রাজধানীতে রিকশার ব্যাটারিতে চার্জ

পৌনে ৩০০ কোটি টাকার বিদ্যুতের অধিকাংশই চুরি

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০৭ নভেম্বর ২০১৯, ০৮:৪৫

মূল কেন্দ্র ছাড়া রাজধানী জুড়ে এখন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশার রাজত্ব। তাদের দাপটে কোথাও কোথাও পায়েচালিত রিকশা উধাও। সড়কে অননুমোদিত বলে এর কোনো পরিসংখ্যান নেই সরকারি কোনো দপ্তরে। তবে বিভিন্ন স্থানে সরেজমিনে ঘুরে যে তথ্য মিলেছে তাতে রাজধানীতে অন্তত দেড় লাখ ইজিবাইক ও ব্যাটারি রিকশা চলাচল করছে। আর তাতে প্রতিদিন বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ইউনিট। বছরে ৩২ কোটি ৮৫ লাখ ইউনিট, যার রাজস্ব মূল্য প্রায় ২৭৬ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাটারি রিকশার একটা বড় অংশে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয় অবৈধ সংযোগ থেকে। ফলে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত হয় বিপণন সংস্থাগুলো। ডিপিডিসির বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের অভিযান পরিচালনা করলেও খুব একটা সফল হচ্ছে না গ্যারাজ মালিকদের কৌশলের কারণে। তাই ডিপিডিসি ব্যাটারিচালিত রিকশার বিদ্যুতের জন্য আলাদা একটি ট্যারিফের ব্যবস্থা করেছে। তাতে অনেক রিকশা মালিক বৈধ বিদ্যুৎ সেবা নিচ্ছেন বলে জানান কর্মকর্তারা। কিন্তু সেটি সামান্য।

তার ওপর ব্যাটারি চার্জের জন্য বিদ্যুতের সহজলব্ধতার সুযোগ নিয়ে প্রতিদিনই নতুন নতুন ব্যাটারি রিকশা রাস্তায় নামছে। বৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে ব্যাটারির সংখ্যাভেদে একটি রিকশার জন্য বিদ্যুৎ খরচ হয় ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা। অনেক জায়গায় অবৈধভাবে সংযোগের বেলায়ও একই টাকা নেওয়া হয়। কোথাও কোথাও কিছুটা কম। ব্যাটারি চার্জের জন্য রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে বহু গ্যারাজ।

রাজধানীর শনিরআখড়া এলাকায় এমন কোনো সড়ক নেই, সেখানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দেখা মিলছে না। চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় রিকশামালিকদের একটি অংশ প্রতিদিনই এই রিকশা ও ইজিবাইকের আমদানি বাড়িয়ে চলেছে। আবার তাদেরই একটি অংশ বিদ্যুৎ চুরির সঙ্গে জড়িত।

বাংলাদেশ রিকশা-ভ্যান চালক ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আর এ জামানের তথ্যমতে, শনিরআখড়া, কাজলা, কুতুবখালি, মিরহাজিরবাগ, মিঠাবাড়ি, গাবিন্দপুর, মাতুয়াইল, নয়ানগর, কদমতলী ও রায়েরবাগ এলাকায় ২০ হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। শুধু শনিরআখড়া এলাকায় এই সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। এসব এলাকায় চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার।

ব্যাটারি রিকশার কারণে তারা চাপে আছেন উল্লেখ করে আর এ জামান বলেন, ‘আমরা যারা পায়ের রিকশার মালিক, তারা চাপে আছি। প্রতিদিনই ব্যাটারিচালিত রিকশা বাড়ছে। আর তাতে আমাদের ক্ষতি করছে।’

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর এলাকায় এখন যাতায়াতের মূল বাহন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। এই এলাকার তিনটি ওয়ার্ডে (ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড) চলাচল করছে পাঁচ হাজারের বেশি ব্যাটারি রিকশা। এগুলোর ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয় স্থানীয় গ্যারাজগুলোতে।

একই অবস্থা গাবতলী, দ্বীপনগর, নবীনগর, মোহাম্মদপুর, কাটাসুর, রায়েরবাজার এালাকায়। এসব এলাকায় রয়েছে তিন হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা।

বাড্ডা, মুগদা, মান্ডা, রামপুরা, বনশ্রী এলাকায় এই সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। খিলক্ষেত-ইছাপুরা এলাকায় চলাচল করছে ইজিবাইক ও ব্যাটারি রিকশা প্রায় ৭০০।

উত্তরার আজমপুর, দিয়াবাড়ি, ধউর, তুরাগ এলাকায় এ ধরনের রিকশার আধিক্য দিন দিন বাড়ছে। বর্তমান সংখ্যা দুই হাজারের কম নয় বলে জানান স্থানীয় চালকরা।

মিরপুর মাজার রোড, কোনাবাড়ি, বেড়িবাঁধ, মিরপুর-১১, ১২, ১৪ নম্বর, রূপনগর, সেকশন-২, ৭ এলাকায় রয়েছে আরও চার থেকে পাঁচ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা।

উত্তরখান ও দক্ষিণখান, ময়নারটেক, তেরমুখ ব্রিজ এলাকা পর্যন্ত চলাচলের মাধ্যম ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক। এখানে এ ধরনের রিকশার সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। আর ইজিবাইক ৯ হাজারের বেশি বলে জানা গেছে।

রাজধানীতে প্রকৃতপক্ষে কত পরিমাণ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক রয়েছে, তার নির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই কারও কাছেই। ঢাকা টাইমসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর কেন্দ্র ও অভিজাত এলাকা বাদে বাকি সব জায়গাতেই এ ধরনের রিকশা চলাচল করছে। ঢাকার নিম্নাঞ্চল হিসেবে পরিচিত বেড়িবাঁধ এলাকা, পুরান ঢাকা, সদরঘাট, বাবুবাজার, জিনজিরা এলাকায় এ ধরনের রিকশার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

অনুসন্ধান বলছে, রাজধানীতে ১ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে। আর ইজিবাইকের সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি। প্রতিটি ইজিবাইকে (বড়) ৬০ বোল্টের পাঁচটি ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। ছোটগুলোতে চারটি ব্যাটারি। আর হালকা রিকশায় তিনটি। সেই হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৬ লাখ ব্যাটারি চার্জ হয়।

চালক ও গ্যারাজমালিকরা জানান, প্রতিটি ইজিবাইক (৬০ ওয়াটের পাঁচ ব্যাটারি) ছয় ঘণ্টা চার্জ দিতে ৮ থেকে ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। পুরনো ব্যাটারির ক্ষেত্রে আরও বেশি বিদ্যুৎ লাগে। অর্থাৎ প্রতিটি নতুন ব্যাটারি প্রতিদিন দেড় থেকে দুই ইউনিট বিদ্যুৎ টানে পূর্ণ চার্জ হওয়ার জন্য।

প্রতিটির জন্য সর্বনিম্ন দেড় ইউনিট ধরে ছয় লাখ ব্যাটারির দৈনিক ও মাসিক বিদ্যুৎ খরচের একটা হিসাব করতে পারি আমরা। এই হিসাবে প্রতিদিন ছয় লাখ ব্যাটারির জন্য বিদ্যুৎ খরচ হয় ৯ লাখ ইউনিট। মাসে দাঁড়ায় ২ কোটি ৭০ লাখ ইউনিট।

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) মূল্য তালিকা অনুযায়ী, মধ্যমচাপে ১১ কেভি বিদ্যুতের বাণিজ্যিক বাজার মূল্য প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ৪০ পয়সা। এই হারে প্রতিদিন রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার পেছনে খরচ হচ্ছে ৭৫ লাখ ৬০ হাজার টাকার বিদ্যুৎ, যা মাসে দাঁড়ায় ২২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। বছরে (৩৬৫ দিনে) ২৭৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

এই বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারের খুব সামান্য অংশের রাজস্ব পায় ডিপিডিসি। কেননা এসব রিকশার বেশির ভাগই চার্জ দেওয়া হয় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে। এই প্রতিবেদন তৈরির জন্য সরেজমিনে গিয়ে একই তথ্য মিলেছে।

সরেজমিনে কয়েকজন রিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলে এসব রিকশার গ্যারাজে বিদ্যুৎ চুরির কয়েকটি কৌশলের কথা জানা গেছে। গ্যারাজের জন্য বিদ্যুতের বৈধ লাইন নেওয়া হলেও রিকশার চার্জ দিতে এই সংযোগ ব্যবহার করা হয় না। বিদ্যুৎ মিটারে প্রবেশের আগে অবিনক কৌশলে আলাদা বৈদ্যুতিক তারের মাধ্যমে সংযোগ নেওয়া হয় ব্যাটারির লাইনে।

আবার কেউ কেউ সন্ধ্যার পর আংটার মাধ্যমে একটি তার বৈদ্যুতিক খুঁটির ১১ হাজার ভোল্টেজের তারের সঙ্গে যুক্ত করে দেন। আর লোকচক্ষুর আড়ালে মাটিতে পুঁতে রাখা থাকে বিদ্যুতের ঋণাত্মক অংশটি। রাতভর এই সংযোগ থেকে গ্যারেজের রিকশায় চার্জ দেওয়া হয়। ভোরবেলা আংটার সংযোগ সরিয়ে নেয়া হয়।

আবার মিটারে কোনো রিডিং উঠবে না এমন ব্যবস্থার কথাও জানা গেছে সরেজমিনে। মিটার রিডাররা একটা মনগড়া রিডিং শুরু করে এবং পরবর্তীতে এটার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে বিল করতে থাকেন। টাস্কফোর্সের বড় কোনো বিপদের আশঙ্কা দেখলে মিটার নষ্ট করে ফেলা হয়।

এই সব কটি ক্ষেত্রেই বিদ্যুৎ অফিসের স্থানীয় মিটার রিডার ও সংশ্লিষ্ট লোকজনের সঙ্গে যোগসাজশ থাকে গ্যারাজ মালিকের।

তবে ভাড়ায় চালান না, এমন রিকশাচালকদের বেশির ভাগ বাসাবাড়ির বৈধ সংযোগ থেকে রিকশার ব্যাটারিতে চার্জ দেন। তারা জানান, তাতে মাসে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকার বিদ্যুৎ বিল দিতে হয় তাদের।

গাবতলি এলাকার রিকশাচালক জুয়েল রানা ঢাকা টাইমসকে জানান, তার চার ব্যাটারির রিকশার জন্য তিনি গ্যারাজে বিদ্যুতের বিল দেন মাসে ১ হাজার ৮০০ টাকা।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্যারাজগুলোতে ছোট রিকশায় দুই হাজার টাকার মধ্যে এবং ইজিবাইকে (বড়)  তিন হাজার টাকায় চার্জ দেওয়া হয়।

বিপুল ব্যাটারি রিকশায় বিদ্যুৎ চুরির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘যেহেতু বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে, তাই গত বছর অটোরিকশার গ্যারাজগুলো আমরা যুক্ত করেছি। আমরা তাদের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। তাদের জন্য আলাদা একটি ট্যারিফ করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী রিকশা মালিকদের অনেকেই বৈধ বিদ্যুৎ সেবা নিচ্ছেন।’

তবে শতভাগ বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি জানিয়ে ডিপিডিসির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা আমাদের প্রতিদিনের কাজ। তারপরও বলা যায় না যে লোকজন বিদ্যুৎ চুরি করছে না। আমাদের ৩৬টি দপ্তরের কর্মকর্তারা প্রতিদিন এ বিষয়ে কাজ করছেন। আমাদের কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্স আছে, তারাও কাজ করছে।’

২০১৭-১৮ অর্থবছরে ডিপিডিসির প্রতিবেদন বলছে, স্পেশাল টাস্কফোর্সের মাধ্যমে ১৫১টি অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ ২০৬টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ডিপিডিসি। এ সময় তারা ৪৮ লাখ ৮১ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ চুরি উদঘাটন করে। এর বিপরীতে ১৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা জরিমানা ধার্য করা হলেও আদায় হয়েছে ৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

রাজধানীতে চলাচলের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতা এবং তাদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের সুবাদে অবাধে চলছে এসব অবৈধ রিকশা ও ইজিবাইক। এই প্রভাবশালী কারা, ‘পুলিশ’ ও স্থানীয় ‘রাজনৈতিক নেতা’দের নাম বলেন চালকরা।

(ঢাকাটাইমস/৭নভেম্বর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :