সুখ: সন্ধান ও সহজলভ্যতা

রবিউন নাহার তমা
 | প্রকাশিত : ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১৩:৫৮

সুখের জীবন যদি বলা হয় তবে বেশিরভাগ মানুষই তার শৈশবকালকে বেছে নেবেন। এক কথায় দুশ্চিন্তাহীন আনন্দময় জীবন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে ক্ষোভ, হতাশা আর দুশ্চিন্তা। এর ফলে কোনো কিছু থেকে আনন্দ উপভোগ করা সত্যিকার অর্থে কঠিন হয়ে পড়ে, যা কি না আমাদের প্রায়ই প্রশ্নের সম্মুখীন করে-আপনি কি সত্যিই সুখী?

ছোটবেলায় আমরা যারা বড়দের মুখ থেকে রূপকথার গল্প শুনে বড় হয়েছি তাদের কাছে ‘অবশেষে তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো' এই লাইনটা সুপরিচিত। অর্থাৎ আমরা যত যাই ঘটুক বাধা-বিপত্তি সবশেষে ভালো থাকা বা সুখে থাকাটাকেই প্রাধান্য দেই।

অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আর অতিমাত্রার গতিশীলতা আমাদের আবেগ-অনুভূতি, অবাক হওয়ার ক্ষমতা ইত্যাদিকে অনেকটাই হ্রাস করেছে, যার ফলে আমাদের চাহিদার শেষ নেই। আর চাহিদার এই অতিমাত্রা বয়ে নিয়ে এসেছে নানারকম জটিলতা, যেগুলো আমাদের সুখ-শান্তির অন্তরায়।

ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এড ডিয়েনার, যিনি Dr. Happiness নামে সুপরিচিত--তার দীর্ঘ তিরিশ বছরের গবেষণায় উঠে এসেছে সুখী জীবন লাভের প্রভাবক কিছু মৌলিক বিষয়। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক সম্পর্ক, অভিযোজন ক্ষমতা, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, অর্থসম্পদ ইত্যাদি।

ডিয়েনারের বক্তব্য অনুযায়ী সামাজিক সম্পর্ককে বলা হয়েছে সুখী জীবন লাভের প্রথম ও প্রধান উৎস। সুখী মানুষের থাকে দৃঢ় সামাজিক সম্পর্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে বিশাল সংখ্যক মানুষের সাথে আপনি যুক্ত আছেন তা কিন্তু আপনাকে সুখী মানুষের তকমা দিতে পারবে না। বরং কিছু সংখ্যক সুখী মানুষের দলে থাকতে পারাটাই এখানে মুখ্য। শুধু তাই নয়, হার্ভার্ডের পঁচাত্তর বছরের গবেষণাও বলছে সুসম্পর্ক আমাদের নার্ভাস সিস্টেমকে রিলাক্স রাখে, যা সুস্থতা ও সুখের সমার্থক।

অভিযোজন ক্ষমতা Human Happiness-এর একটি বড় প্রভাবক। পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে আপনি যত তাড়াতাড়ি মানিয়ে নিতে পারবেন তত আপনার জন্য সুবিধা। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার অভিযোজন ক্ষমতা হ্রাস করে দেয়। বিভিন্ন গবেষণা এটাই বলছে যে, আয় বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করা সত্ত্বেও প্রযুক্তি মানুষের সুখ উপভোগের ক্ষমতা কমিয়েছে। তবে এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঠিক ব্যবহারকে বিকল্প উপায় হিসেবে দেখানো হয়েছে।

চিন্তাভাবনায় ইতিবাচকতা আপনার জীবনকে বদলাতে অনেকখানি সাহায্য করবে। জীবনে যা কিছু পেয়েছেন তার জন্য সন্তুষ্টি প্রকাশ করুন। যোগ্য ব্যক্তির প্রশংসা করুন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। যে কাজগুলো করতে আপনার ভালো লাগে সেগুলো খুঁজে বের করুন এবং সেগুলো করার অভ্যাস করুন। এগুলো আপনাকে ভালো রাখবে।

সুখী মানুষের জীবনে গৌণ হলেও অর্থসম্পদের ভূমিকা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। একটা কথা প্রায়ই বলা হয় যে- Money can't buy happiness. কিন্তু এটাও সত্য যে জীবন ধারণের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থসম্পদ না থাকলে দুঃখও আপনার পিছু ছাড়বে না! ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক কিংবা সুইজারল্যান্ডের মতো সুখী দেশের তালিকায় শীর্ষে থাকা দেশগুলোর মাথাপিছু আয় কিন্তু বলে না যে Money can't buy happiness! অন্যদিকে সুখী দেশের তালিকায় একদম নিচের দিকে থাকা আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান কিংবা জিম্বাবুয়ের মতো দেশগুলোর মাথাপিছু আয়ের দিকে একবার তাকান-পার্থক্যটা খালি চোখেই ধরা পড়বে। পরিসংখ্যান বলে যুদ্ধবিধ্বস্ত, দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলোতে সামাজিক অনাচার, বিশৃঙ্খলা এবং সন্ত্রাস বেশি, তাই সেখানে অসুখী মানুষের সংখ্যাও বেশি।

এত গেল বাহ্যিক কিছু প্রভাবকের কথা। আপনার মন-মানসিকতা কেমন থাকবে, আপনি কতটুকু আনন্দে থাকবেন বিভিন্ন হরমোন এবং জিনও তা নিয়ন্ত্রণ করে। এগুলোর কথা বলতে হলে প্রথমেই চলে আসে হ্যাপি কেমিক্যালসের কথা।

Happy Chemicals-এর প্রবাহ আপনাকে সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে সহায়তা করে। এন্ড্রোফিনস, ডোপামিন, সেরোটোনিন এবং অক্সিটোসিন এই চারটিকে বলা হয় Happy chemicals। খুব সহজ কিছু উপায় আছে যা কি না আপনার দেহে এই Happy Chemicals-এর প্রবাহ বাড়িয়ে তোলে।

আপনার অবসাদগ্রস্ততা, ব্যথা কিংবা উদ্বেগের কারণ হলো এন্ড্রোফিনসের অপরিমিত প্রবাহ। ডার্ক চকলেট কিংবা মসলাযুক্ত খাবার (অবশ্যই পরিমিত) নিমিষেই এন্ড্রোফিনসের প্রবাহ বাড়ায় এবং আপনার অবসাদ দূর করে। তবে এ হরমোনের নিঃসরণ স্বাভাবিক রাখার সবচেয়ে বড় উপায় হলো হাসিখুশি থাকা এবং পর্যাপ্ত ব্যায়াম করা।

ডোপামিনকে বলা হয় Feel Good হরমোন। নতুন কিছু করার ইচ্ছা, সঠিক সময়ে কাজ করা কিংবা নিজের ছোট বা বড় কোনো লক্ষ্য অর্জন করা ইত্যাদি আপনার ডোপামিন বৃদ্ধিতে সহায়ক। ডোপামিনের প্রবাহ আপনাকে মোটিভেটেড করবে, নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে আগ্রহী করবে। আর নতুন কিছুর মাঝে থাকে আনন্দ।

যখন আপনি হতাশ কিংবা একাকী অনুভব করবেন তখন বুঝবেন আপনার দেহে সেরেটোনিনের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। মাঝে মাঝে আশপাশেই কোথাও বেড়িয়ে আসা, পরিবার বা বন্ধু-বান্ধবের সাথে কফি খাওয়া কিংবা খুশিমনে কারও সাথে কথা বলা আপনার সেরেটোনিন লেভেল বাড়িয়ে তুলবে। তাছাড়া আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মিও এক্ষেত্রে সহায়ক। এ জন্য আপনি নিয়ম করে প্রতিদিন সকালে ১০ বা ১৫ মিনিট সূর্যের আলো গায়ে লাগাতে পারেন।

অক্সিটোসিন হলো Happy Chemicalsগুলোর মধ্যে অন্যতম। একে Cuddle Hormoneও বলা হয়। এর নিঃসরণ বিশ্বাস ও অন্তরঙ্গতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের সম্পর্ককে দৃঢ় করে। আপনার কোনো প্রিয় মানুষের সাথে হ্যান্ডশেক করলেও এর প্রবাহ সৃষ্টি হয়!

এই হ্যাপি কেমিক্যালস ছাড়াও 5-HTTLPR নামের একটি জিনও মানুষের সুখ নিয়ন্ত্রণ করতে ভূমিকা রাখে। ২০১২ সালে Journal of Neuroscience-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে 5-HTTLPR নামক জিনের অধিকমাত্রায় উপস্থিতি আমাদের life satisfaction লেভেল বাড়িয়ে তোলে যা সুখের মাত্রা বৃদ্ধিতে সহায়ক। সুতরাং বাবা-মা যদি সদা হাস্যোজ্জ্বল-প্রাণবন্ত হন তবে স্বাভাবিকভাবেই সন্তানের ডিএনএ গঠনে ভূমিকা রাখবে!

বাহ্যিক বা রাসায়নিক দিক ছাড়াও সুখী জীবন লাভের আধ্যাত্মিক উপায়ও কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্রষ্টার প্রতি, সৃষ্টির প্রতি কিংবা নিজ ধর্মের প্রতি বিশ্বাসের ঘাটতি আপনার দৃঢ়চেতা মনোভাবকে দুর্বল করে দিতে পারে। মনে অস্থিরতার সৃষ্টি করতে পারে। বহু গবেষণাপত্রের ফলাফল বলছে যে ধর্মীয় বিশ্বাস সবরকম প্রতিকূলতাকে কাটিয়ে উঠতে আপনাকে সাহায্য করবে।

সবশেষে আমাদের বেঁচে থাকা প্রসঙ্গে কিছু বলা যাক। আমরা খেয়েপরে দিব্যি বেঁচে আছি। কিন্তু আসলে কেন বেঁচে আছি তা নিয়ে হয়তো ভাবার অবকাশ পাই না। বেঁচে থাকার প্রকৃত সত্য বা কারণ খুঁজে পাওয়াটা কিন্তু সুখের বিশাল উৎস। এ প্রসঙ্গে ছোট একটা গল্প বলা যাক-

‘একজন বন্দিকে কোনো একসময় বলা হয়েছিল বাইরের বাগানে নলকূপ চেপে পানি দিতে। সে প্রতিদিন হাতল ঘুরিয়ে নলকূপ চাপত। বহু বছর পর জেল থেকে মুক্তি পেয়েই ওই গাছগুলো, যেগুলোকে সে প্রতিদিন পানি দিত সেগুলো কত বড় হয়েছে তা দেখতে চাইল। কারারক্ষীকে জিজ্ঞেস করে সে যখন জানতে পারল আসলে সেখানে কোনো গাছই নেই, এই শোক তার হৃৎপিণ্ড নিতে পারল না। সে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করল।

আসলে সুখ কোনো সোনার হরিণ নয়। বরং এটি সংক্রামক এবং অর্জনযোগ্য একটি দক্ষতা। সুতরাং আপনার সংক্রমিত হওয়ার ক্ষমতা এবং অর্জনের দক্ষতাই নিশ্চিত করবে আপনি সুখী হতে চান কি না।

লেখক: শিক্ষক

ঢাকাটাইমস/২৫অক্টোবর/এসকেএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

পাঠকের অভিমত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :