পঙ্গু হাসপাতাল

চোরের পেটে যাচ্ছে রোগীর দামী ওষুধ!

সিরাজুম সালেকীন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২০, ২০:০৫ | প্রকাশিত : ১৬ মার্চ ২০২০, ১৮:৫৪

পোশাক শ্রমিক রাবেয়া খাতুনের ১৫ দিনের পঙ্গু হাসপাতাল বাসের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। সড়ক দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত নিয়ে তাকে এই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতিদিনই কিনতে হতো নানা রকম ওষুধ। এসব দামী ওষুধ কিনতে তাকে ধারদেনা পর্যন্ত করতে হয়েছে। কিন্তু সেসব ওষুধ তাকে সারিয়ে তোলার পরিবর্তে করেছে হন্তদন্ত। হাসপাতালে বেড থেকে চুরি যেত তার কিনে আনা ওষুধ। হাসপাতালে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ জানিয়েও এর কোনো প্রতিকার পাননি এই অসহায় নারী।

এই একটি ঘটনায় নয়, অনুসন্ধানে নেমে দেশের প্রধান এই পঙ্গু হাসপাতালে রোগীদের নিয়মিত ওষুধ চুরি যাওয়ার নানা ঘটনা উঠে এসেছে। এমন একাধিক অভিযোগ পেয়ে গত রবিবার র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব ওষুধ চুরির সঙ্গে জড়িত চক্রের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

আব্দুর রব রবু নামের ওই ব্যক্তি হাসপাতালটিরই পরিচ্ছন্নতা কর্মী। তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাব জানতে পেরেছে ওষুধ চুরির চক্রটির সঙ্গে জড়িতদের প্রায় সবাই পঙ্গু হাসপাতালে চাকরি করেন। তারাই দীর্ঘদিন ধরে রোগীদের ওষুধ চুরি করে বাইরে বিক্রি করত।

ঢাকা টাইমসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের জরুরি ও দামি ওষুধ চুরি করে তা বাইরের ফার্মেসিতে বিক্রি করছে একটি সিন্ডিকেট। অপারেশন থিয়েটার, ওয়ার্ড ও কেবিনে থাকা রোগীদের ওষুধই বেশি চুরি যাচ্ছে। হাসপাতালেরই আয়া, বুয়া ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা এই অপকর্মে জড়িত। দশবছরেরও বেশি সময় ধরে চক্রটি হাসপাতালে সক্রিয়। তবে কখনো রোগীদের থেকে অভিযোগ পাননি বলেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য।

ওষুধ চুরিতে হাসপাতালের কর্মীদের যোগসাজশ থাকার বিষয়ে জানতে জাতীয় ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থোপেডিক রিহ্যাবিলিটেশন ইনস্টিটিউট-নিটোর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবদুল গনি মোল্লাহ বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে পরিচালকের সহকারী ও হাসপাতালের সমাজসেবা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত জয়নুদ্দিন মিয়া ওষুধ চুরিতে হাসপাতালের কর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। এমনকি হাসপাতালের এক কর্মীর গ্রেপ্তারের বিষয়টিও তার জানা নেই বলে দাবি করেন তিনি।

জয়নুদ্দিনের দাবি, বিগত সময়ে ওষুধ চুরির বিষয়ে কোনো রোগীই কখনো অভিযোগ করেনি। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সাহায্য নিয়ে দালাল ও প্রতারক চক্রটি ধরতে প্রতিনিয়ত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে সরিষার মধ্যে ভূত থাকলে তাদের কিছু করার সুযোগ কম থাকে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মকর্তা ঢাকা টাইমসকে জানান, ওষুধ চুরির অভিযোগ প্রায় সময় রোগীরা করে থাকেন। কিন্তু নিজেদের মধ্যে এই ঘটনায় এই সমস্যার সমাধান হয় না। এটা সরিষার মধ্যে ভূত থাকার মতো। এখানে একটা সিন্ডিকেট এসব অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত। এদের মধ্যে সিনিয়র স্টাফ নার্স থেকে ওয়ার্ড বয়রা জড়িত।

র‌্যাবের ভাষ্য, ওষুধ চোর সিন্ডিকেটটি ধরতে গত রবিবার রাতে শেরে বাংলা নগর এলাকায় অভিযান চালায় তারা। অভিযানে চক্রের অন্যতম হোতা আব্দুর রব রবুকে গ্রেপ্তার করা হয়। জব্দ করা হয় রোগীদের কাছ থেকে চুরি করা বিপুল পরিমান ওষুধ। গ্রেপ্তারের পর এই চক্রের বেশ কয়েকজনের নাম জানিয়েছে রবু।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রব জানিয়েছেন, তিনি শ্যামলী ১ ও ২ নম্বর রোডে ময়লা পরিস্কারের কাজ করেন। পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের অপারেশনের জন্য চিকিৎসকরা যেসব ওষুধ লিখে দেন তার একটা অংশ অপারেশন শেষে থেকে যায়। প্রতিদিন ভোরে হাসপাতাল পরিচ্ছন্নতার আড়ালে হাসপাতালের কর্মচারিদের মাধ্যমে এসব ওষুধ ও সার্জিক্যাল সামগ্রী তারা চুরি করে নিয়ে যায়। পরে সেসব ওষুধ হাসপাতালের আশপাশের ফার্মোসিতে বিক্রি করা হতো।

র‌্যাব-২ এর কোম্পানী কমান্ডার (সিপিসি-২) মেজর এইচ এম পারভেজ আরেফিন ঢাকা টাইমসকে জানান, পঙ্গু হাসপাতাল থেকে রোগীদের ওষুধ চুরি করে শেরেবাংলা নগরের মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘরের পাশে একটি টং ঘরে রাখা হতো। সেখানে অভিযান চালিয়ে আব্দুর রব রাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার ওই টং ঘর থেকে বিপুল পরিমান ওষুধ জব্দ করা হয়। এর মধ্যে অপারেশন থিয়েটারে ব্যবহৃত বিভিন্ন ওষুধ ও সার্জিক্যাল সামগ্রী রয়েছে।

মেজর আরেফিন বলেন, ‘এই চক্রে জড়িতদের মধ্যে হাসপাতালের ওটির আয়া রোকেয়া, শাপলা ও পারুলের নাম প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। দশ বছর ধরে তারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত। তবে মূলহোতাদের নাম বলতে কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে গ্রেপ্তার রবু।

হাসপাতালের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হলেও রবুর বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে পারে না উল্লেখ করে র‌্যাবের এই কোম্পানি কমান্ডার বলেন, ‘হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় তার নিজস্ব সিন্ডিকেট বাহিনী আছে। তাছাড়া কমমূল্যে ওষুধগুলো কিনে বেশি দামে বিক্রির করার সুযোগ কাজে লাগায় ফার্মেসিগুলো। আমাদের বিভিন্ন অভিযানে কলেজগেটের বিভিন্ন ফার্মেসিতে এমন ওষুধ অনেকবার পাওয়া গেছে। এই চক্রটিই এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত।’

প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধকালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিতে ১৯৭২ সালে রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে গড়ে তোলা হয় অর্থোপেডিক এই হাসপাতালটি। সেসময় তাদের তত্বাবধানে কৃত্তিম অঙ্গ তৈরি ও সংযোজন করা হতো। ২০০২ সালে নাম পরিবর্তন করে জাতীয় ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থোপেডিক রিহ্যাবিলিটেশন ইনস্টিটিউট (নিটোর) নামকরণ করা হয়।

হাসপাতালটির বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা সব রোগীদের পদে পদে টাকা দিতে হয়। বিনা মূল্যের ড্রেসিং সেবায়ও টাকা ঢালতে হয় রোগীদের। এছাড়াও যেসব সেবা বিনা মূল্যে পাওয়ার কথা, অর্থ খরচ না করলে এর সামান্যটুকুও মেলে না গুরুত্বপূর্ণ এই হাসপাতালে।

(ঢাকাটাইমস/১৬মার্চ/এসএস/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অপরাধ ও দুর্নীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :