তালেবানের নয়া উত্থান বাংলাদেশে কোনো প্রভাব ফেলবে না

রাফিউজ্জামান লাবীব, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২১, ১৯:৫৭ | প্রকাশিত : ২৪ আগস্ট ২০২১, ১৯:৫৬

আফগানিস্তানে নাটকীয়ভাবে ক্ষমতার পালাবদল হতে চলেছে। মসনদে বসতে যাচ্ছে ধর্মীয় গৌষ্ঠী তালেবান। কট্টর ওহাবি মতবাদে পুষ্ট এই জঙ্গি গৌষ্ঠী আফগানিস্তানের শাসনকর্তা হতে চলায় এই অঞ্চলের দেশগুলোতে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে তালেবানের নতুনভাবে এই উত্থানের তেমন কোনো প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে না বলেই মনে করছেন অধ্যাপক এহসানুল হক। ঢাকা টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই শিক্ষক দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় তালেবানের প্রভাব কেমন হতে পারে তা ব্যাখ্যা করেছেন।

ঢাকা টাইমস: আফগানিস্তানে তালেবানের নতুনভাবে উত্থানকে কীভাবে দেখছেন?

এহসানুল হক: আফগানিস্তানে ২০ বছর পরে পুনরায় তালেবানের উত্থান নতুন কিছু নয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত তারা আফগানিস্তানকে শাসন করেছিল এবং সেটা ছিল আফগানিস্তানের ইতিহাসে ভয়ংকর একটা সময়। ২০০১ সালে নর্দার্ন অ্যালায়েন্স ও ন্যাটো জোটের যৌথ অভিযানে তালেবান সরকারের পতন হলেও তালেবানরা একাবারেই নিঃশেষ হয়ে যায়নি বরং এই সময়টাতে তারা ব্যাপকভাবে নিজেদেরকে কাজে লাগিয়ে শক্তি সঞ্চয় করেছে। নিজ দেশে আমেরিকানদের দ্বারা পরিচালিত সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে তারা এই সফলতা অর্জন করেছে বলে আমি মনে করছি।

ঢাকা টাইমস: তাদের সফলতা অর্জনে কোন বিষয়গুলো বেশি ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন?

এহসানুল হক: তালেবানদের এই অর্জনের পেছনে পাকিস্তানের সবথেকে বেশি পরোক্ষ ও নৈতিক সমর্থন আছে বলে আমি মনে করি। আরেকটি বিষয় হলো ২০০১ থেকে বর্তমান পর্যন্ত তালেবান নেতৃত্বের মধ্যে আত্মবিশ্বাস অনেকগুণ বেড়েছে। শুধু তাই নয় তালেবানরা উগ্রপন্থী একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে তাদের যতগুলো কর্মপরিকল্পনা আছে সেগুলোকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দোহায় যুক্তরাষ্ট্র এবং তালেবানের আলোচনা যে উপসংহারে পৌঁছেছিল অর্থাৎ আফগানিস্তান থেকে আমেরিকানদের সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের পর থেকে তাদেরকে অতিমাত্রায় আগ্রাসী করে তুলেছে।

ঢাকা টাইমস: তালেবানদের বিজয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে কীরকম প্রভাব ফেলবে বলে আপনার ধারণা?

এহসানুল হক: তালেবানদের বিজয় বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে খুব ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারবে না বলে আমি মনে করি। ১৯৯৬ সালে যখন তালেবানরা ক্ষমতায় আসে তখন বাংলাদেশের কিছু কিছু উগ্রপন্থী নাগরিক আফগানিস্তানে গিয়েছিল এবং তৎকালীন প্রেক্ষাপটে সরকারের একটি অংশ এই উগ্রপন্থীদের সমর্থনও করেছিল। কিন্তু তৎকালীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের সাথে বর্তমান বাংলাদেশের বিরাট পার্থক্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার জঙ্গি বিরোধী তৎপরতায় গত পাঁচ বছরে যে সফলতা অর্জন করেছে সেই সফলতাকে বিবেচনা করলে দেখা যাবে বাংলাদেশে তালেবানদের বিজয় খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারবে না। বর্তমান বাংলাদেশ সরকার যেকোনও ধরনের জঙ্গি ও উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে যে অসহিষ্ণুতার পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে কেউ যদি চেষ্টাও করে ভবিষ্যতে তারা খুব একটা সফল হবে না।

ঢাকা টাইমস: তালেবানদের বর্তমান নেতৃত্ব ও পরিকল্পনায় কী রকম হতে পারে বলে ধারণা করছেন?

এহসানুল হক: তালেবানরা যথেষ্ট স্মার্ট। আমেরিকানরা আফগানিস্তানে যেখানে আধিপত্য লাভ করেছিল ২০ বছর পরে তারা সেখানে তাদের শক্তি নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছে এখানেই তাদের আসল রূপটা বোঝা যায়। তবে তাদের ক্ষমতা দখলের পরে নেতৃত্বের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য আসবে বলে আমি মনে করি। জনগনের কাছে গ্রহণযোহ্যতা পাওয়ার জন্য তালেবানরা তাদের মতবাদকে কিছুটা শিথিল করছে বলেও আমার কাছে মনে হয়। নারীদের হিজাব পরে কর্মক্ষেত্রে আসার আহ্বান দ্বারা এটি বুঝা যায়।

আরেকটি মত হলো, এই বিশ বছরে তারা বুঝেছে তাদের মৌলিক কিছু পরিবর্তন দরকার তাই কৌশলগত দিক থেকে তাদের মতবাদগুলোকে জনগণের জন্য কিছুটা সহজ করে দিচ্ছে। গত বিশ বছরে যে পরিবর্তন এসেছে সেটাও ইতিবাচক হতে পারে। তবে মূল নেতৃত্বে কতটুকু পার্থক্য আসবে সেটা নিয়ে শঙ্কা রয়ে গেছে।

ঢাকা টাইমস: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই তাদের বিজয়কে মক্কা বিজয়ের সাথে তুলনা করছে। এক্ষেত্রে আপনার মূল্যায়ন কী?

এহসানুল হক: অনেকেই মক্কা বিজয়ের সাথে তুলনা করলেও আমার কাছে এটা মনে হয় না। ইসলাম তো একটা মহান ধর্ম। ইসলামকে তারা তাদের মতো করে নাগরিকদের কাছে পৌঁছিয়ে দিচ্ছে। নারী নেতৃত্বের ব্যাপারে তাদের মতবাদের সাথে ইসলামের মতবাদের পার্থক্য রয়েছে।

ঢাকা টাইমস: তাদের বিজয়টা কি রাজনৈতিক না ধর্মতাত্ত্বিক?

এহসানুল হক: তাদের বিজয়টাকে রাজনৈতিক বিজয় হিসেবেই বিবেচনা করব আমি। গত বিশ বছরে তারা বসে ছিল না। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তারা যোগাযোগ রেখে চীনের সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। তালেবানদের দেশ আফগানিস্তান হলেও বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি আমেরিকার নেতৃত্বকে হটিয়ে দিয়ে তারা আমেরিকার স্থলাভিষিক্ত হযেছে।

ঢাকা টাইমস: আশরাফ গনির দেশ ছাড়ার বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

এহসানুল হক: আশরাফ গনির দেশত্যাগের বিষয়টিকে আমেরিকার সিদ্ধান্তে হয়েছে বলে মনে করি। তাকে তো পুতুল করে রেখেছিল আমেরিকা। যেখানে আমোরিকা টিকতে পারেনি সেখানে আশরাফ গনি কীভাবে টিকবেন সেটা বুঝাই যায়।

ঢাকা টাইমস: তালেবান ইস্যুতে বিশ্ব মিডিয়ার ভূমিকাকে কীভাবে দেখছেন?

এহসানুল হক: বিষয়টিকে বিশ্ব মিডিয়া বেশি পরিমাণে কাভার দিচ্ছে এর দুইটা কারণ হতে পারে। এক, তালেবান আবার তাদের উগ্রপন্থী রূপে ফিরে আসে কিনা তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়, এটা বিশ্বকে জানান দেওয়া। দুই হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের নেতৃত্ব ও শক্তি হারাচ্ছে সেই বিষয়টা বিশ্বকে জানানো।

ঢাকা টাইমস: চীন তালেবানের পেছনের শক্তি হিসেবে থাকলে বিশ্ব রাজনীতি কোনদিকে মোড় নিতে পারে?

এহসানুল হক: আমেরিকা তার মিত্র শক্তিসহ কিছুটা কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। আর এদিকে চীন তো চায় দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের প্রভাব উত্তরোত্তর বিস্তার করতে। এই ইস্যুতে চীন কিছুটা সুযোগ কিছুটা সুযোগ নেবে।

ঢাকা টাইমস: আফগানিস্তান থেকে পলায়নরত নাগরিকদের ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?

এহসানুল হক: আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্যদের অনুপস্থিতিতে আফগান নাগরিকেরা নিজের অনিরাপদ মনে করছে। তাই তারা জীবনের মায়া করে দেশত্যাগ করছে। যেখানে আফগান সেনারাই নিজেদের জীবন নিয়েই শঙ্কিত, তারা কীভাবে নাগরিকদের জীবন রক্ষা করবে? তবে এটা যেন না হয় সেজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় একটা ভূমিকা থাকা উচিত।

(ঢাকাটাইমস/২৪আগস্ট/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :