গাজী আবদুল্লাহেল বাকীর রুবাইয়াতে জাগতিক দর্শনের দিগদর্শন

প্রফেসর ড. মো. আনিসুজ্জামান
 | প্রকাশিত : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৪:৫১

গাজী আবদুল্লাহেল বাকী আধুনিককালে বাংলাদেশের একজন শিক্ষাবিদ, কবি, অনুবাদক ও সর্বোপরি রুবাইকার। তার দুই খণ্ডে প্রকাশিত সাড়ে পনের শরও বেশি বাংলাভাষায় মৌলিক রুবাইয়াত ইতিমধ্যে বোদ্ধাগণ ও রুবাই প্রেমিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আরও জানা যায়, সাড়ে ছয় শ রুবাই সম্বলিত তৃতীয় খ- প্রকাশের পথে। ফার্সি সাহিত্যের অনন্য রত্ন এ রুবাই অন্য ভাষা তথা বাংলায় মৌলিক রূপ নিয়ে আকর্ষণীয় হতে পারে তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ বাকীর রুবাইয়াত। রুবাইগুলো কাব্যালংকারে পরিপূর্ণ। চার লাইনে সমাপ্ত এ ধরনের একটি ছোট কবিতা যেমন ভাষা  বৈচিত্র্যে রূপকল্পময় তেমনি সাহিত্যের অলংকারের অনুষঙ্গে পরোক্ষ তথা রূপক উক্তিতে বিবৃত; তাছাড়া দোলানো ছন্দ তো আছেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে একদিন এক মধ্যাহ্নে এই কবির সাথে সামনাসামনি সাক্ষাৎ হয়। সালাম আদান-প্রদানের পর তার হাতে কি জিজ্ঞাসা করায় তিনি ‘রুবাইয়াত-ই-গাজী আবদুল্লাহেল বাকী’ পুস্তকের কথা বলেন এবং এ কথাও বলেন যে, পরে আমাকে এক কপি পাঠিয়ে দেবেন এবং সেই কথামতো তিনি একখানা বই প্রেরণ করেন। পুস্তকটি পাওয়ার পর আমি পড়ি এবং যারপরনাই বিস্মিত হই। আমি এ কথাও চিন্তা করি যে, এরূপ একটি পুস্তকের ওপর বিশ্লেষণধর্মী কিছু ভাব ব্যক্ত করে পাঠককে উপহার দেবো। দেরিতে হলেও এই প্রচেষ্টা তারই উদাহরণ।

কবি বাকীর রুবাইয়াত বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যে ভরপুর। বিষয়বস্তুগুলো রুবাইব্যাপী টইটুম্বুর হয়ে ছড়িয়ে আছে। খুঁজে বের করা একটু দুরূহ তো বটেই। বিষয়বস্তুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য যথাÑমানব প্রেম, ঐশী প্রেম, প্রকৃতি, সমাজ, আচরণ, সময়কাল, বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, উপাখ্যান, জগৎ সংসার, প্রবৃত্তি, দর্শন তথা জীবন দর্শন ইত্যাদি। পৃথিবীতে দেখা যায় মহৎ কাব্য রচনাকারীরাই কোনো না কোনো দর্শনের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং কবি হওয়ার সাথে সাথে তাদেরকে দার্শনিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে যেমনÑরবীন্দ্রনাথ, খৈয়াম, রুমি, ইয়েটস, ইকবাল প্রভৃতি। যাহোক, কথিত পুস্তকের রুবাইগুলোর মধ্য হতে দর্শনের অভিব্যক্তিগুলো টেনে এনে একটি প্রচ্ছন্ন রূপ দেওয়ার চেষ্টা নেওয়া যেতে পারে। যেমন রুবাইকার বলেন:

ফুলদানি এক বললো জায়ায়, ‘তোমার আমার অনেক কদর,

‘আমার রূপে সাজে টেবিল, রূপে তোমার কক্ষ-অন্দর।

‘শুকাই আমরা হারাই আদর দেখাদেখির দিন চলে যায়,

ধুলা হয়ে উড়বে হাওয়ায় তোমার আমার রূপের গতর।’ (৭ নং রুবাই, ১ খ- )

উপরোক্ত রুবাইয়ে কবি সংসারের পতœীর সাথে ফুলদানির তুলনা করেন। এ এক অদ্ভুত উপমা। ফুলদানি যেমন টেবিল সাজায় তেমনি পতœী সংসারের সাজসজ্জার মূল অংশ। কালপ্রবাহের অতিক্রমে তাদের আদর যতœ থাকে না, অবশেষে তাদের রূপ লাবণ্য ধূলি হয়ে বাতাসে বাতাসে উড়তে থাকে। এ এক ক্ষয়িষ্ণু সৌন্দর্যের বিবর্তন।

সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে দশ নম্বর রুবাইয়ে তিনি বলেন সৃষ্টিকর্তাকে বোঝা খুবই একটি সহজ ব্যাপার। পাহাড়, বন, দরিয়া, গ্রহ পৃথিবীর মানুষ কখনো বানাতে পারে না, কিন্তু মানুষ কম্পিউটার, সাবমেরিন, রোবট ইত্যাদি  তৈরি করছে। কাজেই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে এ দার্শনিক তথ্যটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। কবির নিরেট ধারণা যে, পাপের সাথে জ্ঞানের সখ্য রয়েছে। নিষিদ্ধ যত পাপ কাজ বিকৃত জ্ঞানের দ্বারাই সম্পাদিত হয় এবং তার জন্য মানুষ সৃষ্টিকর্তার নিকট মাফও চায়, এটা নিছক একটি বক্রাঘাত (ওৎড়হু)। তাই প্রতিদিন আমরা কতবার যে স্বর্গচ্যুত হই তার হিসাব রাখা দায়। এ প্রসঙ্গে কবি বলেন:

পাপের সাথে সখ্য জ্ঞানের দেখছে কিরূপ পাঁচ নয়ন,

জ্ঞানপাপী দীন আমরা মানুষ মাফ খুঁজি তাই সবশেষে। (৩০ নং)

প্রত্যেক মানুষকে রুবাইকার সৈকতের এক একটি বালুকণার সাথে তুলনা করেন। আর ঢেউ এসে অর্থাৎ পার্থিব নানান ঝামেলা মানুষকে জীবন পথে আগে-পিছে নিয়ে যায়। জীবন দর্শনের এ তথ্যটি এক জীবন্ত সত্য। ৭৩ নম্বর রুবাই এই নিরেট সত্যের অভিব্যক্তি তুলে ধরে। দেহের অভ্যন্তরে নাপাক বস্তু থাকলে দেহ নাপাক হয় না, কিন্তু তার এক ফোঁটা শরীরের বাহ্যিক যেকোনো স্থানে লাগলে দেহ নাপাক হয়। এ দর্শনটি ধর্মীয় দিক থেকে সত্য। এতে যে বিষয়টি প্রমাণিত তা হলো আমাদের চতুর্দিকে নিসর্গবেষ্টিত  বিস্তৃত পৃথিবী দেখতে সৌন্দর্যময় হলেও তা ‘পুঁজগন্ধময়।’ এ জন্যই পাপের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। জ্ঞান দর্শন নিয়ে রুবাইকার বিভিন্ন রুবাইয়াতে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে, অর্থে, তত্ত্বে ও রূপকে রূপদান করেন। তার মতে ঐশী জ্ঞানের নিকট অন্য সকল জ্ঞানই মূল্যহীন। কবির মতে, কেউ বিশ্বাস করুক বা না করুক, পরিমাণ, পরিধি যাই থাকুক না কেন, ঐশী জ্ঞানের অস্তিত্ব রয়েছে। যদি কেউ ঐশী জ্ঞানকে অস্বীকার করেন তাহলে তিনি নিছক মূর্খ অর্বাচীন ছাড়া কিছুই নন। কারণ ঐশী জ্ঞানই সকল জ্ঞানের উৎস; ঐশী জ্ঞানই এক সত্যের পথে ধাবিত করায় এবং অসাধ্য সাধন করায়, যেথায় অন্য জ্ঞান-দর্শনে জ্ঞানী-বোদ্ধা সিদ্ধান্তের ও সঠিক নির্দেশনার আবর্তে ঘুরপাক খেতে থাকে। তাই কোনো এক দার্শনিক বলেছিলেন চযরষড়ংড়ঢ়যু ধিং নড়ৎহ রহ ঃযব সধৎশবঃ ড়ভ ভরংয.  সমস্যা হলো জাগতিক জ্ঞানে জ্ঞানীদের অন্তরে গর্ব স্থান নিতে পারে, অন্যদিকে যেখানে সব জ্ঞানের জ্ঞানতত্ত্ব ও গর্বের মোহের বিনাশ ঘটে, সেই মুহূর্তেই ঐশী জ্ঞান সঞ্চারিত হতে পারে, কবির এই দার্শনিক যুক্তিটি আমার নিকট যথাযথ ও সত্য বলে মনে হয়। ১৮৭ নং রুবাইয়ে কবি বলেন:

অনন্তকাল বয়ে চলে সে তুলনায় নেইকো জ্ঞান,

সীমার মাঝে বাঁধা মানুষ গর্ব খোঁজে পরিত্রাণ।

তবে কবি ধারণা পোষণ করেন যে, সত্যিকারে প্রেমের জ্ঞানে জ্ঞানী হলেই সকল তত্ত্ব তখন সহজে আত্মস্থ করা সম্ভব হবে। তাই কবি এ মুহূর্তে কোনো শাস্ত্র হতে জ্ঞান গ্রহণ করতে নারাজ। একটু বক্র সুরে বলেন:

জ্ঞানী লোকের তর্কযুদ্ধে বিরূপ ক্রিয়া এই ধরণীর,

নিরেট মূর্খ আমিসহ শুনাই তত্ত্ব বচন গভীর।

জ্ঞানী সেজে হই যে বাচাল চিত্ত থাকে ধীর উদাসীন,

 প্রেমের জ্ঞানে জ্ঞানী হলেই ফলবে তত্ত্ব বহুৎ তাবীর। (৪৪০ নং)                 

ছোট একটি দর্শন যা ২৩৫ নং রুবাইয়ে বিবৃত এবং তা হলো সুউচ্চ ইমারত, শান-শওকত, অতি মূল্যবান আধুনিক জীবন যাত্রার উপকরণ ও অর্থকড়ি ইত্যাদি ভালো জিনিস ছাড়া আমাদের এই সুন্দর  সৌন্দর্যময় পৃথিবী ও জগৎ সংসার চলতে পারে কিন্তু ভালো অন্তর, ভালো মানুষ ছাড়া জগৎ চলবে না, চলতে পারে না। এক কথায় ভালো জিনিস ছাড়া জগৎ চলবে কিন্তু ভালো মানুষ ছাড়া জগৎ চলবে না। কবির কথায়:

‘ভালো মানুষ বিনা জগৎ চলবে না যে এইতো মত।’

কবির আর একটা মত প্রশংসারযোগ্য এবং তা হলো জগতে বোদ্ধা-বোকা এককাতারে চলার ফলে সবই থাকে অসমান। কোনো কিছুর জট সহজ ও পূর্ণাঙ্গভাবে খোলে না, কারণ বোদ্ধা জট খুলতে গেলেই বোকা বাধা দেয়, তাই চিরকাল সব কিছুই অসমান, সমাধানহীন থেকে যায়, কোনো কিছুই পূর্ণাঙ্গ রূপ-চেহারায় ফুটে ওঠে না। ফলে সত্যের বিকৃতি ঘটে। খৈয়ামের এক রুবাইয়ে আমরা এর প্রতিফলন লক্ষ্য করি:

যোগ্য হাতে জ্ঞানীর কাছে ন্যস্ত করো এই জীবন,

নির্বোধের কাছ থেকে ভাই থাকবে তফাৎ দশ যোজন।

জ্ঞানী হাকিম বিষ যদি দেয় করবে বরং তাহাই পান,

সুধাও যদি দেয় আনাড়ি করবে তাহা বিসর্জন  (ওমর খৈয়াম, অনু: কাজী নজরুল ইসলাম)

অপূর্ণতা মানুষের সঙ্গসাথী, তাই কবি বলেন উদার মন, স্বচ্ছ বিবেক, অধীর কলম ইত্যাদি দিয়ে কিছু প্রস্ফুটিত করতে গেলে কোথাও যেন ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়, পূর্ণাঙ্গতা ছুঁই ছুঁই করে তবুও আসে না। ফলে অসন্তুষ্টি থেকে যায় এবং এটি একটি চিরন্তন জাগতিক রীতি। কবি তার রুবাইয়াতে চিন্তাশীল মানুষের জ্ঞান দর্শনের দুয়ারকে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রসারিত করার চেষ্টা করেছেন; এছাড়াও এটি বললে অত্যুক্তি হবে না যে, তার বহু মৌলিক রুবাইয়াতের মাধ্যমে জ্ঞান-দর্শনের নতুন দুয়ারের সন্ধানও দিয়েছেন। সঠিক অবলোকনে ও প্রচেষ্টায় হয়তো সেখানে রতœ মিলতে পারে। সাধারণত দীন মজলুমরা অন্যের নিকট হাত পাতে, তদ্রƒপ ভিন্ন প্রক্রিয়ায় ধনীরাও সব সময় হাত পাতে। একদল নিতান্ত প্রয়োজনে আর একদল নিছক অপ্রয়োজনে এ কাজ করে।  কবির কথায়: ’কোন নিয়মে দীন ধনীরা এককাতারে হাত পাতে ’ (৩৬৩ নং)

পৃথিবীতে অনেক কিছু বদল হওয়া ও করা সম্ভব কিন্তু মানব বদল সহজে সম্ভব নয়। উচ্চতর ও গভীরভাবে কার্যকরী কোনো প্রভাব যদি মানব হৃদয়ে আপতিত হয় তাহলে তার দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন হতে পারে ও তিনি বদলাতে পারেন, যেমন শায়খ শামস তাবরিজের প্রভাবে তথা তাছিরে পারস্যের মহাকবি রুমির অন্তরের বদল ঘটে। এ উল্লেখযোগ্য বিষয়টি বাঙালি রুবাইকার অতি সুন্দরভাবে ৩৭৮-৩৮০ রুবাইয়াতে তুলে ধরেন। পৃথিবীতে চলার পথে পার্থিব বিষয়-আশয় নিয়ে আমরা সুস্থভাবে চলতে পারি না। ডান দিকে যদি আলো বা সমাধান দেখি, বাম দিকে দেখি আঁধার । যদি ডান পা সামনে টানে, বাম পা টানে পিছন দিকে। এ যে জীবন পথে অগ্র-পশ্চাতের চিরন্তন দ্বন্দ্ব যা ৪৯৮ নং রুবাইয়ে পরিস্ফুটিত।

রুবাইকার বাকীর আরেকটি দর্শন খুবই প্রণিধানযোগ্য। প্রকৃতপক্ষে মানুষের নিয়ন্ত্রণ করে তার প্রবৃত্তি বা নফস্। কিন্তু এই প্রবৃত্তি এতই বেসামাল যে, মানব বিবেকের পক্ষে তার নিয়ন্ত্রণ করা বড়ই কষ্টকর এবং অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে বলেই ফলে সমাজে যত অন্যায়, অত্যাচার, অনাচার, দুর্নীতি ও পাপ। কবির মতে, মানব দূষণের মূল হলো এই প্রবৃত্তি। তবে তিনি ধারণা দেন যে, একমাত্র ধর্মীয় আদেশ-নিষেধ কঠোরভাবে পালনের মাধ্যমে এই পশুবৎ আত্মাকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে অন্য পথ যদি কোথাও থাকতো তাহলে এতদিন প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হতো। ৫৩৮ নং রুবাইয়ের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

আলোচ্য রুবাইকারের বিভিন্ন বিষয় সম্বলিত রুবাইয়াত যেমন ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞান নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় প্রতিফলিত তেমনি ভাষার সৌন্দর্য মাধুর্যে এমন আকর্ষণীয় যে, তা পড়ার সাথে সাথে হৃদয়কে দোল দিয়ে যায় এবং দৃষ্টির সম্মুখে জীবন্ত ছবির মতো ফুটে ওঠে। এরূপ একটি ঝংকৃত রুবাই নি¤েœ উদ্ধৃত করা হলো:

দাঁতাল মাটি চুষবে অবাধ সুন্দরীদের ওষ্ঠাধর,

কণ্ঠবেড়ে কোন নাগিনি মারবে ছোবল চিবুক পর।

হায়নারূপী কীট-পতঙ্গ খাবলে খাবে মাংস-বুক,

পুলকহারা আজকে বধূ, একদিন যেথা বইতো ঝড়। (৫৬৪ নং)

কবি বলেন সোনার খাঁচায় যদি পাখি রাখা যায় এবং যতদিন আবদ্ধ থাকুক না কেন, যে মুহূর্তে সে একটু ছাড়া পাবে সে তাৎক্ষণিক নিকটবর্তী গাছের ডালে গিয়ে বসবে, কারণ গাছের হৃদয়ের সাথে তার হৃদয় বাঁধা; অধিকন্তু মূলের প্রতি তার ভালোবাসা এবং স্রষ্টাই তার চালক। কিন্তু মানুষ দিন বদল তথা আধুনিকতায় সব কিছু ভুলে দিশেহারা হয়ে যায়। ৬৮০ নম্বর রুবাইয়ে বাঘ ও মানুষের মধ্যে তুলনা করা হয়েছে। বাঘের জন্মগত পেশা হিংস্রতা এবং তা সে লালন করে এবং প্রয়োগ করে শুধুমাত্র ক্ষুধা নিবৃত্ত করার জন্য, অন্য কোনো কারণে নয়, এটা তার বৈশিষ্ট্যের চিরন্তন রূপ, কিন্তু আলোকিত মানুষ হৃদয়ে হিংসা লালন করে বাঘের চেয়ে নৃশংসতার প্রতিফলন ঘটায়, যা প্রবৃত্তির স্খলন ও অপ্রতিরোধ্য। কবি আধুনিক জগতের একজন নাগরিক, তাই তার রুবাইয়াতের মধ্য দিয়ে আধুনিককালের ক্রম নিকৃষ্টমান বিভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। তার ৬৮৪ নং রুবাইটি নি¤œরূপ:

কউ জানে না কোন সুদূরে কাহার জন্যে ছুটছে বহর,

ভবিষ্যতের গর্ভ ভরা ব্যঙ্গরূপের হাসির লহর।

লাভ কোনো নেই অতীত টেনে দুখের ডালি দেয় উপহার,

বর্তমানে ঘুণ ধরেছে পচন বুকে নষ্ট শহর।

এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, বর্তমান রুবাইকার নিঃসন্দেহে একজন আধুনিক কবি। আধুনিকতার অর্থ এটাই বুঝায় না যে, শুধুমাত্র মুক্ত ছন্দে ও শব্দের অনুষঙ্গে কবিতা রচনা করতে হবে। কবি বলেন, ‘বিশ্বায়নের বিষাদ যুগে চলছে জীবন আত্মভাবে।’ (৬৮৬ নং) কবির আবিষ্কার একটি দর্শন অত্যন্ত চমৎকার। তা হলো তিনি সর্বস্থানে আলোর সন্ধান করেন এবং খুঁজে পান যথা জলে, ধাতবে, জলদে, এমনকি ছাইয়ের মধ্যে আলো (ঊহবৎমু) সুপ্ত থাকে, জীব বলতে শুধুমাত্র মানুষের মধ্যে আলোর ধারা রয়েছে, কিন্তু এর প্রতিফলন ঘটানো প্রয়োজন যা ৭৪০ নং রুবাইয়ে অঙ্কিত। ৭৫০ নং রুবাইটি একটি অমোঘ সত্যের উচ্চারণ, যার মধ্যে রয়েছে এক তীর্যক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, যা আধুনিককালের যুদ্ধবাজদের প্রতি শ্লেষমাখা তীর:

এক বোকাতে জিজ্ঞাসিল ‘দুই ইমারত কিসের কাজে?’

বললো জ্ঞানী ‘এক দালানে গোলাগুলি তৈরি সাজে,

অপরটিতে হয় চিকিৎসা গুলি খাওয়া মানব-স্বজন।’

মুষড়ে বোকা বললো হেঁকে ‘হায়রে এ জ্ঞান এমন বাজে!’

কবির মতে, নিজেকে নিজে সঠিকভাবে চিনে নেওয়ার মতো বড়ো জ্ঞান আর পৃথিবীতে নেই (৭৭৭ নং)। মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব, কিন্তু যে নিজের ধ্বংস নিজেই করে। এছাড়াও তো রয়েছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ৮৮ নং রুবাইয়ের অন্যতম উদাহরণ। ঐশী দর্শনের নাগপাশে কবি যেমন আকৃষ্ট, তেমনি আবদ্ধ। এই দর্শন ও প্রেম থেকে তার মুক্তি ঘটবে। এই সত্যই তার আন্তরিক বিশ্বাস। এ সূক্ষ্ম বিষয়টি ধর্মীয় চেতনার অফুরন্ত ফসল যা সমর্পিত আত্মা ব্যতীত সহজে ভাগ্যে জোটে না। তাই কবি প্রেম তথা ঐশী প্রেমই তার জীবন দর্শনের সারের সার যা নি¤েœাক্ত রুবাইয়ে সুন্দররূপে ফুটে উঠেছে:

শরাব মধুর পিছে ছুটি কোন কারণে সত্য জানাই,

প্রেমে শোধক মনের গলদ ধুয়ে মুছে নিতে যে চাই।

আর মুছে দেয় কৃষ্ণ যে ছাপ বুকের মাঝে জমাট বাঁধা,

নীল চাঁদোয়ার তলে বিশ্বে আর তো এমন সুধা যে নাই।  (১৩১-২য় খন্ড)

কবির মতে, জীবনের যত যন্ত্রণা তার অধিকাংশ কুমন্ত্রণা ও কুবুদ্ধি উদ্ভাবন ও প্রয়োগের ফসল। একটি শৈল্পিক শব্দ চয়নে সুন্দর  একটি রুবাইয়ে কবি বলেন, এক শ মানুষ একজন মানুষকে ভালো করতে পারে না। কিন্তু একটি খারাপ মানুষ একশ জনকে খারাপে পরিণত করতে পারে:

পারে নাকো করতে ভালো একটি মানুষ একশ জনে,

করতে পারে খারাপ দ্রুত এক মানুষে একশ জনে। (১৭৬-২য় খ-)

কবির মতে, ধার্মিকের স্থান প্রেমিকের পিছে কারণ ধার্মিক বেহেশত পেতে চায়, কিন্তু প্রেমিক স্রষ্টা-প্রিয়াকে পেতে চায়। দ্বিতীয় খ-ের ৬৩৬ ও ৬৩৯ নং রুবাইয়ে রুবাইকার একটি অনন্য দর্শনের রূপ দেন। বিষয়টি এমনই যে, যদি কোনো ধারণার জন্ম হয়, তাহলে কবির মতে ওই ধারণাটির বাস্তবতাও থাকবে। অর্থাৎ ধারণা থাকলেই তার সত্যতা ও অস্তিত্ব থাকবে। যেমন নিরাকার কোনো কিছু ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বে, কিন্তু তার বাস্তবতা রয়েছে যেমন বায়ু যা ইন্দ্রিয় দিয়েও বোধগম্য নয়:

কোন আদলে গড়লো কায়া সুবাস বায়ু আলোর ঢল,

উদ্ধারে এ রহস্য-জাল সকল জ্ঞানের বুদ্ধি চুপ। (৬৫৯, ২য় খ-)

মানুষের জীবনকে কবি কচুর পাতায় জমাকৃত পানির টলমলে রূপের সাথে তুলনা করেন। প্রভাত সূর্য উঠলেই পানি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। তদ্রƒপ মানব জীবন পৃথিবীতে টলমল করতে করতে একদিন শুকিয়ে হারিয়ে যায়। (৭২৩-২য় খ-) জলবায়ু দূষণ ব্যতীত আধুনিক যুগে কবি আরও অনেক কিছুতে দূষণ খুঁজে পানÑযেমন শব্দ দূষণ, বচন দূষণ, মেজাজ দূষণ ও সর্বোপরি মানব দূষণ। কবির জাগতিক দার্শনিক মতবাদ বেশ কিছু রুবাইয়াতের মধ্যে এভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ভাষার সৌকর্যে, ছন্দের দোলাতে কবির ভাবনা-চিন্তাগুলো ভিন্ন ভিন্ন প্রকারে সাহিত্য রস সঞ্চারণের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশি কবির বাংলা সাহিত্যে এমন নান্দনিক রুবাই লেখা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। তার এই রুবাই নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্য তথা মরমী সাহিত্যের এক অমূল্য সংযোজন। তবে বেশিরভাগ রুবাইয়ে তার ঐশী প্রেম ও আধ্যাত্মিক দর্শন ফুটে উঠেছে, যা সত্যিকারে বাংলা মিষ্টিক বা মরমী সাহিত্যের এক উল্লেখযোগ্য অংশ হিসেবে চিহ্নিত থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। এই কবি বিখ্যাত ফার্সি সাহিত্যের মহাকবি ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াতের আঙ্গিক ও ছন্দ অনুসরণ করেছেন এবং মহাকবি জালালুদ্দিন রুমির ঐশীতত্ত্বে অনুপ্রাণিত হয়েছেন বলে মনে হয়। তথাপিও কবি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। তাই তাকে বাংলা সাহিত্যর রুমি বললেও অত্যুক্তি হবে না । কবি রচিত ৭৫৪ নং রুবাই দিয়ে আমার এই ছোট প্রবন্ধের ইতি টানছি:

স্বপ্ন তোমার অনেক কিছু থাকছে সবই স্বপ্ন হয়ে,

হবার যা তা হবে সেটাই দেখো না ভাই শরাব পিয়ে।

হয়তো বরফ গলতে পারে হৃদ আগুনে ঘুমের ঘোরে,

সাকীর হাতটি ধরে তুমি লোভী সখীর দাও গুঁড়িয়ে।

লেখক: উপাচার্য, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, বরিশাল

সাবেক অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :