বাংলাদেশের ক্রিকেট: ফেরা ও প্রত্যাশা

রবিউন নাহার তমা
 | প্রকাশিত : ২১ জানুয়ারি ২০২১, ১৪:০১

প্রথমেই ৩১৪ দিন পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমকে অভিনন্দন। জয়টা প্রত্যাশিতই ছিল। ম্যাচটা না জিতলেই বরং সেটা অপ্রত্যাশিত হতো। অভিনন্দন সাকিব আল হাসানকে দীর্ঘ ১৮ মাস পর খেলায় ফেরাতে। আরও অভিনন্দন নবাগত হাসান মাহমুদকে অভিষেক ম্যাচেই ৩ উইকেট তুলে নেয়ার জন্য।

ক্রিকেট স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করছে আস্তে আস্তে আর সেই সাথে ফিরছে ক্রিকেট সমর্থকদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ। ইতোমধ্যেই কোহলিবিহীন ভারত অস্ট্রেলিয়ার মাঠেই স্বাগতিকদের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় তুলে নিয়ে দলের এবং সমর্থকদের প্রাপ্তির খাতায় যোগ করেছে নতুন আরেকটি পালক। দীর্ঘদিন পর ক্রিকেটে ফেরা বাংলাদেশ দলের কাছেও এবার প্রত্যাশা নতুন কোনো উপহার যেটা দেশের ক্রিকেট সমর্থকদের নতুন করে মাতিয়ে তুলবে।

ক্রিকেট বললেই গত কয়েক বছরের বিবেচনায় টস জেতা এবং পিচ কন্ডিশন একটা টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে বিবেচনায় প্রথম ম্যাচেই টস ভাগ্য বাংলাদেশের অনুকূলে গিয়েছে। এবারে পিচ কন্ডিশন। শের-ই বাংলা স্টেডিয়ামের মতো ফ্ল্যাট পিচ মনে হয় খুব কম ফিল্ডেই আছে। মাত্র ২৪৭ রান তুলতে ১৪ উইকেট পড়ে যাওয়া কোনো মাঠের উইকেটকে স্পোর্টিং উইকেটের কাতারে কোনোভাবেই ফেলা যায় না।

২০১৯ সালেও বাজে কন্ডিশনের জন্য এই মাঠকে ২ ডিমেরিট পয়েন্ট দেয়া হয়েছিল। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের খেলার পরিসংখ্যান বলছে ম্যাচ জেতাতে ব্যাটসম্যান এবং পেসাররাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তারপরও স্পোর্টিং পিচ না বানিয়ে গতানুগতিক ধারার সেই স্পিন সহায়ক এবং ফ্ল্যাট পিচ বানানো হচ্ছে। মন্থরতা কাটিয়ে গতিশীল ক্রিকেটের জন্য বাংলাদেশের দরকার খুব ভালো মানের পেসার এবং ফিল্ডার। রুবেল হোসেন আর মোস্তাফিজুর রহমান ছাড়া ঝুলিতে নেই সেরকম কোনো পেসার। উপরন্তু এ দুজন পেসারেরই আছে দীর্ঘসসময় ধরে ইনজুরিতে থাকার ইতিহাস। আফতাব আহমেদের পর আমরা পেয়েছিলাম সাব্বির রহমানের মতো একজন গতিশীল অ্যাথলেট। কিন্তু সাব্বিরের ক্রিকেট ভবিষ্যৎ কি তা হয়তো সময়ই বলতে পারবে।

হ্যাজেলউড-কামিন্স, ব্রড-আর্চারদের মতো শক্ত পেস জুটি আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। এমনকি পাইনি শামি-ভুবনেশ্বর-বুমরাহদের মতো কার্যকর বোলারও।

বাংলাদেশে ক্লাসিক কোনো পেস বোলিং অলরাউন্ডার ছিল না। মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন হতে পারেন দক্ষিণ আফ্রিকান কিংবদন্তি জ্যাক ক্যালিসের মতো একজন চমৎকার পেস বোলিং অলরাউন্ডার। গত বিপিএল-এ তার ব্যাটিং স্টাইল এবং ইয়র্কার বল করার দক্ষতা ছিল রীতিমতো আশা জাগানিয়া। তার ফিটনেস, একাগ্রতা আর বিসিবির সদিচ্ছাও এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ! বিসিবি তাকে কতটুকু সুযোগ দেবে আর তিনি সেটা কীভাবে কাজে লাগাবেন তার ওপর বেশ কিছুটা হলেও নির্ভর করছে আমাদের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ।

নতুন পেসার হাসান মাহমুদ অভিষেকেই ৩ উইকেট নিলেও বোলিংয়ে ছিল না আহামরি কিছু। তাকে গতি, সুইং এগুলো নিয়ে আরও কাজ করতে হবে। ক্যারিশমা নিয়ে আসতে হবে। দুই-এক ম্যাচ খারাপ খেলার পর সাইডবেঞ্চে বসিয়ে রাখলে বাংলাদেশ আরেকজন পেসার হারাবে। ধারাবাহিকভাবে সুযোগ দিতে হবে এবং খেলোয়াড়কেও নিজেকে উজাড় করা পারফরমেন্স দিতে হবে। দুই-এক ম্যাচ দারুণ খেললেই স্টার তকমা সেটে দেয়াটা এক্ষেত্রে একটা বাধা হতে পারে।

অতি প্রশংসা মাঝে মাঝে উঠতি ক্রিকেটারদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। অতীত তার ভালো সাক্ষী।

দেশের ক্রিকেটারদের পারফরমেন্সের উন্নতিতে পরোক্ষভাবে হলেও ধারাভাষ্যকারদের একটা ভূমিকা থাকে। বাংলাদেশের যারা ইংরেজি ধারাভাষ্য দেন তাদের ভাষ্য শুনে কি বলা যায় তা ঠিক বোধগম্য নয়। জিততে থাকলে বা জিতলে দলকে প্রশংসায় ভাসানো আর হারতে থাকলে বা হেরে গেলে দুঃখ প্রকাশ কিংবা সাফাই গাওয়াই মনে হয় কাজ। That's a glooo..orious shot ! fabulous ! pitched delivery, very good bowling,stylish batting outstanding... ! এগুলো ছাড়া বোধহয় তাদের ঝুলিতে খুব বেশি ক্রিকেটীয় ভাষা নেই ! তাছাড়া ওনারা অন্য টিমের কতগুলো ম্যাচ দেখেন সে ব্যাপারেও প্রশ্ন থেকে যায়। আমরা যখন খেলা দেখতে বসি, তখন কোহলির চেয়ে হাশিম আমলার ব্যাটিং এভারেজ বেশি আবার আমলার চেয়ে কুইন্টন ডি ককের এভারেজ বেশি, অথবা জাসপ্রিত বুমরাহ বোলিং করলে হাত একশ পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি এঙ্গেল হয় অথবা ম্যাককুলামের স্ট্রাইক রেট যে প্রায়ই দুইশোর উপরে থাকতো, এমনকি উমর গুল যে ম্যাকগ্রার স্টাইলে বল করতো অথবা আমাদের হাসান মাহমুদ আর মোস্তাফিজুর রহমানের বল ডেলিভারি দেয়ার স্টাইল যে প্রায় একই রকম, মোট কথা বিভিন্ন দল এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনার এসব তথ্য জানলে খেলা দেখতে আরো ইন্টারেস্টিং লাগে। পাশাপাশি খেলোয়াড়রা যখন নিজেদের খেলার ভিডিওগুলো দেখেন তারাও নিজেদের ভুলত্রুটি আরো সহজেই দেখতে-শুনতে পারবেন। অথচ আমাদের ধারাভাষ্যকাররা এর ধারে পাশেই যান না !

বাংলাদেশ জিতলে মিডিয়া যে পরিমাণ জয়গান গাইতে থাকে সেটাও কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা এবার ভাবার সময় হয়েছে! বলা যায় না কাল হয়তো রিপোর্ট আসবে কিছু পত্রিকায়- সাকিব আল হাসানের রাজসিক প্রত্যাবর্তন! আজকে তো একজন টিভিতে সাকিবকে বাংলাদেশ দলে অন্য গ্রহের খেলোয়াড় বানিয়ে দিলেন! ভাগ্যিস সাকিব আল হাসানের এগুলো নিয়ে মাতামাতি নেই। তিনি জানেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই ভাঙ্গাচোরা দলের সাথে তার পারফরমেন্সের কতটুকু মূল্য, আরো কি ঘাটতি তার আছে, কীভাবে আরো নিজেকে উন্নত করা যায় ইত্যাদি। এজন্যই তিনি নাসির, মোসাদ্দেক এদের মতোই অকালে হারিয়ে যাননি।

পয়েন্টস রেটিং এগুলো বিবেচনায় আয়ারল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তান কিংবা দ্বিতীয় সারির উইন্ডিজ দলের সাথে জিততে হবে বড় ব্যবধানে। না হলে পয়েন্টস-রেটিং বাড়বে না। এর প্রভাব বোঝার জন্য বাংলাদেশের বর্তমান টেস্ট র‍্যাংকিং-ই যথেষ্ট! দুঃখজনক হলেও এটিই বাস্তব যে, বাংলাদেশ এখন টেস্ট খেলুড়ে এগারোটি দেশের মধ্যে র‍্যাংকিংয়ে দশম। অতি সম্প্রতি টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া নবাগত আফগানিস্তানও র‍্যাংকিংয়ে আমাদের চেয়ে এগিয়ে এবং সহসা র‍্যাংকিং উপরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই।

অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা ভারতের সাথে বেশি বেশি ম্যাচ না জিতলে রেটিং পয়েন্ট বাড়বে না। আর সেটা না হলে র‍্যাংকিংয়ে উপরের দিকেও যাওয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে ভালো দলগুলোর সাথে বেশি ম্যাচ খেলে নিজেদের ভালোমতো ঝালিয়ে নেয়ার সুযোগ থেকে ক্রিকেটাররা বঞ্চিত হবেন। যদি অন্ধের মতো এসব দেশকে দুষতে থাকি যে তারা আমাদের টিমকে আমন্ত্রণ জানায় না খেলার জন্য, তাহলে তাদের দিকটাও দেখতে হবে। কারণ ওডিআই, টি-টোয়েন্টি এবং টেস্টে যথাক্রমে ৭, ৮ ও ১০ নম্বরে থাকা দলের সাথে খেললে তাদের রেটিং পয়েন্ট খুব একটা বাড়বে না।

ভালো খেলবে, ভবিষ্যতে ভালো খেলবে, এই দলের খেলোয়াড়রা চার-পাঁচ বছরে আরো পরিণত হবে এসব শুধুই এখন সান্ত্বনা বাক্য মাত্র। দেখতে দেখতে ওয়ানডে অভিষেকের বাইশ বছর চলে গেছে। অথচ আমাদের ঝুলিতে ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটের কোনোটিতেই নেই বড় কোনো শিরোপা।

বাংলাদেশ দলের আছে ব্যাটিং গভীরতা, বিশ্বমানের স্পিনার, কার্যকরী পেসার, অভিজ্ঞ খেলোয়াড় পাশাপাশি বেশ কয়েকজন নতুন প্রতিভা। শুধু কোথায় যেন আছে একটা অভাব।

দ্বিপাক্ষিক এ সিরিজ শুরু হওয়ার আগে অধিনায়ক তামিম ইকবালের কণ্ঠেও পাওয়া গেছে এখনও বড় কোনো শিরোপা অর্জন না করতে পারার আক্ষেপ, সাথে ছিল দ্রুত সেই কাঙ্ক্ষিত শিরোপা জেতার আকুতি। সমর্থকরাও চান দীর্ঘ ২২ বছরের খরা কাটিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি কিংবা বিশ্বকাপের মতো বড় কোনো শিরোপা দেশের মাটিতে নিয়ে আসুক।

আমরা বিশ্বাস করি শিরোপা জয়ের সব উপাদানই দলে আছে, প্রয়োজন শুধু সঠিক সমন্বয় ও সুপরিকল্পনা।

লেখক: শিক্ষক

ঢাকাটাইমস/২১জানুয়ারি/এসকেএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

পাঠকের অভিমত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :