দোকানে দোকানে ‘ক্রিকেট জুয়া’

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ৩০ অক্টোবর ২০২১, ২১:৩৮

শনিবার সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি চায়ের দোকানে বসে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ভুলের সমালোচনা করছেন মো. সবুজ। শুক্রবার বাংলাদেশ বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলার যেন প্রতিটি বলের হিসাব রয়েছে তার কাছে। পাশাপাশি ভাঙারির ব্যবসায়ী সবুজ জানালেন ওই ম্যাচে তার লোকসান হয়েছে ১০ হাজার টাকা। সবুজের কাছে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি জানান, বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওই ম্যাচকে ঘিরে দেশের পক্ষে ১০ হাজার টাকা বাজি ধরেছিলেন তিনি। কিন্তু বাংলাদেশ দল হেরে যাওয়ায় ওই লোকসান গুনতে হয়েছে তাকে।

সবুজ জানান, এই বাজি ব্যক্তি পর্যায়ে না। বাজি ধরেছিলেন বেটিং ওয়েবসাইটে।

সবুজের ভাষ্যমতে, তার একটি বন্ধু মহল আছে। যারা সব ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে বেটিং সাইটগুলোতে জুয়ায় মেতে ওঠেন। কখনো কখনো লাভ হলেও বেশির ভাগ সময়ই লোকসান গুনতে হয় তাদের। তবে লাভের আশায় গত দুই বছরে বিপুল পরিমাণ টাকা লোকসান গুনেছেন এই যুবক।

মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের মিনাবাজার এলাকার চায়ের দোকান, সাত মসজিদ হাউজিং, চাঁদ উদ্যান, শ্যামলী হাউজিং, তুরাগ হাউজিং, সুনিবিড় হাউজিং, গাবতলী, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকাসহ রাজধানীর প্রায় সব এলাকায় এখন গজিয়ে উঠেছে চায়ের দোকানে ক্রিকেট জুয়ার আসর। প্রতিটি ক্রিকেট ম্যাচকে ঘিরেই জমে ওঠে এই জুয়া। এর সঙ্গে জড়িত একদল জুয়াড়ি, চায়ের দোকানি এবং অনলাইনে বেটিংয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের এজেন্টরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, চায়ের দোকানে একদল মানুষ বসে টেলিভিশনে খেলা দেখছেন এবং পাশে বসা ব্যক্তিদের সঙ্গে জুয়া খেলছেন। দূর থেকে দেখলে মনে হবে সবাই খুবই মনোযোগ সহকারে খেলা দেখছেন। বাস্তবতাও তাই। কারণ সাধারণত ক্রিকেটের সঙ্গে যারা জড়িত তারা সব ক্রিকেট দল ও খেলোয়াড় সম্পর্কে বিস্তর তথ্য রাখেন। তবে এই জুয়াড়িরা পেশাদারদের চেয়েও বেশি তথ্য রাখেন। নবাগত ক্রিকেটারদের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বাইশ গজে আছেন এমন শত শত ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার যেন মুখস্ত তাদের। যদিও যারা এই জুয়া খেলছেন তাদের একটি বড় অংশই রাজমিস্ত্রী, রিকশা চালক, ভ্যানগাড়ি চালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, পাঠাও-উবার চালক, ছোট কর্মচারীসহ দিন মজুর শ্রেণির মানুষ।

খেলার প্রতি ওভারে এসব এলাকার চায়ের দোকানে লাখ টাকা পর্যন্ত বাজি হয়। আবার দোকানে বসে জুয়া খেলার বিষয়ে শর্তও আছে দোকানিদের। বিজয়ী ব্যক্তিকে লাভের ১০ থেকে ২০ শতাংশ দিতে হবে দোকানদারকে। আবার কোনো কোনো দোকানে দোকানি নিজেই জুয়াড়ি।

দোকানে থাকা ব্যক্তিরা বল প্রতি, ওভার, দল, খেলোয়াড়, রান সব বিষয়েই জুয়া চলে। এমনকি এক ওভারে কয়টি ডট বল হবে এ বিষয় নিয়েও চলে তুমুল জুয়া।

আবার মুখোমুখি বসে জুয়া খেলার পাশাপাশি দোকানে বসেই অনেকে বাজি ধরেন অনলাইনে। বেটিং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে চলে মোটা অঙ্কের লেনদেন। মোবাইল ফোনে ভিপিএন চালু করে এই জুয়ায় মেতে ওঠেন জুয়ারিরা। বেট৩৬৫, ওয়ানএক্স বেটসহ বিভিন্ন নামি ও বেনামি ওয়েবসাইটে চলে ক্রিকেট বেটিং। যদিও বাংলাদেশে এর কোনো বৈধতা নেই।

সূত্র জানিয়েছে, এসব ওয়েবসাইটে জুয়া খেলতে অনলাইনে ডলার বা কয়েন কিনতে হয়। সেই ডলার বা কয়েন বিক্রি করতেও খেলা শুরুর আগে থেকে এসব চায়ের দোকানে সক্রিয় থাকেন একদল ব্যবসায়ী।

বেটিং ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বেটিং ওয়েবসাইট ওয়ান এক্স বেটের অন্যতম এজেন্ট আনিস মোহাম্মদী। রাজধানীর কেরানীগঞ্জের এই বাসিন্দা সব খেলাকে কেন্দ্রে করেই মেতে ওঠেন উন্মুক্ত জুয়ায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইমু ব্যবহার করে ‘ওয়ান এক্স বেট’ নামক ওয়েবসাইটের বাংলাদেশ থেকে জুয়া খেলা নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। তার অধীনে জুয়ায় অংশ নেন হাজার হাজার মানুষ। এই হাজার হাজার জুয়াড়িকে অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া, জুয়ার নিয়ম-কানুন জানানো, জুয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অনলাইন ডলার বা কয়েন সরবরাহ, বাজি জয়ের পর সেই টাকা উত্তোলন সবই নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।

আনিস মোহাম্মদী ওয়ান এক্স বেট ছাড়াও দুবাই ক্লাব, টাকা০৭ ডটকম, লাক৭৫ ডটকম, টাকা১০০ ডটকমের নিয়ন্ত্রক।

সূত্র বলছে, চলতি টি-২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেট আসরে তার মাধ্যমে প্রতি খেলায় প্রায় কোটি টাকা হাতবদল হচ্ছে।

অনুসন্ধানে অনলাইন বেটিংয়ের বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইটের নাম জানা গেছে। এরমধ্যে ক্রেস্ট ৭১ ডটকম, ওয়ান এক্স বেট ডটকম, বিডি বেট ১০ ডটকম, বেট বকি ডটকম, গেম অন সেভেন ডটকম, গেম ২৪ ডব্লিউ ডটকম, বেট স্কোর ২৪ ডটকম, লাকি বস ৩৬৫ ডটকম, বেট নাও ২৪ ডটকম, ৯ উইকেট ডটকম, বেট ফাস্ট ৩৬৫ ডটইউকে, প্লেস বেট ৩৬৫ ডটইউকে, বেটিন ১০০ ডটকম, বেট বাটারফ্লাই ডটকম, বেলফাস্ট ৩৬৫ ডটইউকে, স্কোর ৬৬ ডটকম, বেটিন ২০ ডটকম, ৬ এন বিডি ডটকম বেশ জমজমাট ওয়েবসাইট।

তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখে পড়লে এসব ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর পুনরায় অন্য নামে ফিরে আসছে তারা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিটি ওয়েবসাইট এক বা একাধিক এডমিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তারাই জুয়া পরিচালনা করেন। এসব ওয়েবসাইটে জুয়া খেলতে প্রথমে একটি আইডি তৈরি করতে হয়। এক্ষেত্রে নাম ও মোবাইল নম্বর দিয়ে আইডি খুলতে হয়। পরবর্তী ধাপে টাকা পাঠিয়ে ‘কয়েন’ কিনতে হয়।

ওয়েবসাইটগুলোতে এক বা একাধিক বিকাশ, রকেট ও নগদ নাম্বার দেওয়া রয়েছে। যেখানে টাকা পাঠালে টাকার সমপরিমাণ কয়েন দেওয়া হয়। এরপর রেজিস্ট্রেশনকারী সে কয়েন দিয়ে প্রতি খেলায় সর্বনিম্ন ২০ কয়েন, সর্বোচ্চ যেকোনো পরিমাণ বেট বা বাজি ধরতে পারে।

বাজি ধরার পর জয়ী হলে বিজয়ীর অ্যাকাউন্টে কয়েন জমা হয়। পাঁচশ কয়েন জমা হলে তা উইথড্র অপশনের মাধ্যমে তুলতে পারবেন জুয়াড়িরা। এক্ষেত্রে এডমিনের কাছে রিকোয়েস্ট করে বিকাশ, রকেট বা নগদ নাম্বার দেয়ার ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে টাকা পাঠিয়ে দেয় ওয়েবসাইট এডমিনরা।

অনুসন্ধান বলছে, জুয়ার অর্থ লেনদেনের জন্য এডমিনদের কাছে ১০ থেকে ১৫টি করে বিকাশ, রকেট ও নগদ মোবাইল ব্যাংকিং সেবার নাম্বার রয়েছে। বিকাশ, রকেট ও নগদের এজেন্ট সিম নিতে ভুয়া তথ্য, প্রমাণ ব্যবহার করছে এসব ওয়েবসাইট পরিচালকরা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিফোন রেগুলেটরি কমিশন-বিটিআরসির নজরে এলে এসব ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। তবে বন্ধ করে দেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়েবসাইটের ডোমেইন নাম পরিবর্তন করে পুনরায় তারা ফিরে আসছেন।

ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিলেও জুয়াড়িদের জমা রাখা টাকার নিশ্চয়তা দেয় অনেক ওয়েবসাইট। নতুন ডোমেইন নিয়ে ফিরে এসে জুয়াড়িদের জমা থাকা কয়েন ফেরত দিচ্ছে তারা। জুয়াড়িরা বেটিংয়ের জন্য জমা বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়া ওয়েবসাইটের সংখ্যাও কম নয়।

জানা গেছে, বেটিং ওয়েবসাইট তৈরিতে পেশাদার ওয়েব ডেভলপারসদের মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। আর ডোমেইন বন্ধ করে দেওয়া হলে ওয়েবসাইটের সঙ্গে নতুন ডোমেইন যুক্ত করতে সময় লাগে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট। আর প্রতিটি ডোমেইনের দাম এক হাজার টাকা।

বেটিং ওয়েবসাইটের তথ্য পেলে তা বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। মন্ত্রী বলেন, ‘ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করে দেওয়ার বিকল্প আমার কাছে কিছু নেই। পাশাপাশি আমি যেটা করি, বন্ধ করার পাশাপাশি আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলি, তদন্ত করে অপরাধীদের শনাক্ত করে তাদের যেন ধরা হয়।’

(ঢাকাটাইমস/৩০অক্টোবর/কারই/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :