ডিজিটাল পুলিশ

যেভাবে মানুষের দ্বারে সেবা নিয়ে গেলেন পুলিশপ্রধান

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৩ জুন ২০২১, ১৫:৪৪ | প্রকাশিত : ২৩ জুন ২০২১, ১০:২১

‘আমার নয় বছরের একটি ছেলে আছে। কিন্তু বিয়ের পর থেকে স্বামী নানা অজুহাতে অপমান ও মারধর করে। কিছুদিন আগে ছেলেসহ আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। পরে উঠেছি ভাইয়ের বাড়িতে। পুলিশের মি‌ডিয়া অ্যান্ড পাব‌লিক রি‌লেশন্স উইং‌ আমার পাশে দাঁড়ালে সংসার করতে পারব।’

ঢাকার কেরানীগঞ্জের ধনাঢ্য পরিবারে বিয়ে হওয়া তানজিলা আক্তারের (ছদ্মনাম) এমন বার্তায় পুলিশের মি‌ডিয়া উইং‌ ও থানা পুলিশের সহায়তায় স্বামীর সংসারে ফিরেছেন এই নারী। স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির কারও বিরুদ্ধে কোনো মামলা করতে হয়নি তাকে। থানায়ও যেতে হয়নি অভিযোগ নিয়ে। তিনিও চেয়েছিলেন মামলা-মোকদ্দমা ছাড়াই সন্তানকে নিয়ে স্বামীর সংসার করতে।

থানায় না গিয়ে ঘরে বসে এমন পুলিশি সেবা কখনো কি কল্পনা করেছে কেউ। হয়তো করেছে, কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ নিয়ে আশার প্রদীপ জ্বালানোর সাহস হয়নি। সেই কল্পনাই এখন উজ্জ্বল বাস্তব। ঘরে বসেই মিলছে পুলিশি সেবা। ধনী-গরিব নির্বিশেষে।

পুলিশে এ রকম অনেক অভূতপূর্ব ব্যবস্থা কার্যকর করে দক্ষ ও জনবান্ধব পুলিশের এক চিত্ররূপ গড়ে তুলেছেন বাহিনীটির প্রধান ড. বেনজীর আহমেদ। তার নানা সৃজনশীল উদ্যোগ বাস্তবায়নে ভোগান্তি কমেছে সেবাপ্রত্যাশীর। পুলিশের প্রতি বেড়েছে সাধারণ মানুষের আস্থা।

সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের ব্যক্তিরা বলছেন, এটাই তো ডিজিটাল বাংলাদেশ। মানুষ থানায় না গিয়ে এমন সেবা পাচ্ছে, বিষয়টি ভাবতেই ভালো লাগে।

যাত্রী নিয়ে যেতে না চাওয়ায় রাজধানীর ধোলাইখালে রিকশাচালককে এক ব্যক্তির নির্যাতনের ঘটনা মনে আছে? এই দৃশ্য মোবাইল ফোনে একজন প্রত্যক্ষদর্শী ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়েছিলেন। ভিডিওটি পুলিশের মিডিয়া উইংয়ের নজরে এলে দুই দিনের অভিযানে অভিযুক্ত মোহাম্মদ সুমন আটক হয় পুলিশের হাতে।

রাজধানীর হাতিরঝিলে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের প্রতিনিয়ত উত্ত্যক্ত করত বখাটে যুবকরা। ঘটনাটি জানিয়ে একজন ব্যক্তি পুলিশের সহযোগিতা চান। এরপর পৃথক অভিযানে প্রায় ২০০ কিশোরকে আটক করে পুলিশ। এর পরই আলোচনায় আসে পুলিশের ফেসবুক পেজটি।

এমন অসংখ্য অসহায় সেবাপ্রত্যাশীর মুখে হাসি ফোটাচ্ছে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মিডিয়া উইং পরিচালিত ‘পুলিশের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ। আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদের নেতৃত্বে পুলিশকে একটি জনবান্ধব পুলিশ বাহিনীতে রূপান্তর করতে কাজ করছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স।

সদরদপ্তর বলছে, প্রতিদিনই পুলিশের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে মানুষ সহায়তা চাচ্ছে। আর সহযোগিতা করে সাধারণ মানুষের পাশে থাকছে পুলিশ। পেজটি এরই মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পুলিশ সুপার (এসপি) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা সব সময় এটি দেখভাল করেন। কেউ সহযোগিতা চাইলে কিংবা অভিযোগ করলে সাড়া মেলে দ্রুত। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে অনলাইনেই চলে বাদী, বিবাদী ও পুলিশের উপস্থিতিতে যাচাই-বাছাই। এরপর আইনি সহায়তা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এর পিছু ছাড়েন না নিয়োজিত কর্মকর্তারা।

গত বছরের ১৫ এপ্রিল ড. বেনজীর আহমেদ ৩৭তম আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব নেন দেশের পুলিশ বাহিনীর। সফলতার সঙ্গে ইতিমধ্যে এক বছর পূর্ণ করেছেন। আইজিপির দায়িত্ব নেওয়ার পরই স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক পুলিশি ব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে ঘোষণা করেন পাঁচ মূলনীতি- জনগণের প্রতি অপেশাদার আচরণ বন্ধ করা, দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স প্রদর্শন, বিট পুলিশিং বাস্তবায়ন, পুলিশ সদস্যদের কল্যাণ ও শৃঙ্খলা নি‌শ্চিতকরণ।

এরই মধ্যে পুলিশে নানা দিকে, নানা ক্ষেত্রে ঘটেছে উন্নয়ন। হয়েছে নানামাত্রিক ইতিবাচক সংযোজন। তা যেমন পুলিশ সদস্যদের জন্য, তেমনি বাহিনীর জন্য। আর তার মাধ্যমে জনসাধারণের সঙ্গে পুলিশের এক এক নির্ভয় মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে।

তারই একটি পুলিশের এই পেজ। কদিন আগে এই পেজে তথ্য পেয়ে পাবনা থেকে উদ্ধার করা হয় এক ব্যবসায়ীকে, যাকে জোরপূর্বক পাগল সাজিয়ে রাখা হয়েছিল।

প্রবাসেও গেছে এই পেজের সহযোগিতা। ইব্রাহিম নামের একজন নিঃস্ব অসুস্থ প্রবাসী এ ফেসবুক পেজের ইনবক্সে জানান, তিনি সৌদি আরবে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। দেশেও ফিরতে পারছেন না। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে পুলিশের সহযোগিতা চান। ইব্রাহিমের আকুতি বিফলে যায়নি। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়।

রাতের আঁধারে টঙ্গীতে শিশুর বুকে লাথি মারা লোককেও ছাড় দেয়নি পুলিশের ফেসবুক পেজটি। তথ্য পাওয়ার পর সেই অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর টিউশনির টাকা আদায় হয়েছে পুলিশের মধ্যস্থতায়। এমনই আরও কত উদাহরণ দেওয়া যায়- পরকীয়ায় আসক্ত স্বামীকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা, অনলাইন সম্পর্কে জড়িয়ে নগ্ন ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইলের অভিযুক্তও আটক হয় এই পেজের দায়িত্বশীলতায়।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (​বেসিস) প্রেসিডেন্ট সৈয়দ আলমাস কবীর ঢাকাটাইমসকে বলেন, `এটাই তো ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা ছিল। মানুষ থানায় না গিয়ে এমন সেবা পাচ্ছে, বিষয়টি খুবই ভালো। নাগরিক হিসেবে সাধারণ মানুষের আরও যেসব সেবা আছে- সেগুলো এমন ডিজিটাল হলে মানুষ আরও উপকৃত হবে।’ পুলিশের এই ধরনের কাজ ও সেবার প্রশংসা করেন তিনি।

ঘরে বসে আরও সেবা

ড. বেনজীর আহমেদ পুলিশের সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সারাদেশকে ছয় হাজার ৯১২টি বিটে ভাগ করে প্রতি বিটে একজন কর্মকর্তাকে পদায়নের মাধ্যমে `বিট পুলিশিং‘ কার্যক্রম চালু করেন। এতে থানায় না গিয়ে ঘরে বসে পুলিশি সেবা মিলছে। ফলে কমেছে ভোগান্তি। পাশাপাশি পুলিশের প্রতিও সাধারণ মানুষের আস্থা বেড়েছে।

পুলিশপ্রধানের পদক্ষেপের কারণে ‘জনমুখী পুলিশি সেবা’পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। উন্নত পুলিশি সেবা দিতে হ্যান্ডস ফ্রি পুলিশিং চালু করতে মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের টেকটিক্যাল বেল্ট দেওয়া হয়েছে। ছয় চেম্বারের আধুনিক এই ট্যাকটিক্যাল বেল্টে থাকছে পিস্তল, হ্যান্ডকাফ, অতিরিক্ত ম্যাগাজিন, এক্সপেন্ডেবেল ব্যাটন, পানির পটসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের হাত থাকছে সম্পূর্ণ খালি। এতে বিপদগ্রস্ত মানুষের যেকোনো প্রয়োজনে দ্রুত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারছে পুলিশ। আবার অপরাধীকে দ্রুত ঘায়েল করতে ট্যাকটিক্যাল বেল্টে থাকা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করা যাচ্ছে অনায়াসে।

নারীর জন্য সাইবার নিরাপত্তা

পুলিশপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. বেনজীর আহমেদ নারীদের নিরাপত্তায় কাজ করেছেন বিভিন্ন উদ্যোগের সফল কার‌্যকরের মাধ্যমে। নারীরা যাতে সাইবার বুলিংয়ের শিকার না হন, তাদের জন্য নিরাপদ সাইবার স্পেস নিশ্চিত করতে চালু করেছেন ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ফেসবুক পেজ। কোনো নারী সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে তিনি সহজেই এ পেজের মাধ্যমে প্রতিকার পাচ্ছেন। প্রতিটি থানায় চালু করা হয়েছে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী সার্ভিস ডেস্ক। টেকনাফে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ানের নতুন ইউনিট চালু করা হয়েছে।

লকডাউনে অসহায়ের পাশে পুলিশ

গত বছরের শুরুতে করোনার কারণে সারাদেশ কার্যত লকডাউন ছিল। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া নাগরিকদের ঘর থেকে বের না হওয়ার নির্দেশ দেয় সরকার। এ সময় ঘরে কিংবা হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা মানুষকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও ওষুধ ঘরে পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ। মেট্রোপলিটন এলাকা ছাড়াও বিভাগীয় ও জেলা পুলিশ এসব কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের এসব ভালো কাজের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে প্রতিনিয়ত খোঁজ রেখেছেন পুলিশপ্রধান। তাছাড়া সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার পাশাপাশি করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়া এবং মৃত ব্যক্তির দাফন করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল পুলিশের।

পরিবহনে শৃঙ্খলায় প্রতিজ্ঞ

পরিবহন খাতে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামে অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর ও সাহসী ভূমিকা রয়েছে পুলিশপ্রধান ড. বেনজীর আহমেদের। যেকোনো মূল্যে তিনি সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন। মহাসড়কে অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি না চালানো, মহাসড়কে নসিমন, করিমন, ভটভটি ইত্যাদি যানবাহন বন্ধ রাখতে মালিক শ্রমিকদের তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন সব সময়।

বেনজীর আহমেদ যখন ঢাকার কমিশনার ছিলেন, আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি ডিএমপিতে অবকাঠামোগত উন্নয়নও ঘটে অনেক। মিরপুর পিওএমএর সামগ্রিক আধুনিকায়ন, ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ, রাজারবাগের প্রশাসনিক ভবন সম্প্রসারণ, আধুনিক মিডিয়া সেন্টার স্থাপন, মোবাইল কমান্ড সেন্টার, মোবাইল ওয়াচ টাওয়ার, ডগ স্কোয়াড ও ৮টি নতুন থানা স্থাপন অন্যতম। প্রথম সরকারি কোনো অফিসে মিডিয়া সেন্টার স্থাপনের নজির স্থাপন করেন তিনি।

(ঢাকাটাইমস/২৩জুন/এসএস/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :