপ কিছু বললাম?’ নিম্ব বলল। ‘না গো বিদেশী, শুধু আপনাকে সারাজীবন সেবা করার ভাবনায় দুচোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না।’ সন্তায়ু চোখের জল মুছতে মুছতে বলল। 

নিম্ব বুঝতে পারে যে সন্তায়ু তাকে ভালবাসে। তার সঠিক পরিচয় না জেনেও তাকে এত সেবা করল। নিম্ব তখন ঠিক করল যে সন্তায়ুকে তার সঠিক পরিচয় বলতে হবে। নিম্ব যে দেবী আজ্রিয়াকে ভালবাসে এবং তার উদ্দেশ্য সুমেরু বনে যাচ্ছে সেটা এখনি খুলে বলতে হবে। নিম্ব তখন সন্তায়ুকে সব খুলে বলল। সব শুনে সন্তায়ুর দুচোখে যেন বন্যার ধারা বইছে। ‘হে যুবরাজ নিম্ব, আমি এক অভাগিনী। জীবনে কাউকে ভালবাসিনি। ভালবাসা কি জানতামও না। কিন্তু আপনাকে প্রথম দেখে মনের ভিতর যে জোয়ার বইছে তাতে বুঝেছি ভালবাসাটা কি। আপনি অন্য একজনকে ভালবাসেন তার অসম্মান আমি করতে চাই না।  কিন্তু আমি আপনার কাছে শুধু একটা জিনিস চাইবো, দিবেন?’ কাঁদতে কাঁদতে সন্তায়ু বলল। ‘ঠিক আছে সন্তায়ু। তুমি যা চাইবে আমি তোমাকে তাই দিব। কথা দিলাম।’ নিম্ব বলল। ‘হে সুদর্শন, আমি চাই আপনি আমার বাড়িতে আর একটি দিন থাকবেন। আমার বাড়ির পাশে আছে একজন ভাল ভাস্কর্য নির্মাতা বসবাস। তিনি একদিনে ভাল মূর্তি বানাতে পারেন। আমি আপনার একটি মূর্তি বানিয়ে আমার উঠোনে রাখতে চাই। এই মূর্তিটিকে সেবা করে এবং ভালবেসে আমার সারাটাজীবন কাটাতে চাই।’ সন্তায়ু হাত জোড় করে বলল। 

চলবে...

লেখক: কবি ও লেখক, অধ্যাপক: অপরাধবিদ্যা, আইন ও বিচার বিভাগ, জন জে কলেজ, সিটি ইউনিভার্সিটি নিউইর্য়ক, মনস্তাত্তিক বিভাগ, হসটস কলেজ, সিটি ইউনিভার্সিটি, নিউইর্য়ক। কাউন্টার টেরোরিজম কর্মকর্তা, নিউইর্য়ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (এনওয়াইপিডি)।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :