বখাটেদের উৎপাতে অতিষ্ঠ তাহিরপুরের কিশোরীরা

জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া, সুনামগঞ্জ
 | প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল ২০২১, ২০:১৭

স্কুলে আসা যাওয়া পথে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা হয়। ছবি তুলে নানাভাবে হয়রানি করা হয়। নদীতে বর্ষায় গোসল করতে গেলেও শান্তি নেই। বখাটেরা নৌকা নিয়ে এসে ছবি তুলে, ভিডিও করে। এই কারণে বাধ্য হয়ে বাড়ির টিউবওয়েলে গোসল করেন মেয়েরা। দিন দিন বখাটেদের উৎপাত বাড়ছে। তাদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে বাড়িতে থেকেও রেহাই পাচ্ছে না ভুক্তভোগী তরুণীরা।

এসব বক্তব্য সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের টাকাটুকিয়া গ্রামের ষষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া পপি বর্মন ও তার বোন কলি বর্মণের।

এই দুইবোন বলেন, গরীব-অহসায় পরিবারের মেয়ে হওয়া কি অপরাধ? আমাদেরকে যে যেভাবে পারে ডিস্টার্ব করবে। এর প্রতিবাদও কি আমরা করতে পারব না। বাড়িতে থেকেও শান্তি নাই।

চামেলী বর্মণ নামে আরেকজন কলেজ পড়ুয়া জানান, গ্রামের মুরুব্বিদের জানিয়ে বিচার চাওয়া হয়েছে। চার বার বিচার করেও কোনো লাভ হয়নি। বরং বিপদ আরও বেড়েছে। এলাকার মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা শুরু হয়েছে আরও দুই-তিন বছর আগে থেকেই। এখন যে পরিস্থিতি শুরু হয়েছে এলাকায় থাকা যাবে না। কী করবেন তাও বুজতে পারছেন না।

সরজমিনে এলাকায় গিয়ে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জানা যায়, ভান্ডার নদীর পূর্ব পাড়ের গ্রাম টুকেরগাঁও আর পশ্চিম পাড়ে টাকাটুকিয়া গ্রাম। দুটি গ্রামই হিন্দু ও মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের পুরোনো আবাস। বছরের পর বছর ধরেই মিলেমিশে বসবাস এই গ্রামে। গ্রামের কিছু ‘বখাটে’ তরুণ বহুদিন ধরেই টাকাটুকিয়া গ্রামের মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে আসছে। তাদের উত্ত্যক্ত-হয়রানির শিকার হয়ে এক পরিবারের স্কুল পড়ুয়া দুই ছাত্রী অতিষ্ঠ।

টাকাটুকিয়া, জামালগড়, রসুলপুর ও টুকেরগাঁও গ্রামের গণ্যমান্যদের উপস্থিতিতে সালিশ বৈঠক করা হয়েছে বেশ কয়েকবার। এসব সালিশে টুকেরগাঁওয়ের মোক্তার আলীর ছেলে কাশেম মিয়া, শহীদ মিয়ার ছেলে লাইট মিয়া ওরফে রুহিত, বিল্লাল মিয়ার ছেলে মুসা মিয়া ও মুক্তার আলীর ছেলে পাবেল মিয়া, সিরাজ মিয়ার ছেলে মেজর আলীকে বখাটেপনার জন্য শাস্তি হিসেবে কান ধরে উঠবস করানো হয়। ভবিষ্যতে এমন কাজ করবে না বলে সালিশে অঙ্গীকারও করেছিলেন তারা।

বিচারের পর আরও ক্ষেপে যায় এসব যুবক। এরপরই গত বুধবার দুপুর ১টার দিকে দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের টাকাটুকিয়া গ্রামের মাটি কাটার সূত্র ধরে টুকেরগাঁও গ্রামের উত্ত্যক্তকারী যুবকরা দেবেন্দর বর্মণের বাড়িতে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছে। হামলায় বৃদ্ধ ও নারীসহ আটজন আহত হয়েছেন।

এ ঘটনায় ওই দিন রাতে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ২৫ জনকে আসামি করে দেবেন্দ্র বর্মণের ছেলে সত্যেন্দ্র বর্মণ বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ বৃহস্পতিবার দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠায়।

মামলার পর থেকে টুকেরগাও গ্রামের পাঁচটি পরিবারের লোকজন এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছে। এছাড়া মামলাকে পুঁজি করে পুলিশের হয়রানির ভয়ে আশপাশের লোকজনও আতঙ্কে আছে। এলাকায় সুনসান নিরবতা বিরাজ করছে। এলাকাবাসীর দাবি, প্রকৃত অপারাধীদের যেন আইনের আওতায় আনা হয় এবং একইসঙ্গে এলাকার কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন এ ঘটনায় হয়রানির শিকার না হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী টুকেরগাও গ্রামের এক যুবক বলেন, গত বুধবার দুপুরে আমি গরুকে গোসল করাচ্ছিলাম। এ সময় টাকাটুকিয়া গ্রামের দুজন মাটি কাটছিল। আর টুকেরগাওয়ের কয়েকজন এসে তাদের বাধা দেয়। একপর্যায়ে মারধর করে। পরে ২০-২৫ জনের সশস্ত্র দল ওই বাড়িতে হামলা করে নারী-পুরুষদের মারধর করে।

তিনি বলেন, বাড়িতে লুকিয়ে থাকা বাবুলকে ঘর থেকে ধরে এনে নির্মমভাবে পিটিয়েছে হামলাকারীরা। পরে স্থানীয় এলাকাবাসী মিলে তাদের রক্ষা করে। এই হামলার মূল কারণ হলো হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ কেন তোলা হলো। তাদের উৎপাতে এলাকার মেয়েরা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছে না। এছাড়া ছয় মাস আগে দেবেন্দ্র বর্মণের ছেলে বাছিন্দ্র বর্মণের ৫০ হাজার টাকা দামের জালে আগুন দেয় একই হামলাকারীরা। খড়ের ঘরও জ্বালিয়ে দেয়া হয়।

তাহিরপুর হাসপাতাল সুত্রে জানা যায়, হামলায় আহতরা হলেন দেবেন্দ্র বর্মণ(৭০), তার ছেলে বাছিন্দ্র বর্মণ(৫০), সত্যেন্দ্র বর্মণ(৪৫), সঞ্চিত বর্মণ(৩০), বাছিন্দ্র বর্মণের স্ত্রী বিউটি বর্মণ (৪৫), ছেলে বাবলু বর্মণ (১৭), শিপলু বর্মণ (১৫) ও তাদের আত্মীয় দেবল বর্মণ (২২)।

আহতদের একজনকে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। বাকিদের মধ্যে বাছিন্দ্র, বিউটি ও বাবলু বর্মণের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

গ্রামের বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক নারায়ণ বর্মণ বলেন, বখাটেদের যন্ত্রণায় গ্রামের মেয়েরা বাড়ি থেকে বের হতেই ভয় পায়। একবার গ্রামে সালিশ করে ওদের শাস্তি দেয়া হয়। সেই থেকে আরও উৎপাত বাড়িয়েছে।

অভিযুক্ত মুসার বাবা বিল্লাল মিয়া বলেন, ঘটনার সঙ্গে আমরা বড়রা যুক্ত ছিলাম না। আমরা কিছুই জানি না। সম্পূর্ণ ঘটনা ‘ছোটদের’।

তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি আব্দুল লতিফ তরফদার বলেন, মামলার দুজন আসামিকে আটক করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। অন্যান্য আসামিদের আটকের জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।

(ঢাকাটাইমস/১৬এপ্রিল/কেএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :