যত শাস্তি দেন, বড় শাস্তি পেয়ে গেছি: ওসি মোয়াজ্জেম

আদালত প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১০:৫৪ | প্রকাশিত : ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ২৩:১৩

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির জবানবন্দির ভিডিও করা এবং তা ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগের মামলায় যত বড় শাস্তিই দেয়া হোক না কেন, তার চেয়ে বড় শাস্তি পেয়েছেন বলে মনে করছেন সোনাগাজী মডেল থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন।

এতদিন আদালতে তাকে হাসিমুখে দেখা গেলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ওই মামলায় বৃহস্পতিবার ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারকের সামনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন পুলিশের এ কর্মকর্তা।

আত্মপক্ষ সমর্থনে দাঁড়িয়ে বিচারককে তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগে যত বড় শাস্তিই দেন না কেন, তার চেয়ে বড় শাস্তি আমি পেয়ে গেছি।’

কিভাবে বড় শাস্তি পেয়েছেন বলতে গিয়ে মোয়াজ্জেম বলেন, ‘সামাজিকভাবে এই মামলার কারণে হেয় হয়েছি অনেক। আমার ১৫ বছরের ছেলে স্কুলে যেতে পারে না। আমি ১০টা খুন করলেও এত বড় সাজা হত না। ৭০/৭৫ বছর বয়সী আমার মা, আমার মেয়ে এই ঘটনায় খুব মর্মাহত হয়েছেন।’

গত মার্চ মাসে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত তার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে সেসময় ওসি মোয়াজ্জেম তার জবানবন্দি ভিডিও করেন। অধ্যক্ষের সহযোগীরা নুসরাতের শরীরে আগুন লাগিয়ে দেয়ার পর সেই ভিডিও ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনায় পড়েন তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম। নুসরাতের মৃত্যুর পর ১৫ এপ্রিল ওসি মোয়াজ্জেমকে আসামি করে বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন।

বিচারকের কাছে কাঁদতে কাঁদতে মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আমি কী অপরাধ করলাম! উনি (বাদী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন) যদি ভিডিওটা পুরোপুরি দেখতেন তবে এই মামলা করতেন না। উনি ভিডিও ঠিকমত দেখেনই নাই।’

‘গত ৬/৭ মাস আমাকে সারা বিশ্বে কলঙ্কিত করা হয়েছে। চাকরি থেকে আমাকে রংপুরে ক্লোজ করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে জুতা মিছিল পর্যন্ত হয়েছে। অথচ আমি এই মামলায় আইওকে (তদন্তকারী কর্মকর্তা) সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিয়েছি। আমার মোবাইল তার কাছে জমা দিয়েছি। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য যে এমন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে মামলা পড়েছে যিনি আইন অনুযায়ী তদন্ত করেননি। উনি (আইও) নিজেই তদন্তের প্রয়োজনে ছবি তুলেছেন।’

বিচারক তখন জিজ্ঞাসা করেন, জবানবন্দি নেওয়ার সময় তদন্ত কর্মকর্তা মোয়াজ্জেমের কোনো ভিডিও করেছেন কি না। উত্তরে মোয়াজ্জেম বলেন, ‘না। আমার থানায় সিসি ক্যামেরা আছে। আমি তদন্ত কর্মকর্তাকে যে স্ক্রিন শট দিয়েছি, সেখানে তারিখ দেখে তিনি ঘটনার সময় উল্লেখ করেছেন।’

‘অ্যাডিশনাল ডিআইজি ফায়েজ স্যার আমার কাছ থেকে ভিডিও নিয়েছে। সেটা আমি তাকে হোয়াটসঅ্যাপে দিয়েছি। আমি নিজে ফেসবুক ব্যবহার করি না। শুধু ঘটনার পরদিন ৯ তারিখ রাতে এসপি সাহেব ফেইসবুকে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে দেন। দুদিন পরই আমি তা আবার ডিঅ্যাক্টিভেট করে দিই।’

মামলা দায়ের বা তদন্তের জন্য ভিডিও করার কোনো নির্দেশনা আইনে আছে কি না- বিচারকের জিজ্ঞাসার মোয়াজ্জেম বলেন, ‘সেরকম কোনো আইন নেই। তবে আপডেটেড টেকনোলজির কারণে আমরা অনেক কিছু ভিডিও করে রাখি। এটা আমাদের প্র্যাকটিস, এক্ষেত্রে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের কিছু নির্দেশনাও আছে।’
তখন বিচারক বলেন, ‘বাদী, সাক্ষী তো দূরে থাক, গ্রেপ্তারের পর আসামির ভিডিও বা ছবি না তোলার ব্যাপারে হাইকোর্টের নির্দেশনাই তো আছে।’

জবাবে মোয়াজ্জেম বলেন, ‘জি, তা আছে। এগুলো ভিডিও করে আমরা কাউকে দিই না। শুধুমাত্র আদালত চাইলে সাক্ষ্য হিসেবে তা উপস্থাপন করা হয়। আমরা এটা ফেসবুক বা ইউটিউবে পোস্ট করি নাই। কীভাবে সোশাল মিডিয়ায় গেছে তা আমি জানি না।’

‘জ্ঞানতঃ আমি কোনো অপরাধ করি নাই। আমি মুসলমান, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। আমি স্যারের কাছে ন্যায়বিচার চাই।’

মোয়াজ্জেমই ওই ভিডিও ছড়িয়েছেন- পিবিআইয়ের এমন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চার মাস আগে মামলার বিচার শুরু হয়। এখন আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের মধ্য দিয়ে প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছালো। আদালত আগামী ২০ নভেম্বর যুক্তিতর্কের তারিখ ধার্য করেন।

উল্লেখ্য, গত ২৭ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রীমা সুলতানা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর ট্রাইব্যুনালের বিচারক আসামি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর ১৬ জুন আগাম জামিনের চেষ্টায় গোপনে হাইকোর্টে গেলে শুনানি হওয়ার আগেই পুলিশ শাহবাগ এলাকা থেকে ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তার করে। ১৭ জুন এই পুলিশ কর্মকর্তার জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক।
গত ২৪ অক্টোবর নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ফেনীর নারী ও শিশুনির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।

ঢাকাটাইমস/১৪নভেম্বর/ডিএম

সংবাদটি শেয়ার করুন

আদালত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :