এ পবিত্র পেশায় অনৈতিকতা বেমানান

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০৫ জুলাই ২০২১, ১২:২৯

কোনো ইচ্ছা ছিল না বিসিএস এ জয়েন করার। শহরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আমি গ্রামে গিয়ে কাজ করব ভাবতেই পারতাম না। সবচেয়ে বড় কথা আমি অত্যন্ত হোমসিক। যতই ঘুরাঘুরি করিনা কেন দিনশেষে আপন আলয়ে ফিরে আসার আনন্দটুকু অপ্রতিম আমার কাছে। তাছাড়া রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে আমার চাকরি, কোয়ার্টার সবই হয়ে গিয়েছিল। আর গাইনিতে এফসিপিএস প্রথম পর্বও হয়েছে এর মাঝে। তবু ও এই দিল্লি কা লাড্ডু বিসিএস এ জয়েন না করার সাহস কেউ দিতে পারল না। বরঞ্চ একটু চাপের মাঝেই ছিলাম।

পুলিশ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের খুব স্নেহভাজন ছিলাম আমি। উনি ই একমাত্র আমাকে এই আশ্বাস দিলেন যে এখানে থাকলে পোষ্টগ্রাজুয়েশন শেষ করার সমস্ত সুযোগ সুবিধা দেবেন। কিন্তু কি এক সম্মোহনে ২০০৫ সালের জুলাই এর দুই তারিখ বিসিএস এ জয়েন করি।

আমার প্রথম পোষ্টিং বিখ্যাত সাবসেন্টারে হয়। কেন বিখ্যাত জানেন? ওটা বর্তমান মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আর সাবেক মন্ত্রী মওদুদ আহমেদের এলাকা। অনেকের অনেক রকম উপদেশে আমার কান ঝালাপালা হওয়ার দশা। কিভাবে কাজ করব এই বৈরি পরিবেশে? আমি তো একেবারেই অভ্যস্ত নই। এতদিন যে আমি সিনিয়রদের ছায়াতলে ছিলাম, সেই আমাকে চিকিৎসা সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত একাই নিতে হবে।

নিজেকে খুব অসহায় মনে হতো আর পরিবেশটাও ছিল ভয়াবহ পলিটিক্যাল। জয়েনিং এর দুইদিন পর স্থানীয় মেম্বার আর তার কিছু সাঙ্গ পাঙ্গ ২ লিটারের সেভেন আপের বোতল আর কয়েক প্যাকেট এনার্জি বিস্কুট নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে এলেন। তাদের কথা বার্তা আর বেশভূষা দেখে অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়ি। এ কোথায় আসলাম আমি? পুলিশ হাসপাতালের চাকরি ছাড়ার জন্য আক্ষেপ হতে থাকে। এরপর কেটে যায় কিছুদিন। নিজেকে অভ্যস্ত করার চেষ্টা করি। মনযোগ দিয়ে রোগি দেখতে থাকি। অল্প কদিনেই তাদের জন্য একটা কোমল স্থান তৈরি হয় হৃদয়ে।

একজন মহিলা ডাক্তার পেয়ে নারী রোগিরা যেন হালে পানি পেল। এতদিন ধরে একজন স্যাকমোর কাছে তারা তাদের স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত কমপ্লেইনগুলো করত। স্বাভাবিকভাবেই আশাপ্রদ চিকিৎসা পেত না। আমি আসার পর আমার কাছে তারা মন খুলে তাদের সমস্যার কথা বলে আস্বস্ত হতেন। আমার বেশভূষার জন্য তারা প্রথমে খুব ইতস্তত বোধ করতেন। গ্রামাঞ্চলের মানুষরা খুবই পর্দানশীল হন। আপাদমস্তকই ঢাকা আর আমার শহুরে চালচলন, বেশভুষা। কাছে ঘেষতে ও যেন এক অদৃশ্য বাঁধা।

নিজেকে পরিবর্তিত করি। মাথায় কাপড় দেয়া শুরু করি। আস্তে আস্তে ওদের অন্তরঙ্গ হয়ে যাই। ভালবেসে ফেলি অসহায় মানুষগুলোকে। ঢাকা থেকে কিছু সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি নিয়ে sebaceous cyst, bartholin cyst excision, perineal tear repair শুরু করি। ইতোমধ্যে হয়ে যাই সাবসেন্টারের স্যাকমো আর মেডিকেল এসিস্ট্যান্টের শত্রু। আমাকে ভিজিট নেয়া আর অপারেশন চার্জ নেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। আর এও বলে ভিজিট না নিলে আমাকে কেউ বড় ডাক্তার মনে করবে না। আমি সাফ বলে দিতাম ,

"তাতে আমার কিছু আসে যায় না, অনৈতিক কোনো কাজ আমি করিনা।" এ পবিত্র পেশায় অনৈতিকতা বেমানান। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে চিকিৎসা করতে থাকি।

যেহেতু গাইনীতে এফসিপিএস প্রথম পর্ব করা ছিল, ক্যারিয়ারের ব্যাপারটাও আমার কাছে ছিল মুখ্য। এর মাঝে মন্ত্রণালয় থেকে একটা সার্কুলার হয়, যারা বিসিএস জয়েনিং এর আগে এফসিপিএস প্রথম পর্ব পাশ করেছে তারা কোর্স শেষে গ্রামে এসে কাজ করবে এই শর্তে ট্রেনিং পোষ্টের জন্য আবেদন করতে পারবে। আমিও আবেদন করি। এলাকার মানুষেরা ব্যপারটা অচিরেই টের পায়। আমার প্রতি অগাধ ভালোবাসার প্রকাশস্বরূপ এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে তারা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছে আবেদন করে যাতে আমার পোষ্টিং অন্য জায়গায় না হয়। তারা আমাকে হারাতে চান না।

আমি দ্বিধায় পড়ি। একদিকে ক্যারিয়ারের অমোঘ টান অন্যদিকে মানুষের নিঃস্বার্থ ও আন্তরিক ভালবাসা। কষ্ট পেতে থাকি। এদিকে UHFPO অফিসের কেরানীরা আমাকে ট্রেনিং পোষ্টের আবেদন অগ্রগামী করার জন্য উৎসাহ দিতে থাকেন। আর বলতে থাকেন

"ম্যাডাম,ওদের চিঠি UHFPO স্যারকে দেয়া যাবে না। দিলেই আপনার সব কিছু জনস্বার্থে আটকে যাবে।" এখান থেকে ক্লিয়ারেন্স নিয়ে তাড়াতাড়ি সিভিল সার্জন অফিসের গণ্ডি পার করার পরামর্শ দিলেন। আমিও তাই করলাম। বিদায়ের দিনে ভেদু মিয়া, রহিমা খালাসহ আর ও অনেকের চোখের পানির কথা আজ ও ভুলতে পারিনা। আমার ও চোখ ভিজে উঠে। অনাত্মীয়ের প্রতি এত কম সময়ে কিভাবে এত ভালবাসা গড়ে উঠে আমি ভেবে পাইনা।

এছাড়াও আমাকে UHFPO অফিসের কর্মচারীরা ফেয়ার ওয়েল দেন। উপহার হিসেবে জায়নামাজও দেন। এখানে উল্লেখ্য সাবসেন্টারে আমার ৯ মাসের চাকরি জীবনে আমাকে এক পয়সাও ঘুষ দিতে হয়নি। কর্মচারীরা বেশিরভাগই রিটায়ারমেন্টে চলে গেছেন। এখনও আমি তাদের সাথে যোগাযোগ রাখি,তারাও। আমার সাফল্যে উনারা আমার নিকটাত্মিয়ের মতই আনন্দে উদ্বেলিত হন।

পরিশেষে, প্রথম পোষ্টিং আমার জীবনের জন্য ছিল এক আশির্বাদ। আমাকে শিখিয়েছে মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, নির্লোভ মনোভাব, নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিবাদী হতে। আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ যে বিসিএসএ জয়েন করার ইচ্ছা আমার মাঝে জাগ্রত হয়েছিল। ফেলে আসা মানুষগুলোর অকৃত্তিম ভালোবাসার ঋন কোনো দিন ও শোধ করতে পারবনা আমি। তাদের প্রতি অন্তরের অন্তস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক,ভাইরোলজী বিভাগ,ঢাকা মেডিকেল কলেজ

ঢাকাটাইমস/৫জুলাই/এসকেএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

নারীমেলা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :