নিবন্ধ

ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে (পর্ব--২)

ড. নেয়ামত উল্যা ভুঁইয়া
 | প্রকাশিত : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৪:০১

ছন্দের উপাদানঃ

আগের পর্বেই যেমনটা বলা হয়েছে, ছন্দের উপাদান হলো অক্ষর, মাত্রা, যতি বা ছেদ, পর্ব বা পর্বাঙ্গ, পংক্তি,চরণ, স্তবক ইত্যাদি। অক্ষর বা মাত্রা হচ্ছে ছন্দের ক্ষুদ্রতম একক, আর স্তবক হচ্ছে এর বৃহত্তম একক। একটি স্তবকের মধ্যেই পাওয়া যাবে ছন্দের সব উপাদান।

ভাষার মূলগত উপাদান ধ্বনি । তা ভাব প্রকাশরে উদ্দেশ্যে মানুষরে বাগযন্ত্র থেকে নিঃসৃত সাংকতেকি আওয়াজ। আবার বর্ণ বা হরফ বলতে বোঝায় ধ্বনির সাংকেতিক লেখ্যরূপ। ধ্বনিকে লিখিতরূপ দেয়ার জন্য এ প্রতীকের ব্যবহার। বর্ণের কাজ ধ্বনিকে স্থায়িত্ব দেয়া। বর্ণ চোখে দেখার জিনিস, আর ধ্বনি কানে শুনবার। তাই ওরা এক না, বরং ভিন্ন। তাহলে বর্ণ ও অক্ষরের মধ্যে পার্থক্য কি? এ প্রশ্নের জবাব অত্যন্ত পরিষ্কার। ভাষার ধ্বনিকে লিখিতরূপ দেয়ার জন্য যে প্রতীক ব্যবহার করা হয়, তা-ই বর্ণ বা হরফ। আমরা জানি, বাংলা বর্ণমালায় ১১টি স্বরবর্ণ ও ৩৮টি ব্যঞ্জনবর্ণ আছে--যদিও এতে মতান্তর রয়েছে। আর অল্প প্রয়াসে যে ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ এক ঝোঁকে উচ্চারিত হয় তাকে অক্ষর বলে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত বলা হবে।

কৌতুহল নিবারণের জন্য একটা জানা কথার পুনরুল্লেখ করে রাখি। কথাটা শব্দ ও পদ--এ দুয়ের তফাত নিয়ে। এক বা একাধিক বর্ণ মিলে শব্দ গঠিত হয়। যেমন; আমার, ও, বাংলাদেশ, দেশ। এ ৪টি আলাদা আলাদা শব্দ যখন মনের পূর্ণভাব প্রকাশ করতে চাইবে, তখন তারা সুশৃঙ্খলভাবে দলবদ্ধ হবে। অর্থাৎ দলভুক্ত হয়ে বাক্য গঠন করবে। এভাবে শব্দরা বাক্যে এসে ধরা দিলে এদের নাম হয় পদ। মজা করে বলা যায়, ‘কনে’ যখন বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তখন থেকে তার নাম হয়ে যায় ‘বউ’ বা ‘বধূ’। আর ‘শব্দ’ যখন বাক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তখন তার/তাদের নাম হয়ে যায় ‘পদ’। অর্থাৎ বাক্যের শব্দের নাম পদ। এভাবেই, উপরে বর্ণিত ‘ আমার, ও, আমার, বাংলাদেশ, দেশ ’ শব্দগুলো দলবদ্ধ হয়ে বাক্যে এসে ‘ও আমার দেশ, ও আমার বাংলাদেশ’ হয়ে আমাদের একটি জনপ্রিয় দেশেরগানের কলি হয়ে উঠলো। বলে রাখা ভালো, পরবর্তীতে আলোচনাকালে আমরা বোঝার সুবিধার্থে ‘পদ’ না বলে হয়তো ‘শব্দ’ বলতে পারি। তবে তাতে বিভ্রান্ত না হয়ে বুঝতে হবে যে, আসলে সেখানে পদের কথাই বলা হচ্ছে। যাক, প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

০১. অক্ষর

বর্ণ আর অক্ষর এক না। এক বা একাধিক বর্ণ ( প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংযুক্ত এবং ‘কার’ চিহ্নসহ) একটি অক্ষর গঠন করে। যেমন-মা, দেশ, ভাত, খা, স্ট , স্ক, কান্ত, প্ত কাল, মন, যা, খাল, এ, ঢোল, চিল, বাং, পুর, লি,রূপ, স্ত্রী, প, ঐ, সুখ, মৌ, কী, চ, ক্ষ, লো, হ্যাঁ, হে, কাজ, সেন, গান, শ্যান্, দেন্,বন, ভোর ইত্যাদি। 'বন্ধুর' শব্দটিতে ৩টি বর্ণ... ব, ন্ধ, র। কিন্তু অক্ষর আছে ২টি: বন্, ধুর্। আবার কোনো কোনো শব্দে একটি বর্ণে অক্ষর হতে পারে। 'কবিতা' শব্দটিতে বর্ণ আছে ৩টি: ক, ব, ত। আবার অক্ষরও আছে ৩টি: ক,বি,তা।

ইংরেজি সিলেবল (Syllable) এর বাংলা হচ্ছে “অক্ষর”। আর আমরা জানি যে, সিলেবল (Syllable) কে বাংলায় বলা হয় ধ্বন্যাঘাত বা মাত্রা বা শব্দপাপড়ি বা পদাংশ )। এটি হলো একটি শব্দের এক ঝোঁকে উচ্চারণযোগ্য অংশ। যেমন, ৩ অক্ষরের শব্দ--বাংলাদেশ (বাং + লা + দেশ)। অন্যভাবে বললে, বাগযন্ত্রের স্বল্পতম বা হ্রস্বতম ধ্বনি ‘অক্ষর’ হিসাবে পরিচিত। “কম্পন” শব্দটি তিনটি বর্ণে গঠিত, (ক+ম্প+ন), মোট ধ্বনি (ক+অ,ম,প+অ,ন) ৬টি। কিন্তু শব্দটি উচ্চারণ করলে মোট দুটি “অক্ষর” পাওয়া যায়; কম+পন।

“অক্ষর” মূলত দুই রকমের: স্বরান্ত আর ব্যঞ্জনান্ত। অক্ষরের শেষে স্বরধ্বনি আছে এমন অক্ষরকে স্বরান্ত অক্ষর বলা হয়। যেমন- পা (প্+আ), কু (ক্+উ)। অন্যদিকে, যে সকল অক্ষরের সমাপ্তি ঘটে ব্যঞ্জনধ্বনির মাধ্যমে তা-ই ব্যঞ্জনান্ত অক্ষর। যেমন- জল, বক, প+বন, বি+রান, ক+লম, ক+রণ, সুখ+বর, দো+লন ইত্যাদি। সে ভিত্তিতে অক্ষর দুভাগে বিভক্তঃ মুক্তাক্ষর বা বিবৃত (Open Syllable) ও বদ্ধাক্ষর, রুদ্ধাক্ষর বা সংবৃত (Close Syllable) ।

১৷ মুক্তাক্ষরঃ যে সব অক্ষরের শেষে স্বরধ্বনি থাকে অর্থাৎ উচ্চারণ কালে আটকে যায়না এবং ইচ্ছেমত দীর্ঘ করে টেনে পড়া যায় , তাকে মুক্তাক্ষর বলে৷ যেমনঃ কি, কে ,হ্যাঁ, হা, সু, মা, ও,না ,বা, যা ইত্যাদি ৷ উদাহরণঃ তোমাকে (তো+মা+কে), পৃথিবী (পৃ+থি+বী), প্রিয়াকে (প্রি+য়া+কে), জননী (জ+ন+নী), ইত্যাদির প্রত্যেকটির তিনটি করে অক্ষর রয়েছে, যার এক একটা অক্ষরই এক একটা মুক্তাক্ষর৷ অর্থাৎ ধ্বনির রেশ থেকে যায়। যে কথাটা এখন বলছি, সেটা অতি জরুরী কথাঃ প্রতিটি মুক্তাক্ষর যে কোনো ছন্দেই এক মাত্রা ধরা হয়।

২৷ বদ্ধাক্ষরঃ ব্যঞ্জনধ্বনির মাধ্যমে যে সব অক্ষর শেষ হয়, উচ্চারণ কালে আটকে যায় এবং একা উচ্চারিত হতে পারেনা বা পরবর্তী শব্দের সাথে মিলিয়ে পড়তে হয় এবং দীর্ঘ করে টেনে পড়া যায় না, তাকে বদ্ধাক্ষর বা রুদ্ধাক্ষর বলে। যেমনঃ দিন্/রাত্/ধান্/বোন্/ হাত্/ ফুল্/ হয়্ ইত্যাদি ৷ অর্থাৎ উচ্চারণের রেশ থাকবার কোনো সুযোগই নেই। ধরা যাক একটি শব্দ ‘মহাজন’ ; মহা+জন। এখানে ‘মহা-আ-আ-আ-আ-’ টানা যায়। তাই এ অক্ষরটি মুক্তাক্ষর। আর ‘জন’ অক্ষরটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই রেশহীন শেষ। ধ্বনির রেশ রুদ্ধ। তাই তা বদ্ধাক্ষর বা রুদ্ধাক্ষর। আবার ‘অবরুদ্ধদ্বার’ শব্দটিকে অক্ষরে বিভক্ত করলে পাওয়া যাবে, অ+ব+রুদ+ধ+দ্বার। এখানে অ, ব এবং ধ হলো মুক্তাক্ষর; রুদ এবং দ্বার হলো বদ্ধাক্ষর।

আবারো যেটা এখন বলছি, সেটা অতি জরুরী কথাঃ বদ্ধাক্ষরগুলো স্বরবৃত্তে সাধারণত এক মাত্রা, মাত্রাবৃত্তে সবখানে (অর্থাৎ শব্দের প্রথমে বা মধ্যে বা শেষে, যেখানেই থাকুকনা কেনো) দুমাত্রা, এবং অক্ষরবৃত্তে শব্দের শেষে থাকলে দুমাত্রা ধরা হয়। (তাহলে, আর সে কথা বলবার অপেক্ষাই রাখে না যে, অক্ষরবৃত্ত ছন্দে বদ্ধাক্ষর শব্দের প্রথমে বা মধ্যে থাকলে এক মাত্রা হয়।)

যেমনঃ হয়তো (হয়+তো),একটা(এক+টা), পাখনা (পাখ+না) ,পাঁচটা (পাঁচ+টা), মনটা (মন+টা), গানটা (গান+টা), স্রষ্টা (স্রষ+টা) ইত্যাদির আদিতে বদ্ধাক্ষর থাকায় অক্ষরবৃত্তে প্রথম দুই অক্ষর মিলে এক মাত্রা এবং পরবর্তী এক অক্ষর এক মাত্রা মোট দুই মাত্রা হবে । যেমনঃ ১+১=২। কিন্তু মাত্রাবৃত্তে তিন মাত্রা হবে, কারণ মাত্রাবৃত্তে প্রত্যেকটি অক্ষরকেই এক একটি মাত্রা ধরা হয় এবং স্বরবৃত্তে বদ্ধাক্ষর সব সময় এক মাত্রা হওয়ায় মোট দুই মাত্রা হবে। হয়তো এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে অক্ষরবৃত্তে ও স্বরবৃত্তে একই মনে হবে। কিন্তু বদ্ধাক্ষর শব্দের শেষে থাকলে অক্ষরবৃত্তে দুমাত্রা হবে, অপর দিকে স্বরবৃত্তে বদ্ধাক্ষর সব সময়ই একমাত্রা হবে।

যেমনঃ (অবান্তর=অ+বান্+তর),

(অনন্তের=অ+নন্+তের) ৷ এখানে তিনটি শব্দেই অক্ষরবৃত্তে হবে, ১+১+২=৪ মাত্রা ৷

মাত্রা বৃত্তে হবে, ১+২+২=৫ মাত্রা এবং স্বরবৃত্তে হবে , ১+১+১=৩ মাত্রা ৷

মুক্তাক্ষর সব ছন্দেই একমাত্রা হওয়ায় বদ্ধাক্ষরের মাত্রা গণনাভেদে বাংলা ছন্দ রীতিতে বিভেদ ঘটে।

/চলবে...

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :