তিন মাস ধরে ধুঁকছে ১২ প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই ভবন

বোরহান উদ্দিন, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০৩ অক্টোবর ২০২১, ০৮:২১

ভবনটিতে হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই দিদ্বিদিক ছোটাছুটি। বিস্ফোরণের আঁচ ছড়িয়ে পড়ে পাশে থাকা অন্য বাড়ি আর সড়কেও। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে ভবনের দেয়াল ও কাচের টুকরো। এরমধ্যেই শোনা যায় মানুষের আতর্নাদ। বাইরে বাজতে থাকে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। দ্রুত গতিতে আহতদের নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। একে একে মারা যান ১২ জন।

গত ২৭ জুন সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারের ওয়্যারলেস এলাকায় ‘রাখী ভিলা’ নামের তিনতলা ভবনটি বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত হয়। ১২ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি গুরুতর আহত হন অনেকে। যাদের বেশিরভাগই পথচারী। বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাস্তায় থাকা অনেকগুলো বাস। বেশ কিছু অটোরিকশা, প্রাইভেট কার।

ভয়াবহ বিস্ফোরণে ধ্বংসস্তুপ হয়ে থাকা সেই ভবনটি এখন ধুঁকছে। ঘটনার তিন মাস পার হলেও এখনো বাড়িটির কোনো গতি হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ভবন যেকোনো সময় ধসে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিস্ফোরণের ঘটনায় সরকারের ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থা তদন্ত করেছে। বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে গ্যাস লিকেজ হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

দুর্ঘটনা কেন ঘটলো তার চেয়েও আশপাশের ভবনের ব্যবসায়ী ও পথচারীদের দুঃশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিধ্বস্ত ভবনটি তিনমাসেও ভাঙা হয়নি সেটি নিয়ে। রাজউকের পক্ষ থেকে ওইসময় দ্রুত ভবনটি ভেঙ্গে ফেলতে মালিককে বলা হলেও এতদিনেও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে ঝুঁকিপূর্ণ এই ভবনটি। ফলে ভেতর দিয়ে একদম বিধ্বস্ত হওয়া ভবনটি যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। দুর্ঘটনা ঘটলে বিস্ফোরণের সময়ের চেয়েও বড় ধরণের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা সবার।

শরিফুল ইসলাম নামের একজন পথচারী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘ফুটপাতের ওপরেই ভবনটি। অথচ এতদিনেও কারো নজরে পড়েনি। এটি ভেঙে পড়লে আবার প্রাণহানি ঘটবে। কিন্তু কেউ দায় নিবে না।’

বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের নিচতলায় একটি খাবারের দোকান ও একটি মাংস বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের দোকান ছিল। যার অস্তিত্ব বোঝার কোন উপায় নেই। উপরে ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রির একটি শোরুম ছিল, সেটিও অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। এছাড়াও ভবনটির অনেকগুলো পিলার ভেঙ্গে উপরের তলাগুলো ধসে পড়ে ওইসময়। বর্তমানেও একই অবস্থায় আছে ভবনটি।

তদন্ত কমিটি যা বলছে: মগবাজারের ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় একাধিক সংস্থা তদন্ত করেছে। এর মধ্যে কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) তদন্ত কমিটি এই ঘটনায় রাজউক, সিটি করপোরেশনসহ কয়েকটি সেবা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা প্রমাণ পেয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে তিতাস, রাজউক, সিটি করপোরেশনসহ অন্তত পাঁচটি সংস্থাকে চিঠি দিয়ে জবাব চাওয়া হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।

অন্যদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তাৎক্ষণিকভাবে প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ বলেছিলেন, ঘটনার পরে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বাতাসে ‘হাইড্রোকার্বন’ গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে মাসখানেক আগে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

আবুল কালাম আজাদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এখানে গ্যাস লিকেজ ছিল। সেটা বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তিতাসকে বলা হয়েছে বলে জেনেছি।’ তবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি ভাঙার বিষয়টি রাজউক ভালো বলতে পারে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে করা তদন্ত প্রতিবেদন সদর দপ্তরে জমা দেয়া হলেও এ নিয়ে কোনো কিছু জানা যায়নি। তবে জানা গেছে, তদন্ত প্রতিবেদনে কেন দুর্ঘটনা ঘটল আর এতে কার কী ধরনের গাফিলতি ছিল তা তদন্তে উঠে এসেছে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তিরোধে প্রয়োজনীয় মতামতও দেওয়া হয়। ভবিষ্যত দুর্ঘটনা রোধে ১৪ দফা সুপারিশও করা হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।

তদন্ত কমিটির কর্মকর্তারা জানান, তিতাসের গ্যাস লাইনের ছিদ্র থেকে বিস্ফারণ ঘটলেও, ৬০ বছরের পুরোনো একটি আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যিক ভবন হিসাবে ব্যবহার করায় দায় এসব সেবা প্রতিষ্ঠান এড়াতে পারে না।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রন-১) মো. মোবারক হোসেন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আমরা এটি ভেঙ্গে ফেলার জন্য বলেছি। সিটি করপোরেশন এটি দেখবে। ভাঙা হয়নি কেন এখনো তারাই ভালো বলতে পারবে।

যেমন দেখা গেল বিধ্বস্ত ভবনটি

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ভবনটির নিচতলায় ইট-সুরকির স্তুপ। পথচারীদের অনেকে রাতের বেলায় প্রাকৃতিক কার্যী সম্পাদন করায় সামনে দিয়ে দুর্গন্ধে হাঁটা দায় সামনে দিয়ে। তবে দ্বিতীয় তলার ধসে পরা ছাদ এখনো ঝুলছে। পূর্ব ও পশ্চিম পাশের দেয়াল থাকলেও সামনে ও পেছনের দেয়াল পুরোপুরি ভাঙা। তবে দ্রুত এটি ভেঙে ফেলার জন্য নীচে নতুন করে লোহার নিরাপত্তা পিলার বসানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সেখানে কথা হয় সাইদুর রহমান নামের একজন শ্রমিকের সঙ্গে। ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ‘এটি ভেঙে নতুন করে ভবন করবে। মালিক বুধবার এসে দেখে গেছেন। আমরা দশজনের মতো লোক কাজ করছি এটি ভাঙার জন্য। ভবন মালিক মশিউর রহমান খোকনের সঙ্গে এতদিনেও ভবন না ভাঙার বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।’

(ঢাকাটাইমস/০৩অক্টোবর/বিইউ/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :