সংকটে থাকা নাভানাকে উদ্ধারে সরকারের উদ্যোগ

ঢাকা টাইমস ডেস্ক
| আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২০, ১৭:৩১ | প্রকাশিত : ০৭ আগস্ট ২০২০, ১৭:২৫

গভীর আর্থিক সংকটে পড়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নাভানা গ্রুপ। বন্ধ রয়েছে আট হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতনভাতা। এই গ্রুপের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক লোকের জীবন-জীবিকা জড়িত। ফলে গ্রুপটিকে সংকট থেকে উদ্ধারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংককে করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প চালিয়ে নিতে সহায়তার জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে নাভানাকে ১২০০ কোটি টাকা ঋণ দিতে অনুরোধ করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, নাভানা গ্রুপ এবং চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সাম্প্রতিক বৈঠকে করপোরেট ও ব্যক্তিগত গ্যারান্টির বিপরীতে জরুরি ভিত্তিতে নাভানাকে ৫০০ কোটি টাকা লোন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। চারটি ব্যাংক এখন তাদের নিজ নিজ বোর্ডের সামনে লোন প্রস্তাব দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তবে ১২০০ কোটি টাকা লোনের বিপরীতে জামানত হিসেবে দেয়ার মতো নাভানা গ্রুপের তেমন সম্পদ অবশিষ্ট নেই। তাদের প্রায় পুরো সম্পদ বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ধক রয়েছে।

এফআইডি চারটি ব্যাংককে নাভানার সম্পত্তিতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে বন্ধকী সম্পদের উপর ১২০০ কোটি টাকার একটি পিএআরআই-পিএএসএসইউ চার্জ তৈরি করতে বলেছে, বাকি ৭০০ কোটি টাকা দেয়ার আগে। কনসোর্টিয়াম / সিন্ডিকেটেড লোনের ক্ষেত্রে পিএআরআই-পিএএসএসইউ চার্জ ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ হলো- সমস্ত ঋণদাতার ঋণগ্রহীতার সম্পত্তির ওপর সমান অধিকার রয়েছে।

এফআইডির অতিরিক্ত সচিব এবিএম রুহুল আজাদ ১৩ জুলাই ভার্চুয়াল বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকের রেকর্ড নোট অনুসারে, ওই বৈঠকে লোন ব্যবস্থার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী, চার ব্যাংকের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা, নাভানা গ্রুপের সিনিয়র ম্যানেজার মোস্তফা জাহিদ এবং আরও দুজন পরিচালক, একজন যুগ্ম-সচিব, একজন উপ-পরিচালক ও এফআইডির একজন সহকারী সচিবও বৈঠকে অংশ নেন।

এবিএম রুহুল আজাদ বলেন, নাভানা গ্রুপকে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা লোন দেয়ার বিষয়ে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস-উল ইসলাম বলেন, এফডিআইয়ের নেতৃত্বে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে নাভানাকে ৫০০ কোটি টাকার জরুরি লোন প্রদান করা হবে। চারটি ব্যাংক এই পরিমাণ লোন প্রদান করলে একক লোন গ্রহীতার এক্সপোজার সীমা লঙ্ঘিত হবে না।

এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংক পরবর্তী বোর্ড সভার আগে লোনের প্রস্তাব উত্থাপন করবে বলেও তিনি জানান। অগ্রণী ব্যাংকের পরবর্তী বোর্ড সভা ৮ আগস্ট (শনিবার) অনুষ্ঠিত হবে।

রূপালী ব্যাংকের এক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা একটি ইংরেজি দৈনিককে জানিয়েছেন যে, তার ব্যাংক এবং রাষ্ট্রের মালিকানাধীন দুটি ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংকের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। কারণ অগ্রণী ব্যাংক নাভানার লোনের প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করছে।

২৮ জুলাই রূপালী ব্যাংক একটি বোর্ড সভা করেছে তবে নাভানাকে লোন দেয়ার বিষয়ে সেখানে কোনো প্রস্তাব রাখা হয়নি বলেও জানান ওই কর্মকর্তা। তিনি জানান, নাভানাকে কার্যকরী মূলধন সরবরাহ করার জন্য ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে এক মাস সময় চাইবে।

সংকটের শুরু

২০১৮ সালে চেয়ারম্যান শফিউল ইসলাম কামাল অসুস্থ হওয়ার পরে নাভানা গ্রুপের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটতে শুরু করে এবং তার ছেলেরা এই গ্রুপের অধীনে বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব নেন।

এ সময় দুটি প্রতিষ্ঠান খেলাপি হয়। বর্তমান করোনা পরিস্থিতির মধ্যে আর্থিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, ব্যবসায়িক সংস্থার পক্ষে কাজ চালিয়ে যাওয়া, তার শ্রমিক এবং অন্যান্য কর্মচারীদের মজুরি প্রদান করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আর ঋণ শোধ করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

নাভানা গ্রুপের ১৭টি কোম্পানি, ৩১টি ব্যাংক এবং ১৯টি নন-ব্যাংকিং আর্থিক সংস্থার কাছ থেকে পাঁচ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা লোন নিয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে চার হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা এবং বাকি ৫৪৪ কোটি টাকা ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া হয়েছে।

চলতি বছরের ১০ মে নাভানা গ্রুপ এফআইডির সিনিয়র সেক্রেটারি মো. আসাদুল ইসলামের কাছে বর্তমান সংকট থেকে মুক্তির জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকার সরকারি প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ১২০০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা চেয়ে আবেদন করে।

চিঠিতে এই গ্রুপের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম উল্লেখ করেছেন যে, আর্থিক সংকটের কারণে তারা তাদের আট হাজার কর্মচারীকে বেতন দিতে পারছেন না।

এসময় গ্রুপটির চেয়ারম্যান শফিউল ইসলাম কামাল বলেছিলেন যে, তারা প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় আর্থিক সহায়তা চেয়েছিল কারণ ব্যাংকগুলো ইতিমধ্যে ঋণ-ক্ষতিগ্রস্ত গোষ্ঠীকে নতুন ঋণ সরবরাহ করতে রাজি হয়নি।

নাভানার আর্থিক সংকটের পেছনের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, 'আমি গ্রুপের চেয়ারম্যান হওয়া সত্ত্বেও আমার বার্ধক্যের কারণে আমি আর ব্যবসা দেখাশোনা করতে পারি না। আমার ছেলেরা সবকিছু দেখভাল করছে। তাই এই সম্পর্কে কিছু বলতে পারছি না।'

তিনি এটাও বলতে পারেননি যে, এই গ্রুপের অধীনে থাকা ১৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বর্তমানে কতটির কার্যক্রম চলছে।

১৩ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নাভানা গ্রুপের পরিচালক আনসার আলী খান বলেছিলেন, ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই গ্রুপটি কোনো লোনের ক্ষেত্রে খেলাপি হয়নি বা কোনো লোন বা সুদ মওকুফের জন্য আবেদন করেনি।

তিনি জানান, নাভানা গ্রুপের আট হাজার কর্মচারীর ওপর প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষভাবে নির্ভর করে লক্ষাধিক মানুষ। তিনি এই গ্রুপটিকে আর্থিক সংকট থেকে উদ্ধার করতে জরুরি ভিত্তিতে কর্মক্ষম মূলধন সরবরাহ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

নাভানার প্রিন্সিপাল লোন গ্রহণ করবে চার ব্যাংক

চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ব্যাংক নন-ব্যাংকিং আর্থিক সংস্থাগুলো থেকে নেয়া নাভানা গ্রুপের ৫৫৪ কোটি টাকার মূল লোন গ্রহণ করবে। তবে তার আগে এই গ্রুপকে এই লোনের সুদ পরিশোধ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক সংস্থাগুলোর সাথে আলোচনা করে এই লোনের সুদের হার হ্রাস করার চেষ্টা করছে। এছাড়াও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকের সাথে নাভানা গ্রুপের ঋণ এবং বন্ধকী সম্পত্তির পরিমাণ গণনা করছে।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস-উল ইসলাম বলেছিলেন যে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে নাভানার ঋণের সুদ অর্জন করবে না এবং তারা কেবল প্রিন্সিপাল ঋন গ্রহণ করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে একটি নির্দেশ জারি করার পরে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, 'তারা (নাভানা গ্রুপ) বিভিন্ন ব্যাংক থেকে লোন নিয়েছে। তাদের লোনের পোর্টফোলিও এবং ব্যাংকে আমানত যাচাই করতে হবে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কতটা লোন গ্রহণ করতে সক্ষম হবে তার বিশ্লেষণ করতে হবে। আমরা এই সমস্ত বিষয় বিশ্লেষণ করছি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।'

এফআইডির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের বৃহত্তর স্বার্থে বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে উদ্ধারে সরকার নাভানা গ্রুপকে জামিন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি আরও যোগ করেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো ঋণ অধিগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার পরে নাভানা গ্রুপের সাথে সমঝোতার স্মারক স্বাক্ষর করবে।

নাভানা গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম একটি বেসরকারি শিল্প গ্রুপ। ১৯৫৩ সালে জহুরুল ইসলাম বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (বিডিসি) নামে একটি নির্মাণ সংস্থা শুরু করেন। পরে নতুন সংস্থা ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড এবং নাভানা লিমিটেড স্থাপন করে রিয়েল এস্টেট এবং অটোমোবাইল খাতে তার ব্যবসা প্রসারিত করেছিলেন।

১৯৯৫ সালে জহুরুল ইসলামের মৃত্যুর পরে শফিউল ইসলাম কামাল ১৯৯৬ সালে ইসলাম গ্রুপ থেকে পৃথক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আত্মপ্রকাশ করেন এবং নাভানা গ্রুপ নামে একটি নতুন গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন, যা নাভানা লিমিটেড এবং আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডকে কৌশলগত ব্যবসায়িক ইউনিট হিসেবে গ্রহণ করে।

(ঢাকাটাইমস/০৭আগস্ট/একে/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :