গুলিবিদ্ধ সিনহাকে পানি খেতে দেননি ওসি প্রদীপ

সিরাজুম সালেকীন, কক্সবাজার থেকে
| আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:২৬ | প্রকাশিত : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:৪২

৩১ জুলাই রাতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদকে যখন চারটি গুলি করা হয় তখন তিনি রাস্তায় শুয়ে কাতরাচ্ছিলেন। এর কিছু সময় পরেই ঘটনাস্থলে আসেন টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার। সিনহার কাছে গিয়ে প্রথমে বুকের বাম পাশে পা দিয়ে আঘাত করেন। এ সময় গুলিবিদ্ধ সিনহা ওসি প্রদীপের কাছে পানি চান এবং বিড়বিড় করে কিছু একটা বলেন। কিন্তু ওসি প্রদীপ পানি না দিয়ে পা দিয়ে সিনহার গলাচেপে ধরেন। এর কিছু সময় পরেই সিনহার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়।

ঢাকাটাইমসকে ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়েছেন গোয়েন্দা সংস্থার একজন সদস্য।

সূত্রটি জানায়, গত ৩ জুলাই ‘জাস্ট গো’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে ট্রাভেল শো ডকুমেন্টারির শুটিংয়ের জন্য তিনজন সহযোগীসহ কক্সবাজারের নীলিমা রিসোর্টে ওঠেন মেজর অবসরপ্রাপ্ত সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ। এই খবর পৌঁছায় টেকনাফের তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমারের কাছে। তখন থেকেই ওসি প্রদীপ অধিনস্ত পুলিশ সদস্যদের বলেন, ‘ভিডিও পার্টিকে এখান থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে, যেকোন মূল্যে।' এরপর থেকেই সিনহাকে নজরদারিতে রাখেন পরিদর্শক লিয়াকত ও এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত।

৩১ জুলাই সকালে একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘বৃক্ষরোপণ’ অনুষ্ঠান শেষে ওসি প্রদীপকে জানানো হয়, মেজর সিনহা রাশেদ প্রাইভেটকার নিয়ে টেকনাফের শামলাপুর পাহাড়ে গেছেন। এ সময় সোর্সের মাধ্যমে বাহারছড়া ক্যাম্পের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলি সিনহার প্রতি নজর রাখতে থাকেন।

শুটিং শেষ করে রাত সাড়ে ৮টায় সিনহা ও তার ভিডিও ধারণের সহযোগী সিফাত পাহাড় থেকে নেমে নিজস্ব প্রাইভেটকারে মেরিন ড্রাইভ করে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেন। শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে আসার আগে বিজিবি চেকপোস্টে সিনহার গাড়ি তল্লাশির জন্য থামানো হয়। তবে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

আরও জানা যায়, রাত ৯টায় সিনহার গাড়ি শামলাপুর চেকপোস্টে আসলে এপিবিএনের একজন সদস্য গাড়িটি থামান। পরিচয় নিশ্চিতের পর তাকে চলে যেতে বলেন। কিন্তু আগে থেকে চেকপোস্টে থাকা ইন্সপেক্টর লিয়াকত মেজর সিনহার গাড়ির বাম পাশে গিয়ে বেরিকেড দেন। পরিচয় জানতে চাইলে মেজর সিনহা ইংরেজিতে নিজের পরিচয় দেন। এ সময় গাড়ির সামনের সিটে থাকা সিফাতকে নামিয়ে মারধর শুরু করেন লিয়াকত। সিনহা এ দৃশ্য দেখে চালকের আসন থেকে বের হয়ে আসেন। এরপরই দূর থেকে সিনহাকে দুটি গুলি করা হয়। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আবারও দুটি গুলি করা হয়। মোট চারটি গুলির পর মেজর সিনহা রাস্তায় শুয়ে পড়েন। তাৎক্ষণিক ঘটনাটি জানানো হয় ওসি প্রদীপকে। এ সময় প্রদীপ বলেন, ‘আমি না আসা পর্যন্ত তুমি (লিয়াকত) ওখানে থাকো, আমি আসছি।’ এর কিছু সময় পরেই ওসি প্রদীপ ঘটনাস্থলে আসেন। প্রদীপ ঘটনাস্থলে এসে সিনহাকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করতে থাকেন এবং সিফাতকে নির্যাতন করেন।

ঘটনাস্থলে এসে ফোর্স বাড়ান প্রদীপ

মেজর সিনহাকে চারটি গুলির খবর পেয়ে ওসি প্রদীপ ঘটনাস্থলে গিয়ে থানার মুন্সিকে ফোন করেন। এসময় তিনি থানা থেকে আরও ফোর্স পাঠাতে বলেন। এর কিছু সময় পরেই ঘটনাস্থলে আরও পুলিশ সদস্য বাড়ানো হয়।

সিনহাকে আগে থেকেই টার্গেট করেছিলেন প্রদীপ

মেজর সিনহা কক্সবাজারে যাওয়ার পর থেকেই প্রতিনিয়ত তাকে অনুসরণ করছিলো প্রদীপের অনুসারীরা। সিনহার ভিডিওকে ভালোভাবে নেননি প্রদীপ। এর আগে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাকে নিয়ে লেখালেখি হওয়া প্রদীপ সিনহাকে টার্গেট করেন। এজন্য অধীনস্তদের নির্দেশ দেন সিনহাকে সরিয়ে দিতে।

এদিকে চার দফায় ১৫ দিন রিমান্ডে থাকলেও মেজর সিনহা হত্যায় নিজের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার। চতুর্থ দফার রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার প্রধান আসামি ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলি ও তৃতীয় আসামি এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এই মামলার দ্বিতীয় আসামি প্রদীপ কুমার দাশ। গতকাল বেলা সাড়ে ৩টার দিকে র‌্যাবের একটি দল প্রদীপকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহর আদালতে হাজির করে। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তাকে কারাগারে পাঠোনো হয়।

আত্মসমর্পণের দিন গত ৬ আগস্ট ওসি প্রদীপসহ সাত আসামিকে সাত দিন করে রিমান্ড দেয় আদালত। পরে ২৪ আগস্ট চার দিন, ২৮ আগস্ট তিন দিন ও ৩১ আগস্ট এক দিনসহ মোট ১৫দিনের জন্য ওসি প্রদীপের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

আদালতের আদেশ পেয়ে এই ১৫ দিন বিভিন্ন সময়ে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্ত সংস্থা র‌্যাব। এই মামলায় রবিবার ইন্সপেক্টর লিয়াকত ও সোমবার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাব-১৫-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার খায়রুল ইসলাম জানান, সিনহা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার প্রদীপ কুমারকে চার দফায় রিমান্ডে আনার পর জিজ্ঞাসাবাদে মামলা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য দিয়েছেন। আমরা সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছি। তবে ওসি প্রদীপ আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেননি।

সিনহা হত্যার ঘটনা তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি ৬৭ জনের সঙ্গে কথা বলেছে। কমিটি সিনহা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওসি প্রদীপের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে। তবে তদন্ত কমিটি এখনো পর্যন্ত প্রদীপের সঙ্গে কথা বলতে পারেনি।

১৩ অভিযুক্ত যারা

সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহতের পর টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমারসহ ১৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন- বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলি, টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, টেকনাফ থানার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ, পুলিশের মামলার সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন।

ঢাকাটাইমস/০২সেপ্টেম্বর/এসএস/এমআর

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :