কী হবে ক্যাসিনোকাণ্ডে জব্দ অ্যাকাউন্টের?

বোরহান উদ্দিন
| আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০১৯, ১২:৩৫ | প্রকাশিত : ২৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:১৫
ফাইল ছবি

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর আতঙ্কে রয়েছেন রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে অনেক ব্যবসায়ী। ক্যাসিনো কারবারের মাধ্যমে অবৈধভাবে আয় ও কর ফাঁকির অভিযোগে গত এক মাসে অর্ধশতাধিক ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব তলব করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তাদের মধ্যে সংসদ সদস্য যেমন আছেন তেমনি রয়েছেন রাজনৈতিক পরিচয়ধারী বেশ কয়েকজন ঠিকাদার।

এরই মধ্যে ২৭ জনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে প্রভাবশালী অনেকেই দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন এনবিআরে।

এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া জানিয়েছেন, জব্দ অ্যাকাউন্টগুলো নিয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্ট ইউনিট (বিএফআইইউ), এনবিআর, সিআইসি ও দুদক একসঙ্গে কাজ করছে। আমলে নেয়া হচ্ছে র‌্যাব ও দুদকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য। তবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আছে সেগুলোর দিকে বিশেষ নজর দেয়া হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বেআইনিভাবে অর্থ ও সম্পদ অর্জনকারীরা অবৈধ আয় লুকিয়ে রাখাতে পারদর্শী। তাই ব্যাংক হিসাব জব্দ করাই যথেষ্ট নয়। কারণ অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনকারীদের অধিকাংশই বিদেশে অর্থ পাচার করেছে। তাদের শুধু জরিমানাসহ কর আদায় করে নিষ্কৃতি দিলে দুর্নীতি আরও উৎসাহিত হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবির) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘যারা টাকা পাচার করেছে বা যাদের আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ অর্থের খোঁজ মিলেছে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ এটা প্রচলিত আইনে এবং সাংবিধানিকভাবেও অপরাধ। কিন্তু সেখানে যদি জরিমানা বা কর দিয়ে যদি পার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয় তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।’

তিনি বলেন, ‘আশা করব, অভিযুক্তদের জরিমানা বা কর আদায় করেই ছাড় দেওয়া হবে না। পাশাপাশি পাচার করা অর্থ যেকোনো মূল্যে ফিরিয়ে আনতে হবে। আর যে বা যারাই অবৈধভাবে সম্পদ গড়েছেন তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। নইলে আসল কাজের কিছুই হবে না।’

জানা গেছে, জ্ঞাত আয় বহির্ভূত অর্থের খোঁজ পাওয়া গেলে আয়কর আইনে মামলা করার কথা বললেও বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে খোদ এনবিআর। কারণ এর আগে হাতেগোনা দুই একটি ঘটনা ছাড়া টাকা ফিরিয়ে আনার উদাহরণ নেই বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান।

বিষয়গুলো নিয়ে বেশ সতর্কতার সঙ্গে করছেন সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। স্পর্শকাতর হওয়ায় গণমাধ্যমকেও তারা এড়িয়ে চলছেন। এনবিআর ও সিআইসির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলেও তারা মুখ খুলতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, যাদের অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে এগুলোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এগুলো ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিশেষ করে যারা মানি লন্ডারিং করে টাকা পাচার করেছেন তাদের নিস্তার পাওয়া দুরূহ বলে জানা গেছে।

এনবিআরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এসব ঘটনার সমাধান যতদিন না হবে ততদিন অ্যাকাউন্টগুলোর সচল হওয়ার সম্ভাবনা কম।’

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হওয়া রাজধানীতে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন যুবলীগ, বিসিবির পরিচালক, ক্যাসিনো কাণ্ডের মূল হোতা, ঠিকাদারসহ বেশ কয়েকজন আলোচিত নেতা। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারকৃতদের বেশির ভাগেরই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে তাদের সব ধরণের ব্যাংকিং লেনদেন। আবার চট্টগ্রামের হুইপ সামশুল হক চৌধুরীসহ অনেকের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে টাকা পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায়।

অন্যদিকে যুবলীগের সদ্য সাবেক সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী ও তার পরিবার এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টও জব্দ করা হয়েছে। শুধু তিনিই নন, সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওসার, তার পরিবার এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। গত ২১ অক্টোবর জব্দ করা হয় ২০ জনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। এ ছাড়াও ভিন্ন ভিন্ন আদেশে বাকিদের অ্যাকাউন্ট স্থগিতের আদেশ দেওয়া হয়। আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ১১৬ ধারার ক্ষমতাবলে এটা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর দিকেই এর সঙ্গে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় তাদের আয় ব্যয়ের খোঁজ নেয়া শুরু হয়। আইন শৃংখলা বাহিনীর অভিযানে বিপুল অর্থের সন্ধানও পাওয়া যাচ্ছে। পরে এসব তথ্য তাদের আয়কর নথিতে দেয়া আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে প্রথমে তলব করা হয়। পরে সিআইসিকে এসব তথ্য তদন্ত ও ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করতে বলা হয়।

বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হলেও এগুলো ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে কি করবে এনবিআর- এমন প্রশ্নের জবাবে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুইয়া বলেন, ‘পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি একটু জটিল। দেশে এক কি দুইটি উদাহরণ এভাবে আছে টাকা ফিরিয়ে আনার। কারণ অপরাধ প্রবণ মানুষ এরা কোথায় টাকা নিয়ে যায় তার হদিস অনেক সময় পাওয়া যায় না।’

মানি লন্ডারিং বন্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিএফআইইউ, এনবিআর, দুদক সবাই একযোগে কাজ করছি। নজর রাখছি এলসি খোলার পর সেই টাকা ফেরত আসছে কি না। এসব ঘটনায় মামলা হচ্ছে। মানি লন্ডারিং এর মামলা খুব কঠোর। এই ঘটনায় জড়িত থাকলে শাস্তি তো অবশ্যই হবে। আর যদি অপরাধী নাও হয় তাহলে যে প্রক্রিয়া আছে সেটা থেকে বের হয়ে আসতেও সময় লাগবে। যারা একবার মানি লন্ডারিংয়ে পড়ে তাদের অনেকেই সর্বশান্ত হয়ে যায়।’

জব্দ অ্যাকাউন্টের সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এসবের ফলাফল কী হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কারণ যারা অবৈধ উপায়ে কালো টাকা আয় করেন, তারা সব টাকা ব্যাংকে রাখেন না। অন্য উপায়ে টাকা সংরক্ষণ করেন। এনবিআর শুধু ব্যাংকিং সিস্টেমে টাকার অনুসন্ধান করছে। সেখানে যা পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই ফলাফল হবে। তবে যাদের কাছে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ পাওয়া গেছে সেই টাকার জরিমানাসহ কর আদায় করে এনবিআর ও দুদক মামলা করবে।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :