‘মেয়াদহীন’ বিএনপির পুনর্গঠনে ধীরগতি

বোরহান উদ্দিন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১১:৫২ | প্রকাশিত : ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০:১১
বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক (ফাইল ছবি)

তিন বছরের মেয়াদ শেষ হলেও জাতীয় সম্মেলন করতে পারেনি বিএনপি। মার্চ থেকে কমিটি হয়ে গেছে মেয়াদোত্তীর্ণ। চেয়ারপারসন কারাগারে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন প্রবাসে। রাজনীতিতে আপাতদৃষ্টিতে বেকায়দায় থাকলেও পুনর্গঠন করে ঘুরে দাঁড়ানোর ঘোষণা আসে। তবে সে উদ্যোগেও দৃশ্যত গতি নেই।

২০১৬ সালের মার্চে হয় বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল। বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয় গত ১৯ মার্চ। পাঁচ মাস ধরে মেয়াদহীন কমিটি দিয়েই চলছে দল। নতুন সম্মেলন কবে হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হলেও দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জেলা কমিটিগুলো গঠন শেষেই হবে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় সম্মেলন।

এর মধ্যে ৩০ ডিসেম্বরের ভোটে ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে ফল। প্রথমে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করলেও পরে নির্বাচিতরা শপথ নেয়। আর আন্দোলনের ঘোষণা থেকে এখনো পিছিয়ে আসেনি বিএনপি, যদিও এবার কর্মসূচি দেওয়ার আগে দল পুনর্গঠনের কথা জানায় দলটি।

কত দিনের মধ্যে এই পুনর্গঠন হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যের ঘোষণা ছিল না। তবে বলা হচ্ছিল, যত দ্রুত সম্ভব শেষ হবে এই কাজ। তবে পুনর্গঠন না হওয়া পর্যন্ত দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদহীনতা দিন দিন বাড়তেই থাকবে।

বিএনপির গঠতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছরের মধ্যে জাতীয় সম্মেলন করে নতুন কমিটির দায়িত্ব গ্রহণের কথা। অবশ্য এই বিষয়টি পালন করা হয়েছে কমই। প্রতিষ্ঠান ৪১ বছরে অন্তত ১৩টি জাতীয় সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে কেবল ছয়টি।

কবে হবে নতুন সম্মেলন- এমন প্রশ্নে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের দল পুনর্গঠন চলছে। এটা শেষ হলে আমরা কাউন্সিলের কাজ শুরু করতে চাই।’

বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক জেলার সিংহভাগেরই মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও নতুন নেতৃত্ব আসেনি। আবার আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি হচ্ছে না বছরের পর বছর। নেতারা আশা করছেন, সবগুলো কমিটি পূর্ণাঙ্গ করে তাদের ভোটে কেন্দ্রীয় সম্মেলন হলে দলে গতি আসবে।

বিএনপির পুনর্গঠনের এই উদ্যোগ কিন্তু এবার নতুন নয়। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থতার পরও এই ধরনের কথা হয়েছিল। কিন্তু এক বছরের মধ্যে এই উদ্যোগের সফলতা ছাড়াই আন্দোলনে নেমে আবার ব্যর্থ হয় দলটি। পরে নানা সময় হুমকি ধামকি দিলেও আন্দোলনের পথ আর মাড়ায়নি দলটি।

কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি এখনো মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা কমিটির অর্ধেক। বহু জেলায় আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চলছে কার্যক্রম।

এর মধ্যে দুর্নীতির দুই মামলায় দণ্ডিত হয়ে চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে। আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে মুক্ত করা আর সম্ভব হবে কি না, এ নিয়ে প্রকাশ্যেই সংশয়ের কথা বলছেন নেতারা। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর ২০১৮ সালের ৮ মার্চ থেকে দলের নেতৃত্বে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে আছেন তারেক রহমান। মায়ের মতো তিনিও দুর্নীতির দুটি এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় দণ্ডিত। আর দণ্ড মাথায় নিয়ে তারেক দেশে ফিরবেন কি না, এই বিষয়টি নিয়েও আছে প্রশ্ন।

তবে যুক্তরাজ্য থেকেই দল চালাচ্ছেন তারেক রহমান আর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে মতের অমিলের বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিশেষ করে বগুড়া উপনির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ এবং সেখানে খালেদা জিয়ার জন্য মনোনয়ন ফরম তোলার বিষয়টি নিয়ে তিনি অবগত ছিলেন না।

পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েও সমন্বয় আছে কি না, এই বিষয়টি নিয়েও আছে প্রশ্ন। আট মাসে ৮২টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৩৫টিতে নতুন কমিটি ঘোষণা করা গেছে। বাকিগুলোতে কবে নাগাদ পুরো কাজ শেষ করা যাবে, তার দিনক্ষণ বলতে পারছেন না কেউ।

গত সোমবার ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন করা হয়। এতে মশিউর রহমানকে আহ্বায়ক ও এমএ মজিদকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। এর আগে দেওয়া হয় পঞ্চগড়ের আহ্বায়ক কমিটি।

নেতারা বলছেন, পুনর্গঠনে বিলম্ব নিয়ে তৃণমূলে যেন হতাশা তৈরি না হয়, সে জন্য নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে বিভাগীয় সমাবেশ শেষ করতে চায় দল। ইতিমধ্যে বরিশাল, চট্টগ্রাম ও খুলনায় সমাবেশ হয়েছে। এসব সমাবেশে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে বেশ খুশি দল। নেতারা মনে করছেন, মামলা-হামলায় জর্জরিত নেতাকর্মীরা হতাশা ভুলে সাংগঠনিক কাজে মনোযোগ দিতে শুরু করেছেন।

দায়িত্বশীল নেতারা বলেছেন, শিগগির অন্য বিভাগগুলোতেও সমাবেশ হবে। এসব সমাবেশ শেষ হওয়ার পরে বিএনপির আন্দোলনের কর্মসূচির ধরণ হবে নির্বাচনমুখী।

ময়মনসিংহ বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘ময়মনসিংহ মহানগরে আলাদা সাংগঠনিক জেলা করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এটা হয়ে গেলে এখানে সাতটি জেলা হবে। এরমধ্যে শেরপুরে কাউন্সিলের মাধ্যমে ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি এবং নেত্রকোণায় আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে। এ ছাড়াও তিনটি কমিটির কাজ শেষ পর্যায়ে আছে।’

এদিকে বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে সম্মেলনের মাধ্যমে জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে কড়া নির্দেশনা দেয়া হয়েছে আহ্বায়ক কমিটির নেতাদের।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘বিভিন্ন সংগঠনের আহ্বায়ক কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে আহ্বায়ক কমিটিকে সময় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। বেঁধে দেওয়া সময়ই আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ। এই সময়ের মধ্যে কমিটি পুনর্গঠন করতে না পারলে আহ্বায়ক কমিটিও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’

নিজ বিভাগের সাংগঠনিক পুনর্গঠন নিয়ে রংপুর বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু জানান, তার বিভাগে ১০টি সাংগঠনিক জেলা। এর মদ্যে পঞ্চগড়, সৈয়দপুর, নীলফামারীতে নতুন কমিটি হয়েছে। দিনাজপুরে পুরানো কমিটি হলেও সেখানে নতুন কমিটি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বাকি কমিটিগুলোর মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি।

ঢাকা টাইমসকে সাবেক উপমন্ত্রী বলেন, ‘যেসব জায়গায় নতুন কমিটি দেয়া হয়েছে তাদের সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে অক্টোবরের মধ্যে কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে হবে। আশা করি এটা সম্ভব হবে।’

বরিশাল বিভাগে একটি মহানগরসহ মোট আটটি সাংগঠনিক জেলা। এর মধ্যে ভোলা এবং ঝালকাঠিতে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি করা হয়েছে। বরিশাল উত্তর ও দক্ষিণ, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরের আহ্বায়ক কমিটি অনেকটা চূড়ান্ত করা হয়েছে। মহানগরের বিষয়ে এখনো কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।

বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘খুব দ্রুত সময়ে চার জেলার কমিটি দেওয়া হবে। বাকিগুলোও সহসা শেষ করার চেষ্টা করছি।’

রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ঢাকাটাইমসকে বলেন, তার বিভাগে নয়টি সাংগঠনিক জেলা। তার মধ্যে বগুড়া, নাটোর, পাবনা, নওগাঁ, রাজশাহী সদরে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে। আশা করি, তারা দ্রুত সময়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা সম্ভব হবে। কিছু জায়গায় আগের কমিটি আছে।

খুলনা  বিভাগেও ১১টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে কেবল কুষ্টিয়ার পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়েছে। এ ছাড়া যশোর ও ঝিনাইদাহ জেলায় আহ্বায়ক কমিটি হয়েছে।

এই বিভাগের দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকাটাইমসকে বলেন, মেহেরপুর, খুলনা জেলা ও মহানগর ও নড়াইলে বর্তমান কমিটি রেখেই পুনর্গঠন করা হতে পারে। সাতক্ষীরা আর মাগুরা ও চুয়াডাঙ্গার কমিটি কেন্দ্রে জমা আছে। 

দল পূনর্গঠনের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ঢাকা টাইমসকে বলেন, নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে দল গোছাতে কিছুটা সময় লাগলেও আমরা দ্রুতই এই কাজ শেষ করতে চাই। সেজন্য কাজ করছি।’

তিনি বলেন, ‘এবার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া আগের মতো হচ্ছে না। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কমিটি গঠন করা হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা কমিটি পুনর্গঠনও একইভাবে হবে। এখন থেকে কাউন্সিলে ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচিত হচ্ছেন।’

(ঢাকাটাইমস/২৪আগস্ট/বিইউ/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :