সবার প্রিয় ছিলেন তিনি

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২০, ১৬:১২ | প্রকাশিত : ০৬ এপ্রিল ২০২০, ১৪:৫৫

সকালে ফোন করলেন এক ঘনিষ্ঠজন। বড় ভাই বলে ডাকি। দুদকের কর্মকর্তা। এমনি সময় ফোনে তার কণ্ঠে যে প্রাণবন্ত ভাব খেয়াল করি, আজ তা নেই। বললাম, ‘মন খারাপ ভাই?’

বললেন, ‘খুবই। প্রিয় একজন মানুষকে হারালাম।’

ততক্ষণে জেনেছি করোনাভাইরাস কেড়ে নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক (প্রশাসন) জালাল সাইফুর রহমানকে। সোমবার ভোরে উত্তরায় কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে তিনি মারা যান। সেখানে তার চিকিৎসা চলছিল।

বললাম, ‘জালাল সাহেবের কথা বলছেন?’

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ। স্যার খুব অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন। এত সৎ, নির্ভীক ও চৌকস কর্মকর্তা সচারাচর দেখা যায় না। গত ২৫ মার্চও অফিসে এসেছিলেন। শরীরটা তখন থেকেই অসুস্থ ছিল। শুনেছি ২২ বা ২৩ মার্চ থেকে সামান্য জ্বর ছিল শরীরে। আসছিল, ছাড়ছিল। তারপর তো শুনলাম গত শনিবার তাকে আইসিইউতে নিতে হয়েছে।’

বললাম, ‘কীভাবে সংক্রমণ হলো, এমন কিছু কি কেউ ধারনা করতে পেরেছে?’

বললেন, ‘না, তিনি তো বিদেশেও যাননি অনেকদিন। যতটুকু জানতাম অফিস আর বাসাই ছিল তার গন্তব্য। তবে সম্প্রতি দুদকের নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সার্বক্ষণিক জড়িত ছিলেন। বাইরে পরীক্ষার কেন্দ্রেও গিয়েছেন। দিন-রাত অত্যধিক পরিশ্রম করেছেন তিনি। এখন সেখান থেকে আক্রান্ত কারো সংস্পর্শে এসেছেন কিনা, বলা যাচ্ছে না।’

বিসিএস (প্রশাসন) ২২ ব্যাচের এই কর্মকর্তা পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে। সব সময় প্রচার বিমুখ ছিলেন। আড়ালে থেকেই দায়িত্ব পালন করতে পছন্দ করতেন।

তার এক ছেলে। পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্ত্রীর বড় ভাইও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। জালাল সাইফুর রহমানের বাবাও ছিলেন দুর্নীতি দমন ব্যুরোর কর্মকর্তা ও পুলিশ অফিসার। বাবার সূত্রে দুদক তার প্রিয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখানকার সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে তিনি আপন করে নিয়েছিলেন।

আমার ঘনিষ্ঠজন বলছিলেন, তিনি ফেনীর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে দুদকে এসেছিলেন উপ-পরিচালক হয়ে। তখন তিনি সিনিয়র সহকারী সচিব। বিভিন্ন উপজেলায় নির্বাহী অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন সততা ও দক্ষতার সাথে। দুদকে এসে কম সময়ের মধ্যে ঊর্ধ্বতন-অধস্থনদের মন জয় করেছিলেন, কাজ দিয়ে। স্বভাবে খুবই বিনয়ী ছিলেন। সদালাপীও। কেউ কোনো সমস্যা নিয়ে গেছে ফিরিয়ে দিয়েছেন, এমন নজির কম। নিজের জ্ঞানে-অভিজ্ঞতায় যা সঠিক বলে মনে করতেন, তাই করতেন। যার যেটা সুবিধা, আইনের মধ্যে থেকে তাকে তার প্রাপ্যটা দিতেন।

দুদকে যোগ দিয়ে সংস্থাটির তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে ভূমিকা রেখেছিলেন। এমনও দেখা যেত, কনস্টেবল পদে যোগ দিয়ে কেউ কেউ অবসরেও গেছেন সে পদে। জালাল সাইফুর রহমান এসে তাদের মধ্যেও অনেককে পদোন্নতির সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এসব কারণে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে উপ-সচিব পদে পদোন্নতি হলে দুদক চেয়ারম্যান মহোদয় তাকে যেতে দেননি। দুদকেই রেখেছেন পরিচালক পদে। পদায়ন করেছেন প্রশাসন অনুবিভাগে।

অত্যন্ত কর্মঅন্তপ্রাণ মানুষ ছিলেন উল্লেখ করে দুদকের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘জালাল সাইফুর রহমান স্যার বেশ দায়িত্ববান ছিলেন। প্রতিদিন সকাল আট বা সাড়ে আটটার সময় অফিসে আসতেন। প্রতিদিনের কাজ শেষ করে সবার পরে বাসায় যেতেন। সর্বশেষ নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে শুরু করে সব নিজের হাতে করেছেন। নিয়োগ বা পদোন্নতি নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলার সুযোগ দেননি কাউকে। তিনি দীর্ঘ সময় একা একা নিজের রুমে বসে কাজ করতেন’ বলতে বলতে একসময় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছিলেন ওই কর্মকর্তা। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইলেন।

তারপর বললেন, ‘যতটুকু শুনেছি তিনি করোনা থেকে অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। আজ খুলে দেওয়ার কথা ছিল। শুনে খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু তার আগেই নাকি হার্টঅ্যাটাক হয়েছে। এখন এমন একটা অবস্থা, স্যারের জানাজাতেও যাওয়ার সুযোগ নেই। সকাল থেকে কোরআন খতম করে দোয়া করছি। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাত নসিব করেন।’

ফোনটা রাখতে রাখতে ধরা গলায় বললেন, ‘করোনা থেকে আল্লাহ যেন সবাইকে রক্ষা করেন। দোয়া করবেন ভাই।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :