[পর্ব ০৩]

তুমি রবে সরবে....

পাভেল ইসলাম
| আপডেট : ২৭ জুন ২০২০, ১৫:২৬ | প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০২০, ১৮:২৭

'কামাল সাহেব অসুস্থ হবার মাত্র কয়েকদিন আগে আমাকে কল করেছিলেন। তখন নানান বিষয় নিয়ে তার সাথে আমার কথা হয়েছিলো। তুমিতো জানো তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক! তো, আমি তাঁকে বললাম, আপনি এই করোনার সময় অফিস করছেন কেন? উনি বললেন, বোঝেনই তো, এখন অনেকেই অফিসে আসতে পারছেন না, একজন অভিভাবক তো থাকা লাগে! আর আমি সুস্থ আছি তো! আল্লাহ ভরসা!'

কথাগুলো বলছিলেন মোস্তফা কামাল সৈয়দের দীর্ঘদিনের সহকর্মী, সহযাত্রী, বন্ধু, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব নওয়াজীশ আলী খান। ২ জুন বাদ জোহর এনটিভিতে মোস্তফা কামাল সৈয়দের জন্য দোয়া মাহফিলের আয়োজন চলছিলো! তখনই নওয়াজীশ স্যার ফোন দিয়েছিলেন আমাকে। তিনি বলছিলেন, 'কামাল সাহেব মুরগীর মতো আহার করতেন, মানে এতোই কম খেতেন! আমরা সেই আমল থেকেই দেখেছি কতোটা নিয়ম-কানুন মেনে চলতেন তিনি। সবসময় দেশীয় ফল-মূল খেতে পছন্দ করতেন।' কথাগুলো বলতে বলতে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠছিলেন তিনি।

এটিএন বাংলায় আমার এক সময়ের বস ছিলেন। এই মানুষটি সম্পর্কে দুটো কথা বলতেই হয়। এক, তিনি একজন ভোজন রসিক মানুষ। দ্বিতীয়ত, ধরুন কেউ আপনার সামনে থেকে বললো নওয়াজীশ স্যার আসছেন, আমরা পেছন ফিরে তাকানোর সময়টুকু ব্যয় করতাম না, সোজা দৌড়। বজ্র কন্ঠ তাঁর। সেই মানুষ আজ কেমন নরম সুরে কথা বলছেন! কামাল স্যারের মৃত্যুর পর এনটিভিসহ আরো বেশকিছু প্রতিষ্ঠান থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিলো তাঁর অনুভূতি জানতে। তিনি সাহস করেননি, মানসিকভাবে এতোটাই মুষড়ে পরেছিলেন। অকপট স্বীকারোক্তি, 'আমি পারবো না পাভেল! নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবোনা আমি!'

আমি এনটিভিতে আসার পর নওয়াজীশ আলী খান তাঁর বন্ধুকে বলেছিলেন, আমার একটি ছেলে, পাভেল আপনার ওখানে জয়েন করেছে, ওকে দেখে রাখবেন! এ কথা শুনে আবেগে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েছিলাম সেদিন। এই স্নেহ, আর্শীবাদ আর ভালোবাসার ছায়ায় জড়িয়ে ছিলাম শত বাঁধা, দ্বিধা উপেক্ষা করে। এমন মানুষদের দিকে তাকিয়ে জীবন পার করে দেয়া যায়। একদিন কামাল স্যার প্রোমো ও প্রেজেন্টেশনের কর্মীদের নিয়ে একটি ওয়ার্কশপ করার পরিকল্পনা করলেন। আমাকে দায়িত্ব দিলেন নওয়াজীশ স্যারকে রাজি করাতে। আমি পেরেছিলাম। সেই ওয়ার্কশপ শেষে কীভাবে জানিনা, এমন দু'জন মানুষ আমার পাশে দাঁড়াতে সম্মত হলেন হাসিমুখে!

মোস্তফা কামাল সৈয়দ কখনোই ছবি তুলতে, সাক্ষাৎকার দিতে কিংবা ক্যামেরার সামনে আসতে কমফোর্ট ফিল করতেন না। হয়তো এ কারণেই কিনা জানিনা, তাঁর মতো মানুষের বায়োগ্রাফি করা যায়নি। একবার তাঁকে বললাম, আপনার একটা জীবনীগ্রন্থ থাকা উচিত। স্যার বলেছিলেন, 'কি হবে ওসব করে! কে আর লিখবে এখন? 'আমি লিখবো স্যার' বলায় চুপ করে তাকিয়ে ছিলেন উনি।

২০০৭ থেকে আমি টেলিভিশনে চাকরি করছি। এই দীর্ঘ সময়ে আমার সরাসরি বস ছিলেন প্রথমে নওয়াজীশ আলী খান এবং পরে মোস্তফা কামাল সৈয়দ। এজন্য নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনেহয়। তাঁদের কাছ থেকেই শিখেছি টেলিভিশনের আদ্যোপান্ত। কাছ থেকে দেখেছি, কী সুনিপুণ কৌশল আর দক্ষতায় তাঁরা দায়িত্ব পালন করতেন! টেলিভিশনে তাঁদের অভিজ্ঞতা ৫০ বছরের অধিক। কামাল স্যার বিগত হবার পর থেকে আমার মাথায় একটা বিষয়ই ঘুরপাক খাচ্ছে, কার কাছে গিয়ে প্রশ্ন করবো, আশ্রয় খুঁজবো? গত বছর ২১ অক্টোবর বাবা হারানোর পর সংসারে অভিভাবক হারালাম। আর এ বছর ৩১ মে স্যারকে হারিয়ে কর্মক্ষেত্রেও অভিভাবক শূণ্য হয়েছি।

মোস্তফা কামাল সৈয়দ ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠে পার্কে হাঁটতে যেতেন। এরপর মসজিদে নামাজ পড়ে বাসায় যেতেন। হাকলা নাস্তা করে পেপার পড়তেন, গান শুনতেন, ছবি দেখতেন, অফিসের প্রস্তুতি নিতেন। সকাল ১১টার মধ্যেই অফিসে আসতেন তিনি। তাঁর কক্ষে সবসময় নিজস্ব পানির বোতল, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, টুপি, জায়নামাজ, টাওয়েল, রুমাল, প্লেট, গ্লাস, ব্রাশ থাকতো। দুপুর ১২টার দিকে তিনি দেশীয় যে কোন ফল খেতেন। একা খেতেন না কখনোই। একটা পেয়ারা হলেও আমাদের সঙ্গে তা ভাগ করতেন। শুধু কি তাই, কখনো কোন প্রয়োজনে তিনি তাঁর রুমে ডেকে নিতেন না, নিজে উঠে এসে অনুরোধের সুরে বলতেন, এই কাজটা করে দিবেন! এমন বিনয় আমি আগে কোথাও দেখিনি।

দুপুর ২টায় খেয়ে একটু হাঁটাচলা করে ৩০ মিনিট শুয়ে থাকতেন। কখনো নামাজ কাযা করতে দেখিনি। কখনো অফিস মিস করতে দেখিনি। কাজে ফাঁকি দিতে দেখিনি। সহসা অসুস্থ হতে দেখিনি। সামান্যতম সমস্যা হলেও তিনি যথাদ্রুত শেয়ার করতেন আমার সাথে। তাঁর দু'টি কথা কখনোই ভোলার নয়। এক, অসুখ নিয়ে অবহেলা করবেন না। দুই, অপরিহার্য না হলে অপারেশন নয়। কাজের প্রতি তাঁর একনিষ্ঠতা, একাগ্রতা, সততা বিরল। তাঁর দেখার চোখ ছিলো সমুদ্রের মতো গভীর। অফিস শেষে সোজা বাসায়। ডানে বামে তাকাতেন না। বাসা আর অফিস ছাড়া কামাল স্যারকে কেউ অন্য কোথাও দেখেছেন বলে আমার জানা নেই।

তাঁর বন্ধু সংখ্যা নগন্য। একদম প্রয়োজন না হলে তিনি কারো সাথে মিশতেন না। সত্যি কথা বলতে তাঁর সময়ও ছিলোনা। সারাক্ষণ কাজেই থাকতেন। তবে একজনের কথা না বললেই নয়। তিনি বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক ফখরুজ্জামান চৌধুরী। নিয়মিত কথা বলতেন উনার সঙ্গে। তবে তার অধিকাংশ আলাপ ক্রিকেট নিয়ে। তাঁর মতো ক্রিকেট দর্শক আমি আর দেখিনি। তো সেই বন্ধুর মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগেও স্যার আমাকে সাথে নিয়ে উত্তরার বাসায় দেখা করতে গিয়েছিলেন।

এমন অস্থির সময়ে এমন নির্লোভ, নিরহংকারী, মিতভাষী, আধুনিক ধার্মিক মানুষ দেখা যায়না। কি চমৎকার ফ্যাশন সচেতন, কালার সচেতন মানুষ ছিলেন তিনি! পরিচিত জনেরা সবসময় তাঁকে হিংসা করতেন তাঁর সুস্বাস্থ্য আর ফ্যাশানের জন্যে। ভাবা যায়, তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কখনো মোবাইল ফোন ব্যবহার করেননি! তিনি অসুস্থ হওয়ার অল্প কিছুদিন আগে মেয়ে রেহনুমা কামাল আহমেদ বাবার জন্য একটা দামী মোবাইল কিনেছিলেন সারপ্রাইজ দিবে বলে! কিন্তু বাবা নারাজ। মেয়ের মন খারাপ হবে বলে শেষমেশ দিলেন একটা শর্ত জুড়ে! মোবাইল নিবেন বটে, তবে সিম থাকতে পারবেনা! ছেলে-মেয়ে বিদেশ থাকলে তাদের সাথে ইন্টারনেটে কথা বলবেন শুধু! সেই মোবাইল ফোনটাও আর নেওয়া হলোনা তাঁর!

মোস্তফা কামাল সৈয়দ সম্পর্কে একটি কথা কখনোই জানা ছিলোনা! মৃত্যুর কয়েকদিন পর তাঁর সহধর্মিণী জিনাত রেহানা স্মৃতিকাতর হয়ে বললেন, 'জানেন না, কামাল সাহেব কতোটা রোমান্টিক মানুষ ছিলেন! তাঁর লেখা শ'খানেক প্রেমপত্র এখনো আমার কাছে আছে!'

চলবে...

লেখক: গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক কর্মী

ঢাকাটাইমস/২৬জুন/এসকেএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফেসবুক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :