ব্যাংকে ধারাবাহিক কমছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি

রহমান আজিজ
 | প্রকাশিত : ৩০ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:৪৮

দেশে ব্যাংক ব্যবস্থায় ধারাবাহিকভাবে কমছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি। গত ৮ মাসে এ খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের তারল্য সংকট, উচ্চ ঋণের সুদহার ও অবকাঠামোগত সমস্যা এবং নতুন বিনিয়োগের অভাবে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট চলার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে বেশি সুদে সঞ্চয়পত্রে আমানত চলে যাওয়ার কথা। তাই চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ঋণ দিতে পারছে না ব্যাংকগুলো। আবার উচ্চ সুদহারের কারণে ঋণ নিতে আগ্রহী নন উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা। ফলে গত কয়েক মাসে আমদানিও কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৮ সালের আগস্টের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আর গত সেপ্টেম্বর শেষে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। তার আগের মাস জুলাইয়ে ছিল ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ, জুন মাসে ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ; মে মাসে ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ; এপ্রিলে ১২ দশমিক ০৭ শতাংশ, মার্চে ১২ দশমিক ৪২ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং জানুয়ারিতে ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ।

এদিকে সেপ্টেম্বর মাস শেষে বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ১৬ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময় শেষে ঋণ ছিল ৯ লাখ ১৮ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরে ঋণ বেড়েছে ৯৭ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। এর আগে আগস্ট মাসে ঋণস্থিতি ছিল ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে জুন নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছিল ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। কিন্তু এর বিপরীতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। এর আগে প্রথমার্ধে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৬ দশমিক ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হলেও অর্জিত হয় মাত্র ১৩ দশমিক ৩০ শতাংশ।

এদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমিয়ে চলতি অর্থবছরের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন এ মুদ্রানীতিকে কর্মসংস্থানমুখী প্রবৃদ্ধি সহায়ক ও সংকুলানমুখী মুদ্রানীতি বলছেন গভর্নর ফজলে কবির।

নতুন মুদ্রানীতিতে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত লক্ষ্য ঠিক করেছে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ, যা গেল অর্থবছরের জুন পর্যন্ত লক্ষ্য ছিল ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের (জুলাই-জুন) পর্যন্ত সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ করা হয়েছে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। আর অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশ।

ব্যাংক ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির এই ক্রমাবনতির বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে খুব বেশি আগ্রহী হচ্ছেন না। কারণ, ঋণের সুদহার দুই অঙ্কের ওপরে। এ ছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিও মন্থর হয়ে গেছে। তাতে কমছে রপ্তানি আয়ও। এ কারণে ব্যাংক খাতে ঋণের চাহিদা কিছুটা কমে গেছে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭ সালের মাঝামাঝি বেসরকারি খাতের ঋণ হু হু করে বাড়ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে বেসরকারি খাতে সর্বোচ্চ ১৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি হয় ২০১৭ সালের নভেম্বরে। ফলে ঋণপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ২০১৮ সালের শুরুতেই ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কিছুটা কমিয়ে আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারপর থেকে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে।

এরপর কয়েক দফা এডিআর সমন্বয়ের সীমা বাড়ানো হলেও নানা কারণে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না। নি¤œমুখীর ধারা অব্যাহত আছে। তবে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এডিআর হার বাড়িয়ে পূর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়েছে। তাই আগামীতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট রয়েছে। তারা আমানত পাচ্ছে না। যার কারণে চাহিদা অনুযায়ী ঋণ দিতে পারছে না। এ ছাড়া যেসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো, তারাও ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে খুব যাচাই-বাছাই করছে। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতের ঋণ কমে গেছে। এভাবে বেসরকারি খাতের ঋণ ধারাবাহিক কমতে থাকলে ভবিষ্যতে অর্থনীতির অবস্থা খারাপ পর্যায়ে চলে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন আহসান এইচ মনসুর।  কারণ হিসেবে বলেন, ‘বিনিয়োগ না বাড়লে, নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে উন্নয়ন হবে না। যেকোনো মূল্যে সরকারকে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।’

(ঢাকাটাইমস/৩০অক্টোবর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :