শশীকাহন: পৌরাণিক উপাখ্যান: ফ্যান্টাসি থ্রিলার সিরিজ, পর্ব- আট

ড. রাজুব ভৌমিক
 | প্রকাশিত : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২২:২৫

চলদাজ রাজ্যের বাতাস যেন আজ মৃত্যুর আহাজারিতে ভারি। এই যুদ্ধে প্রায় আশি হাজার চলদাজ সেনা লাগগিন্তা রাজ্যে তাদের প্রাণ বিসর্জন দেয়। উপরন্তু, চলদাজ রাজ্যের এগার জন যুবরাজ লাগগিন্তা রাজ্যের মহারাজা মঞ্জটের হাতে একে একে শহীদ হয়। চলদাজ রাজ্যের চারিদিকে শুধু শশীদের শোকের বিলাপ। মহারাজা তার একমাত্র কন্যা তিস্রাকে এবং এগার-জন পুত্রকে অল্প কিছুদিনের মধ্যে হারিয়ে গভীর শোকে এখন শয্যাশায়ী। চলদাজ রাজ্যের সব দায়িত্ব এখন মহামন্ত্রী কাগবি সামলাচ্ছে। মহারাজের বাকি ঊনত্রিশজন পুত্র চলদাজ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন দায়িত্বেরত। তাই মহামন্ত্রী কাগবি একে একে সব যুবরাজদের নিকট জরুরি সংবাদ পাঠিয়ে দিয়েছে এবং তাদের সবাইকে রাজপ্রাসাদে আসার জন্য অনুরোধ করছে।  

কয়েকদিনের মধ্যে চলদাজ রাজ্যের দূরদূরান্ত থেকে মহারাজের সব পুত্র রাজপ্রাসাদে পৌঁছে যায়। মহারাজা রাসঙ্ক এখনো গভীর শোকে শয্যাশায়ী। মহারাজা কারো সাথে দেখা করছে না। একমাত্র মহারানি যোদি মহারাজার সেবা করে যাচ্ছে। এর মধ্যে সব যুবরাজ মিলে রাজ্যে বিভিন্ন ভার গ্রহণ করে রাজপরিচালনাতে মহারাজা কে সাহায্য করে যাচ্ছে। মহারাজার উনত্রিশ জন পুত্রের মধ্যে জেষ্ঠ্য পুত্র যুবরাজ শিহিল। যুবরাজ শিহিল চলদাজ রাজ্যের সেনাবাহিনী পুনপ্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নিয়েছে। এ সংবাদ শুনে দলে দলে চলদাজ রাজ্যের প্রজারা আপন ইচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে শুরু করছে।

অন্যদিকে, মহারাজা মঞ্জট তার রাজ্য শত্রু-মুক্ত করার পর রাজপ্রাসাদে ফিরে আসে। পরের দিন রাজসভায় মঞ্জট সবার সাথে বসল। দিনের রাজকর্ম শেষ করে সভার শেষ মুহূর্তে মহারাজা মঞ্জট বিবাহ করবে বলে ঘোষণা দেয়। রাজসভায় মহারাজা আরো বলল যে সে তার মনের মত কোন পাত্রী খুঁজে পাচ্ছে না। এ নিয়ে সে ভীষণ চিন্তিত কারণ মহারাজ মঞ্জটের বয়স অনেক হয়েছে। সে কবেই তার বিবাহের বয়স পেরিছে তা সবার জ্ঞাত। মহারাজা মঞ্জট নিজেকে অনেক শক্তিশালী ও জ্ঞানী ভাবে। সে মনে করে তার রানি হবার মত যোগ্য শশী কন্যা বোধহয় এ চন্দ্রগ্রহে নাই। মহারাজ মঞ্জটের ইচ্ছা সে এমন একজন শশীকন্যাকে বিয়ে করবে যে হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমতী এবং তার মত শক্তিশালী। আর তাই শেষ বারের মত উপযুক্ত রানি বাছাইয়ের জন্য হঠাৎ মহারাজ মঞ্জট লাগগিন্তা রাজ্যে ‘স্বয়ংসখী’ অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। স্বয়ংসখী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একজন উচ্চবংশীয় প্রাপ্তবয়স্ক শশী-পুত্র তার জন্য উপযুক্ত কনে বাছাই করে। সাধারণত বিভিন্ন রাজ্য থেকে বহু শশী-কন্যা স্বয়ংসখী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে থাকে। রাজসভায় মহারাজা স্বয়ংসখী অনুষ্ঠানের দিন ধার্য করে এবং পুরো চন্দ্রগ্রহে এ সংবাদ পৌঁছে যায়। 

স্বয়ংসখী অনুষ্ঠানের দিন একে একে বিভিন্ন রাজ্য থেকে বহু সুন্দরী এবং গুণবতী শশী-কন্যা লাগগিন্তা রাজসভাতে এসে উপস্থিত। সবার সাথে স্বয়ংসখীতে অংশগ্রহণ করতে আসে রাক্ষস-রাজ অউনাকের কন্যা সুনীতি। সে এক রাক্ষস কন্যা তাই এক সাধারণ শশীর বেশ ধরে স্বয়ংসখীতে অংশগ্রহণ করতে লাগগিন্তা রাজসভায় আসে। সুনীতির রাক্ষস হবার পিছনে আছে এক দূর্ভাগ্যজনক গল্প। সুনীতির পিতা সর্দার অউনাক আগে ছিলেন সাধারণ এক শশী ও যাযাবর। একদিন সে সুমেরু বনে রাক্ষসের পোশাক পরিধান করে দেবী আজ্রিয়ার তপস্যা ভঙ্গ করেছিল। দেবী আজ্রিয়া প্রচণ্ড ক্রোধিত হয়ে সর্দার অউনাককে হত্যা করতে উদ্যত হয়। তখন যুবরাজ নিম্ব বার বার দেবীকে বুঝানোর পরে দেবী আজ্রিয়া সর্দারের প্রাণ-ভিক্ষা দিতে রাজী হয়। কিন্তু দেবী আজ্রিয়া সর্দার অউনাক কে একটি গুরুতর অভিশাপ দেয়। দেবী আজ্রিয়া সর্দারের উদ্দেশে বলল, ‘আজ তুই যে রাক্ষসের সাজ ধরে আমার তপস্যা ভেঙেছিস সেটা আর এখন থেকে তোর সাজ হবে না। আজ থেকে তুই ও তোর গোষ্ঠীর সবাই প্রকৃত রাক্ষসে পরিণত হবি। আর নকল কন্ঠে ছলনা করে আমার তপস্যা ভঙ্গ করেছিস তাই আজ থেকে রাক্ষস বংশের সবাই ছলনাময়ী হবে।’ দেবী আজ্রিয়া সর্দার অউনাকের প্রাণ ভিক্ষা দেয়। আর সাথে সাথে সর্দার অউনাক এবং তার দলের সবাই রাক্ষসে রূপান্তরিত হয়। পূর্বে রাক্ষসদের নিয়ে শশীদের মধ্যে কল্পকাহিনি ছিল কিন্তু সেদিন দেবী আজ্রিয়ার অভিশাপের ফলে তা বাস্তবে পরিণত হয়। সে রাক্ষসরাজ অউনাকের কন্যা সুনীতি। সুনীতি দেবী আজ্রিয়াকে ঘৃণা করতে করতে ছোট থেকে বেড়ে ওঠে। কিন্তু সে অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী এবং অনেক বুদ্ধিমতী। 

স্বয়ংসখী অনুষ্ঠানটি লাগগিন্তা রাজ্যের রাজদরবারে বিলম্ব না করে শুরু হয়ে যায়। স্বয়ংসখীতে অংশগ্রহণ করতে আসা সব শশীকন্যাকে  রাজা মঞ্জট একে একে তিনটি প্রশ্ন করে। প্রশ্ন গুলো হচ্ছে, এক- দুই আর দুই যোগ করলে কখন পাঁচ হয়। দুই- বহুদিন না ঘুমিয়ে কিভাবে একজন শশী বাঁচতে পারে। এবং তিন- তোমার কোন জিনিসটি সর্বদা অন্য ব্যবহার করে। স্বয়ংসখী অনুষ্ঠানে আসা কেউ ঐ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর দিতে পারে নি। রাজা মঞ্জট খুব হতাশ হয়। রাজদরবারের শেষ এক প্রান্তে চুপ করে বসে থাকে সুনীতি। সে কিছু বলছে না। রাজা মঞ্জট তখন সবার উদ্দেশ্য বলল, ‘এই চন্দ্রগ্রহে কি এমন কেউ নেই যে আমার এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর দিতে পারে?’ তখন সুনীতি উঠে দাঁড়ায় এবং বলে, ‘মহারাজ আমি আপনার সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারব কিন্তু আমি সব প্রশ্ন উত্তর সঠিক হবার পরও আপনি আমাকে বিবাহ করতে রাজী হবেন না।’ মঞ্জট তখন বলল, ‘হে শশী কন্যা, আমি আজ এই রাজদরবারে কথা দিচ্ছি আপনি যদি আমার এই তিনটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেন তাহলে আমি আপনাকে অবশ্যই বিবাহ করিব। আপনি নিশ্চিন্তে আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন।’ স্বয়ংসখী অনুষ্ঠানে রাজসভাতে আগত সবাই সুনীতির দিকে চেয়ে আছে। সবাই মনে মনে ভাবছে কে এই শশী-কন্যা যে মহারাজ মঞ্জটের এত কঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারে। যেখানে বহু মেধাবী শশী-কন্যা মহারাজের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে নি সেখানে এই অজানা শশী-কন্যা কেমনে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিবে। রাজসভাতে উপস্থিত সবাই সুনীতির দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। সুনীতি উঠে দাঁড়ায়। ‘মহারাজ, আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, ভুল করলে- একমাত্র ভুল করলেই দুই আর দুই এর সমান পাঁচ হয়। আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, রাতে ঘুমালে- দিনে না ঘুমিয়ে বেঁচে থাকা যায় যদি রাতে ঘুমানো হয়। আপনার তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, নাম- একমাত্র আমার নামই সর্বদা অন্যে ব্যবহার করে।’ সুনীতি আত্মবিশ্বাসের সহিত মঞ্জটের প্রশ্নের উত্তর গুলো দেয়। 

সুনীতির উত্তর শুনে রাজদরবারে উপস্থিত সবাই বিস্মিত। কেউ যেন তাদের নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মহারাজা মঞ্জটও সুনীতির বিচক্ষণতা দেখে বিস্মিত এবং আনন্দিত। মঞ্জট তখন বলল, ‘হে শশী-কন্যা, আপনার সব উত্তর সঠিক হয়েছে। আপনার বুদ্ধিমত্তা দেখে আমি সত্যিই বিস্মিত এবং গর্বিত। কিন্তু আপনি শুধু আমার প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। আমি বরাবরই চেয়েছি আমার অর্ধাঙ্গিনী বুদ্ধিমতী এবং যোদ্ধা হবে। আপনাকে আমার অর্ধাঙ্গিনী হতে হলে পরবর্তী যুদ্ধ পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে হবে।’ সুনীতি তখন রাজা মঞ্জটকে বলল, ‘মহারাজ, আমি আপনার সব পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত। বলুন কিভাবে আমি প্রমাণ করব যে আমি এক দক্ষ যোদ্ধা?’ রাজা মঞ্জট বলল, ‘আপনাকে আপনার দুই চক্ষু বন্ধ করে তীর-ধনুক দিয়ে ঐ বৃক্ষে বসা ঈগল পাখিটিকে হত্যা করতে হবে।’ ঈগল পাখি দেবী আজ্রিয়া প্রিয় একটি পাখি। মহারাজ মঞ্জট দেবী আজ্রিয়াকে একদম সহ্য করতে পারে না তাই সে এই পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝতে চাইছে সুনীতি কি দেবী আজ্রিয়ার পক্ষে না বিপক্ষে। কিন্তু রাজা মঞ্জট জানে না যে সুনীতিও দেবী আজ্রিয়াকে ঘৃনা করে। দেবী আজ্রিয়ার জন্য তার গোত্রের সবার এখন রাক্ষসে পরিণত হয়েছে। তাই সুনীতি মহারাজা মঞ্জটের কথায় সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে যায় এবং তার হাতে তীর-ধনুক নেয়। এরপর বিলম্ব না করে সুনীতি তার দুই চক্ষু বন্ধ করে দূরে একটি বৃক্ষে বসা সে ঈগল পাখিকে লক্ষ্য করে তীর ছোঁড়ে। ঈগল পাখিটি তীরবদ্ধ হয়ে মারা যায়। রাজসভায় উপস্থিত সবাই হাততালি দিতে লাগল। এজন্য যে তারা অবশেষে তাদের রাজ্যের জন্য রানি পেতে যাচ্ছে। পূর্বে যেটা কোন শশী-কন্যা করতে পারেনি আজ তা সুনীতি করে দেখিয়েছে। 

মহারাজা মঞ্জট অবাক দৃষ্টিতে সুনীতির মুখ-পানে চেয়ে আছে। মঞ্জটের মনে তখন একটি কৌতুহলের সৃষ্টি হয়। ‘আমি মুগ্ধ। আপনার কর্মদক্ষতা অভাবনীয়। আমার দেয়া কথা অনুযায়ী এখন আপনার সম্মতি হলে আপনি হবেন আমার রানি। কিন্তু আমার একটি কৌতূহলী প্রশ্ন ছিল। কেন আপনি বলেছেন যে আমি আপনাকে রানি হিসেবে মেনে নিব না।’ মঞ্জট সুনীতিকে জিজ্ঞেস করল। সুনীতি একটু খাবড়ে যায়। সে বলল, ‘মহরাজা মঞ্জট আপনি আপনার কথায় অটুট থাকলে আমি আপনার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি।’ মহারাজা একটু ভেবে চিন্তে নিল এবং বলল, ‘আমি যখন কাউকে কথা দিই তখন যেকোন মূল্যে সে কথা রাখি। আপনি নির্ভয়ে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।’ সুনীতি তখন তার ছদ্মবেশ পরিবর্তন করে রাক্ষস-রূপ ধারন করে। রাজদরবারে উপস্থিত সবাই ভয় পেয়ে যায়। অনেকে ভয়ে রাজসভা থেকে পালিয়ে যায়। ‘এ ছলনাময়ী রাক্ষসী!! এ কোন দিন এ রাজ্যের রানি হতে পারে না। মহারাজ কিছু বলুন।’ রাজসভাতে আগন্তুক এক শশী মহারাজ মঞ্জটকে বলেন। এ কথা বলার সময় বহু আগত শশী ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক’ বলেন।

তখন সভাতে ছদ্মবেশে পাপের দেবতা কিতমু ছিল। মহারাজ মঞ্জট দেবতা কিতমুর ভক্ত। দেবতা কিতমুর সাধনা করে মঞ্জট সিদ্ধি লাভ করে এবং দুটি বর পায়। এক বরে মঞ্জট পুত্র হিসেবে দেবতা কিতমুকে সাত জন্মে পাবে। আর দ্বিতীয় বরে মঞ্জটের জীবনে একটি মহাপাপের ভাগীদার শুধু কিতমু হবে। দেবতা কিতমুর দেয়া দ্বিতীয় বর অনুযায়ী মহারাজ মঞ্জট যখন তার আপন ভাই নিম্বকে সিংহাসনের লোভে হত্যা করে তখন সে মহাপাপের ভাগীদার পাপ দেবতা কিতমু হয়। তখন থেকে দেবতা কিতমু মহারাজ মঞ্জটের উপর নারাজ। তাই আজ সুযোগ পেয়ে দেবতা কিতমু মহারাজ মঞ্জটের জিহ্বাতে কয়েক মুহূর্তের জন্য বসে এবং তার কথার সুর পরিবর্তন করে। যখন মহারাজ মঞ্জট বলতে চেয়েছে, ‘তুই এক রাক্ষসী! ছলনাময়ী! তোর সাথে আমার বিবাহ কিছুতে হতে পারে না।’ তখন দেবতার কিতমু মহারাজ মঞ্জটের জিহ্বাতে বসার কারনে সে সবার উদ্দেশে তার পরিবর্তে বলে, ‘আমি আপনাদের সম্মুখে তাকে আমি কথা দিয়েছি এখন সে কথা ফিরিয়ে নিতে পারি না। তাছাড়া সে আমার সব পরীক্ষার পাশ করেছে। আমি সুনীতিকেই বিবাহ করিব।’ 

রাজসভাতে সবাই চুপ হয়ে যায়। কেউ আবার ফিসফিস করে বলে, ‘শশাঙ্ক-কুল মহারাজ মঞ্জটের হাতেই ধ্বংস হবে। একজন রাক্ষসীকে মহারানি হিসেবে মেনে নেয়া যায় না।’ দেবতা কিতমু মঞ্জটকে পূর্বেই বলেছিল যে তার চাওয়া দুটি বর অপ্রত্যাশিত এবং চন্দ্রগ্রহের কল্যাণের জন্য নয়। তাকে অন্যবর চাইতে বলে কিন্তু মঞ্জট ছিল অনঢ়। পাপের দেবতা কিতমু তখন মঞ্জটকে বলেন তার এ দুটি বর তার জন্য শুধু অশান্তি নিয়ে আসবে। মঞ্জট তখন তা শুনেনি। মঞ্জটের প্রথম বর অনুযায়ী সে পুত্র হিসেবে দেবতা কিতমুকে সাত জন্মে পাবে। কিন্তু দেবতা কিতমুর এর মনে এই বর নিয়ে ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে। তাই সে এখনো মহারাজ মঞ্জটের জিহ্বাতে বসে আছে এবং তার সুর পরিবর্তন করছে। ‘আমি এখনই সুনীতিকে বিবাহ করিব।’ মহারাজ মঞ্জট সভাতে সবার উদ্দেশে বলেন। এরপর তিনি রাজপুরোহিতকে বলেন, ‘রাজপুরোহিত, আপনি আমাদের বিবাহের সকল ব্যবস্থা এখুনি করুন।’ মহারাজা মঞ্জট তার বিবাহ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে সভা না ত্যাগ করতে আদেশ করেন। 

রাজপুরোহিত অগত্যা মহারাজ মঞ্জট এবং রাক্ষসী সুনীতির বিবাহের সব কার্যক্রম শুরু করে। বিবাহ অনুষ্ঠানে যজ্ঞ এবং মন্ত্র পাঠ করা হয়। বিবাহে তেমন কোন হইচই নেই। সভাতে উপস্থিত সবাই চুপচাপ বসে আছে। কিছুক্ষণ পর মহারাজ মঞ্জট এবং রাক্ষসী সুনীতির বিবাহ সম্পন্ন হয়। সারা লাগগিন্তা রাজ্যে যেন এক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। সবার ইচ্ছে ছিল তাদের মহারাজার বিবাহে প্রচুর আনন্দ ও হইচই করবে কিন্তু মহারাজ মঞ্জট এক রাক্ষসীকে বিবাহের খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে প্রজারা দারুন হতাশ হয়। এদিকে মহারাজা মঞ্জট এবং রাক্ষসী মহারানি সুনীতির বিবাহ সম্পন্নের পর তাদের কক্ষে যায়। দুজনের মধ্যে ভালবাসা প্রতিস্থাপিত হয়। 

পরেরদিন মহারাজা মঞ্জট ঘুম থেকে উঠে। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছে না কেন সে রাক্ষসী সুনীতিকে বিবাহ করেছে। তার সব ঘটনা স্মরণ আছে কিন্তু কিভাবে কেন সে আগেরদিন বিবাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা সে বুঝতে পারছে না। মহারাজ মঞ্জট ভাবল, ‘যা হবার হয়ে গেছে, এখন তো কিছু করার নেই।’ তাই সে তার ভাগ্য মেনে নেয়। মহারানি সুনীতির সাথে সংসার করতে শুরু করে। কয়েকমাস পরে মহারানির একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। তখন মহারাজার মনে মহারানিকে নিয়ে সন্দেহ হয় কারণ তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয় প্রায় তিন মাস আগে। তাহলে মহারানি কিভাবে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিল। মহারাজা মঞ্জট ভাবল সে মহারানি সুনীতিকে জিজ্ঞেস করবে। সন্তান জন্মের সময় মঞ্জট সেজন্য রানির পাশে থাকে নি এবং তার পুত্র সন্তানকে ছুঁয়েও দেখেনি। মহারাজা মঞ্জট অন্য কক্ষে গত কয়েকরাত কাটিয়েছে। পরেরদিন মঞ্জট তার শয়ন কক্ষে প্রবেশ করে এবং দেখে রানি তার সন্তান কোলে নিয়ে বসে আছে। তখন সে রানিকে জিজ্ঞেস করে, ‘আমাদের বিবাহ হয়েছে প্রায় তিন মাস হল তাহলে তুমি কিভাবে আমার সন্তানের মা হলে।’ তখন রাক্ষসী মহারানি সুনীতি বলেন, ‘মহারাজ আমরা রাক্ষসের জাত। শশীদের তুলনায় আমাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি অনেক দ্রুত হয়। রাক্ষসীরা তিন মাসের মধ্যে তাদের সন্তান জন্ম দিতে পারে যেখানে শশীদের সন্তান জন্ম দিতে প্রায় এক বছর সময় লাগে।’ মহারাজ মঞ্জট রানির কথা কিছুতে বিশ্বাস করতে পারেনি। কিছুক্ষণের মধ্যে দেবতা কিতমু এসে হাজির। দেবতা কিতমু তখন মহারাজা মঞ্জটকে বলল, ‘মহারানি সুনীতি সঠিক বলেছে। একজন রাজা হিসেবে তোমার তা জানার কথা মঞ্জট।’ দেবতা কিতমুর কথায় মহারাজা মঞ্জট তার ভুল বুঝতে পায় এবং সে মহারানির কাছে তার ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেয়।

দেবতা কিতমু চলে যায়। তখন রানি সুনীতি মহারাজ মঞ্জটকে বলল, ‘মহারাজ আপনি যদি কিছু না মনে করেন তাহলে আপনাকে একটি কথা জিজ্ঞেস করবো বলে অনেক দিন ধরে ভাবছি।’ মহারাজা মঞ্জট বলে, ‘বল রানি, তুমি নিশ্চিন্তে তোমার মনের কথা বলতে পার।’ তখন রানি সুনীতি বলল, ‘মহারাজ, সেই ছোটকাল থেকে শুনে আসছি যেখানে পাপের দেবতা কিতমু সেখানেই বিপদ। বিপদ তার পিছু নেয়। যেখানে দেবতা কিতমু যায় সেখানেই বিপদ। তাছাড়া যতটুকু জানি দেবতা কিতমুকে কোন চন্দ্রগ্রহবাসী তপস্যা করে না এমনকি তার নামে কেউ সন্তানেরও নাম রাখে না। কারণ দেবতা কিতমুর নাম নিলেও সেখানে বিপদ হবার সম্ভাবনা থাকে। দেবতা কিতমু শশীদের পাপের বিচার করে এবং পাপের ফল দেয়। আবার অনেককে পাপ কর্ম করতে বাধ্য করে। দেবতা কিতমু সচরাচর চন্দ্রগ্রহে আসেও না। শশীরা তাকে প্রচণ্ড ভয় পায়। তাহলে কেন মহারাজ আমি প্রায় দেবতা কিতমুকে আপনার সাথে দেখা করতে দেখি।’ মহারাজ মঞ্জট তখন রানিকে সব খুলে বলে। মঞ্জট দেবতা কিতমুর ভক্ত এবং তার সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে দুটি বরও পেয়েছে। মঞ্জট রানি সুনীতি কে সব খুলে বলল। আরো বলে যে মঞ্জটের পাওয়া বর অনুযায়ী তার গর্ভে একদিন দেবতা কিতমুর জন্ম হবে। মহারাজ রানিকে আশ্বস্ত করে বলল। 

একমাস না হতেই মহারাজা মঞ্জট ও মহারানির সুনীতির প্রথম সন্তান মারা যায়। 

চলবে...

লেখক: কবি ও লেখক, অধ্যাপক: অপরাধবিদ্যা, আইন ও বিচার বিভাগ, জন জে কলেজ, সিটি ইউনিভার্সিটি নিউইর্য়ক, মনস্তাত্তিক বিভাগ, হসটস কলেজ, সিটি ইউনিভার্সিটি, নিউইর্য়ক। কাউন্টার টেরোরিজম কর্মকর্তা, নিউইর্য়ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (এনওয়াইপিডি)।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :