প্রণোদনার অর্থ ছাড়ে বিলম্ব বিপদ বাড়াবে

সৈয়দ ঋয়াদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৮ মে ২০২০, ১৪:১৩ | প্রকাশিত : ০৮ মে ২০২০, ১২:৪০

দেশে করোনাভাইরাস বিস্তারের কারণে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখা এই উদ্যোক্তাদের এখন ত্রাহী অবস্থা। উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য সরকারের ঘোষিত প্রণোদনার দিকে চেয়ে আছেন তারা।

ঢাকাটাইমসের সঙ্গে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এফএম প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও শ্রেষ্ঠ জাতীয় এসমই পুরস্কারজয়ী উদ্যোক্তা মোহাম্মদ গাজী তৌহীদুর রহমান বলেছেন, এই প্রণোদনা ছাড়ে যত বিলম্ব হবে তত বেশি বিপদে পড়বেন উদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে কোনো ধরনের বিড়ম্বনা ছাড়াই উদ্যোক্তারা প্রণোদনার অর্থ পাবেন বলে আশা করেন তিনি।

এই উদ্যোক্তার সঙ্গে আলাপচারিতায় ছিলেন ঢাকাটাইমসের নিজস্ব প্রতিবেদক সৈয়দ ঋয়াদ।

দীর্ঘ সময় ধরে লকডাউন চলছে। উৎপাদন কিংবা পণ্য সরবরাহে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে?

আমাদের উৎপাদনে প্রভাব পড়া না পড়ার চেয়ে বড় বিষয় হলো, আমাদের ফ্যাক্টরিগুলো বন্ধ থাকলে খরচ কিন্তু কম না, ব্যবসা না করেও এই খরচ জোগাতে হচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ব্যাংক লোনের কিস্তিসহ যে নিয়মিত খরচ সেটা বন্ধ থাকে না। আমরা যারা ক্ষুদ্র-মাঝারি শ্রেণির উদ্যোক্তা, তারা কুলিয়ে উঠতে পারি না। উৎপাদন ও সরবরাহ থাকলে এসব নিয়ে ভাবতে হয় না। তাই বৈশ্বিক এই লকডাউন আমাদের বেশ পিছিয়ে দিয়েছে।

লকডাউনে আপনাদের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রেখেছেন?

পুরোপুরি বন্ধও করা যায়নি, আবার খোলাও রাখতে পারিনি, এটাই সমস্যার কথা। প্রথম লকডাউন হওয়ার পর ২৬ মার্চ বন্ধ করি, কাস্টমারের চাপে ১ এপ্রিল চালু করে আবার ৮ এপ্রিল বন্ধ করে দেই। প্রশাসনের সহায়তায় ২৩ এপ্রিল আবার চালু করি। এভাবে তিন দফায় ফ্যাক্টরি বন্ধ আর খুলতে হয়েছে। যদি এটা না করে আমাদের বলা হতো কারখানার ভেতরেই শ্রমিকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে, শ্রমিকরা বের হতে পারবে না, তাহলে আমাদের বন্ধ করতে হতো না। খুলছি-বন্ধ করছি, এ কারণে সংক্রমণ ঝুঁকি বেড়েছে।

লকডাউনে ফ্যাক্টরিতে কত লোকবল রাখতে পারছেন?

আমার এখানে কাজ করে ১৮০ জনের মতো। এখন সেটা অর্ধেকে নামিয়ে এনেছি। নিরাপদ দূরত্বে থেকে সবাই কাজ করছে। ফ্যাক্টরিতেই সবার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটা আগে করতে পারলে আরও ভালো হতো।

এখন এই সময়ে উৎপাদনে গিয়ে নিশ্চয়ই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে, বিশেষ করে পণ্যের চাহিদার ক্ষেত্রে?

হ্যাঁ, এটা বেশ ভুগিয়েছে। তবে অনেকের যেমন অর্ডার না থাকায় বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে, আমার কিন্তু সেটা নেই। আমরা এখনো প্রচুর অর্ডার পাচ্ছি। বর্তমানে ড্রাই ফুডের প্যাকেজিং, যেমন- বিস্কিট, কেকের ট্রের চাহিদা অনেক বেড়েছে। এ ছাড়া ইঞ্জেকশন এম্পুল ট্রে-এর অর্ডারও আছে। প্লাস্টিক ডিসপজিবল কাপ, প্লেট, লাঞ্চ বক্স, ফুড ট্রে, এগ ট্রে ও বিভিন্ন ধরনের ব্লিস্টার প্যাকেজিং পণ্যের চাহিদাও আছে। কিন্তু সমস্যা হলো কাঁচামালের সরবরাহ তেমন নেই।

বন্ধের সময় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছেন কীভাবে?

আমার ঢাকায় ও নরসিংদীর শিবপুরে দুই জায়গায় ব্যংক অ্যাকাউন্ট মেনটেইন করতে হয়, কিন্তু করোনার কারণে এগুলো পড়েছে লকডাউনে। এ কারণে লেনদেনও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে আমি বিকাশের মাধ্যমে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছি।

আপনার মতো উদ্যোক্তাদের জন্য এই বন্ধের প্রভাব কী হতে পারে?

এটা খুব ভালো প্রশ্ন। দেশের সবচেয়ে বড় অংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা। এদের পুঁজি অনেক বেশি নয়। এরা ক্ষতির মুখে পড়বে এটা অনেকটাই স্পষ্ট। এই দীর্ঘ বন্ধের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়বে বিশাল একটা জনগোষ্ঠী। এতে মানুষের হাতে নগদ টাকার সংকটের কারণে আমাদের পণ্যবাজার ছোট হয়ে আসবে এবং পাওনা আদায় কষ্টকর হয়ে পড়বে।

সরকার তো আপনাদের জন্য প্রণোদনা ব্যবস্থা করেছে?

হ্যাঁ, উদ্যোক্তাদের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজ অনেক আশার আলো জাগিয়েছে। এই উদ্যোক্তাদের পাশে সরকারকেই দাঁড়াতে হবে এবং মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী খুবই বিচক্ষণতার সঙ্গে সময় উপযোগী ঘোষণা দিয়েছেন। এখন প্রয়োজন এই প্রণোদনা দ্রুত সময়ে সঠিক উদ্যোক্তাদের মাঝে সুষম বণ্টন। এই টাকা ছাড় করতে দেরি করা উচিত হবে না। যত দেরি হবে বিপদ ততই বাড়বে। একদম বসে যাওয়ার পর যত সাহায্যই আসুক না কেন, উদ্যোক্তাদের ঘুরে দাঁড়ানো কষ্টকর হয়ে উঠবে। এই সেক্টরগুলো বন্ধ হয়ে গেলে বেকারত্ব ও অপরাধ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

করোনা পরবর্তী পদক্ষেপ বিষয়ে বলুন?

করোনা পরবর্তী সময়ে দেশীয় পণ্যের মান উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজের সর্বক্ষেত্রে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। করোনার এই বৈশ্বিক পরিস্থিতি আমাদের অন্তত স্বনির্ভর হওয়ার শিক্ষা দেয়। আমদানি পণ্য নিরুৎসাহিত করার সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় পণ্য উৎপাদনকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে হবে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের পণ্যের মান উন্নয়ন ও তাদের পণ্যের প্রমোশনের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে এডভান্স লেভেলের কিছু ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থার মাধ্যমে গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। এতে দেশ আমদানির বিকল্প পণ্য তৈরি ও রপ্তানি যোগ্যতাসম্পন্ন পণ্য তৈরির সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় অবদান রাখতে পারবে।

এখন সরকারের কাছ থেকে কী ধরনের সহযোগিতা আশা করছেন?

সরকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে। সবাই যে প্রণোদনা পাবে সেই নিশ্চয়তা নেই। তবে যারা পাবে তাদের যেন এই অর্থ পেতে বিড়ম্বনায় পড়তে না হয় শয়েটি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে হলে নতুন নতুন উদ্যোক্তা যেমন সৃষ্টি করতে হবে, তেমনি দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরিরও কোনো বিকল্প নেই।

ছোট উদ্যোক্তারা তখনই টিকে থাকবে বা দেশের সম্পদ হবে যখন তারা সঠিক সময়ে অর্থ সাহায্যের সঙ্গে এডভান্সড লেভেলের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ পাবে। এক্ষেত্রে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রন, উন্নত ডিজাইন, আধুনিক মোড়ক, সঠিক মূল্য নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞান অর্জনে দক্ষ করে তোলা খুব জরু্রি।

(ঢাকাটাইমস/৭এপ্রিল/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :