‘বরইতলা গণহত্যা’ আজও কাঁদায় কিশোরগঞ্জবাসীকে

আমিনুল হক সাদী, কিশোরগঞ্জ থেকে
| আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:৪৫ | প্রকাশিত : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:৪৪

আজ ১৩ অক্টোবর। ১৯৭১ সালের এই দিনটি কিশোরগঞ্জের ইতিহাসে ছিল ভয়াবহতম। পাক হানাদার বাহিনী এদেশীয় দোসরদের সহায়তায় সদর উপজেলার কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের বরইতলা নামক স্থানে নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নির্মমভাবে গণহত্যা করে চার শতাধিক সাধারণ মানুষকে। এই দিনটি ‘বরইতলা গণহত্যা’ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে কিশোরগঞ্জবাসী।

সে দিনে হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিলেন কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের বরইতলাসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের নিরীহ মানুষ। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পার হলেও আজও বরইতলার গণহত্যায় জড়িত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়নি।

এই বর্বর হত্যাকাণ্ড থেকে সৌভাগ্যক্রমে সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন অনেকেই। সেসব স্মৃতি নিয়ে আজও বেঁচে আছেন তারা। এসব পরিবারে বুকফাটা কান্না থামছে না। বরইতলা হত্যাকাণ্ডে স্বজনহারা শত শত পরিবার এখনো মানবেতর জীবন-যাপন করছে। তাদের খবর রাখে না কেউ। এখনো মিলেনি শহীদ পরিবারের মর্যাদা।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭১ সালের এই দিনে সকাল ১০টার দিকে কিশোরগঞ্জ থেকে ট্রেনে করে পাকবাহিনী ও এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের বরইতলা নামক স্থানে এসে নামে। তারা পার্শ্ববর্তী দামপাড়া গ্রামে প্রবেশ করে ৪/৫ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে নির্বিচারে হত্যা করে। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রাণে বাঁচতে কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের দামপাড়া, কড়িয়াইল, তিলকনাথপুর, গোবিন্দপুর, চিকনিরচরসহ আশপাশের গ্রামের লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছোটাছুটি করতে থাকে। এ সময় পাকবাহিনীর এদেশীয় দোসররা গ্রামের সাধারণ মানুষকে সভা হবে বলে ডেকে বরইতলা নিয়ে যায়। এসব এলাকার সাধারণ মানুষদের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়।

এদেশীয় রাজাকার বড়খালের পাড় গ্রামের আবু বাক্কার একজন পাক সেনাকে নিয়ে লুটতরাজ করতে চৌদ্দশত ইউনিয়নের রৌহারকান্দা গ্রামে হানা দেয়। তারা পুরো গ্রামের নারীদের নাক কান ছিঁড়ে স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়। যাওয়ার পথে পূর্ব জিনারাই গ্রাম থেকে সাতজনকে ধরে নিয়ে যায়। সৌভাগ্যক্রমে তারা বেঁচে আসে।

এ সময় এক রাজাকার পাক বাহিনীর কাছে এসে খবর দেয় যে, গ্রামবাসী একজন পাক সৈনিককে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলেছে। এ গুজবের সত্যতা যাচাই না করেই বর্বর পাক বাহিনী হত্যালীলায় মেতে ওঠে। স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় হানাদার বাহিনী বরইতলায় নিরীহ গ্রামবাসীকে কিশোরগঞ্জ-ভৈরব রেললাইনের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, লোহার রড এবং রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে। এভাবে চার শতাধিক গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। দামপাড়া গ্রামের আবদুর রহিমসহ আরও কয়েকজনকে মৃতপ্রায় অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। কয়েক বছর আগে আব্দুর রহিমের মৃত্যু হয়েছে। রহিমের ভাই, ভাতিজাসহ তার বাড়ির নয়জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বড়ইতলায়।

স্বাধীনতার পর এলাকাবাসী শহীদদের স্মরণে ’বড়ইতলা’ গ্রামের নাম পরিবর্তন করে ’শহীদনগর’ এবং হত্যাকাণ্ডস্থলে একটি অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। যার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন স্বাধীন বাংলার তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

পরে ২০০০ সালে সরকারের সহযোগিতায় বরইতলা এলাকায় রেললাইনের পাশে ৬৬৭ বর্গফুট এলাকায় ২৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।

দীর্ঘদিন অযত্ন অবহেলায় থাকার পর একই স্থানে ২০০১ সালে প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে জেলা পরিষদের উদ্যোগে ৬৬৭ বর্গফুট এলাকাজুড়ে ২৫ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট একটি স্মৃতিসৌধের নির্মাণের কাজ শুরু হয়। স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। যার নকশা প্রণয়ন করেন সজল বসাক।

বছর ঘুরে ১৩ অক্টোবর এলে স্মৃতিসৌধ এলাকা ভাসে শহীদদের স্বজনদের চোখের জলে। জাতীয় শোক দিবস ও বিজয় দিবসে সরকারিভাবে এখানে অর্পণ করা হয় পুস্পার্ঘ্য।

(ঢাকাটাইমস/১৩অক্টোবর/জেবি)

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :