স্মৃ তি ক থা

কিশোরীদের দেখা একাত্তরের ভয়াবহ স্মৃতি

সুরমা জাহিদ
| আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:২০ | প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:৫১

শেফালীর দাদার বাড়ি নাটোরে। তার দাদা ছিলেন সহজ সরল বোকা ধরনের মানুষ। তাই তার ভাইয়েরা তাকে ঠকিয়ে সব সহায়সম্পত্তি থেকে তাকে বঞ্চিত করে। সেই কষ্টে সে বাড়ি ছেড়ে চলে যায় কুমিল্লায়। ওখানে গিয়ে সে সব রকমের কাজকর্ম করতে থাকে। এক সময় কুমিল্লার এক ধনী পরিবারের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই পরিবার তাকে আশ্রয় দেয় এবং তার দায়িত্ব নেয়। ওই পরিবারের এক মেয়েকে বিয়ে করেন। সেই পরিবার তাকে কিছু জমাজমি দিয়ে ঘরবাড়ি করে দেয়। তার স্ত্রী খুবই বুদ্ধিমতি ছিলেন। তাই তিনি খুব ভালো করে সুন্দরভাবে সংসার চালাতে থাকেন। তাদের সুদিন আসতে বেশি দিন লাগেনি। সেদিক দিয়ে তারা কুমিল্লারই। শেফালীর মুখ থেকেই শোনা যাক তার কথা।

আমার নামটা অনেক বড়। কারণ হলো, ফরিদা নামটা রেখেছে আমার দাদা। আমার দাদির নাম ছিল ফরিদা বানু। তাই দাদা শখ করে ফরিদাই রেখেছেন। আর পারভিন রেখেছেন আমার নানি। আর আমার আম্মার পছন্দ ছিল শেফালী। এই তিন নাম নিয়ে বাড়িতে অনেক কিছু হয়েছে। আমার আব্বা কারো কথা ফেলতে পারেননি। সবাইকে খুশি রেখে আমার নাম এত বড় হয়ে গেছে। আমার আম্মার শেফালী ফুল খুব প্রিয়। তাই শেফালী নাম রাখা। আরও আছে, এই ফুলটা ফুটে শরৎকালে। আমারও জন্ম শরৎকালে। এই ফুল রাতে ফুটে। আমার জন্ম হয়েছিল রাত বারোটার দিকে। এগুলো আমার ধারণা।

আমরা নয় ভাইবোন বেঁচে আছি, আমার বড় তিনজন হয়ে মারা গেছে। আমি চার নম্বর। বেশ আদরের ছিলাম। আমার ছোট একজন মারা যায়। তারপর আরও মারা যায়। আমার আম্মার বারো-তেরজন সন্তান হয়েছিল। নয়জন বেঁচে আছি। আমার চাচাত ভাইবোন মিলে ২০-২৫ জন ছিলাম। আরও গ্রামের এমন ২০-২৫ জন ছিল। সব মিলিয়ে বেশ বড় একটা দল ছিল আমাদের। বেশ আনন্দে-আরামে দিন কাটছে। তখন গ্রামের লোক একটা কথা বলতেন, যাদের গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ ছিল, তারাই ছিল গ্রামের মাথা, আর সুখী। আমাদের এসবই ছিল প্রচুর পরিমাণে। তাই গ্রামে আমাদেরকে লোকে বেশ মান্যগণ্য করতেন। আর আমাদের বাড়িকে গ্রামের লোক সুখী বাড়ি বলতেন। রাস্তা দিয়ে যদি হেঁটে যেতাম, তখন লোকে বলতেন, ওই যে সুখী বাড়ির মেয়ে যাচ্ছে। সুখে-দুঃখে বেশ ভালো দিন কাটছে।

১৯৭১ সাল, বয়সে আমি কিশোরী। কিশোরী বয়সে যা করে, তাই করতাম। যত রকম গাছ বলেন, সব রকম গাছে আমি উঠতে পারতাম। এমনকি নারকেল, সুপারি গাছেও আমি উঠতে পারতাম। আর বেশির ভাগই ছেলেদের সঙ্গে থাকতাম। ছেলেদের সঙ্গে উঠাবসা ছিল বেশি। তাই আমাদের দলে সব মেয়ের আগে আমি জানতে পারি যে, আমাদের দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এবার বুঝি সব ধ্বংস করে ফেলবে পাকিস্তানি মিলিটারিরা। এমন কথা বারবার আসছে। আবার চলেও যাচ্ছে। যদিও কোনো পাত্তা দেইনি বেশি। মনে মনে ভাবতাম, কি এমন যুদ্ধ হবে। হয়তো খুব বেশি হলে রাজায় রাজায় যুদ্ধ করবে। সেটা হবে ঢাকায়। ঢাকাতে কত মিটিং-সভা হচ্ছে। সে রকমই হবে। আর সত্যি কথা বলতে কি, যুদ্ধ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। কারণ আমরা থাকতাম গ্রামে। দুই-তিন বছর মনে হয় স্কুলে গিয়েছিলাম। কোনো শিক্ষিত মানুষের সঙ্গে আমাদের উঠাবসা ছিল না। শিক্ষিত মানুষের চলাফেরা, কথাবার্তা সবই তো আলাদা। এমনকি তাদের ভাবনার সঙ্গেও আমাদের মিলে না। কোনো সিনেমাও দেখিনি তখন। গ্রামে দু-একজনের বাড়িতে রেডিও ছিল শুনেছি, কিন্তু দেখিনি। আমরা কোথা থেকে শিখব নতুন নতুন কথা। যুদ্ধের আগে আমরা শহরে আসিনি। শুধু শুনেছি শহরে কত কি হয়। অনেক সুন্দর সুন্দর, কত রকমের গাড়ি চলে, রকমারি জিনিস পাওয়া যায়। এর চেয়ে বেশি কিছু জানতাম না। যুদ্ধ সম্পর্কে কীভাবে কি জানবো। তা ছাড়া শিক্ষিত পরিবার থাকলে, সব বিষয়ে কথাবার্তা বলে তখন সন্তানরাও কম বেশি শুনে ও জানে। আমাদের পরিবার কিন্তু এরকমও ছিল না যে, বাড়ির সকলে বসে কথাবার্তা বলবে, সঙ্গে আমাদেরকেও নিবে। আমার তো মনেই পড়ে না যে, আমার আব্বা আমাকে কোনো দিন কোলে নিয়েছিলেন, ডেকে আদর করেছিলেন। যাক, এসব কথা।

যখন পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, দেশের অবস্থা খুব খারাপ, তখন আমাদের সঙ্গের দু-তিনজন ছেলে যুদ্ধে চলে গেছে। তখন আমার মনের ভেতর সারাক্ষণ কেমন যেন করে। কেন করে, কেমন করে তা কিছুই বুঝতে পারি না। তবে এটা বুঝতে পারি যে, মনটা স্থির নেই। মনের ভেতর নানাভাবে শুধু যুদ্ধের কথাই নাড়াচাড়া করে। আস্তে আস্তে যুদ্ধ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি, বুঝতে পারি। যখন জানতে ও বুঝতে শুরু করি, তখন কেমন যেন একটা অপরাধবোধ কাজ করতে শুরু করেছে। তখনও কিন্তু আমি জানতাম না যে, নারীরাও যুদ্ধে যাচ্ছে, যুদ্ধ করছে। এমনিতেই আমার মনে কোনো অজানা কিছু তাড়া করছিল।

দেখতে দেখতে কয়েক মাস চলে গেছে। এই কয়েক মাসের মধ্যেই আমাদের এলাকায় যুদ্ধ চলে এসেছে। এরই মাঝে একদিন মাঝ রাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তখন শুনতে পাচ্ছি, ফিসফিস করে কারা যেন কথা বলছে। বুঝতে পারি, অনেক লোকে কথা বলছে। অনেক চেষ্টা করি জানতে, বুঝতে, কারা বলছে, আর কি কথা বলছে। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারিনি। তখন আমি উঠে বসি। আস্তে আস্তে দরজা খুলি। প্রস্রাব করতে হবে, আস্তে আস্তে প্রস্রাব করে ওই ঘরের দিকে যাই। বেড়ার ঘর ছিল তো, ছোট ছোট ফাঁকা ছিল। ভেতরে দেখার জন্য অনেক চেষ্টা করে দেখতে পেলাম, প্রায় দশ-বারোজন লোক বসে কথা বলছে, সঙ্গে বাবাও আছেন। কুপি বাতিটা জ¦লছে। এই দেখে আমি ঘরে শুয়ে পড়ি, ঘুমাইনি। একটু পরে শুনি থালা-বাটির টুনটান শব্দ, তখন আমার মাথায় আসে যে, গিয়ে দেখি কি হচ্ছে। আমি কিছুই বুঝে ওঠতে পারছিলাম না যে, তারা কারা, কিসের জন্য এসেছে। ফিসফিস করে কেন কথা বলে। থালা-বাটির শব্দ কেন হচ্ছে। এমন ঘটনা প্রায় দিনই ঘটে। আমি টের পাচ্ছিলাম। প্রায় মাস খানেক পর আবার একদিন বুঝতে পারি, লোকজন এসেছে। এর মাঝে প্রায়ই আমি টের পেয়েছি কিন্তু উঠে দেখিনি। ওইদিন রাতে আমি উঠে যাই এবং ওই ঘরের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখি, ঘরভর্তি লোক। দু-তিনজন শুয়ে কাতরাচ্ছে।

আমাদের পাশের বাড়িতে ছিল একজন কবিরাজ। তাকে আমরা দাদা বলে ডাকতাম। তার হাত খুব ভালো ছিল, সাত গ্রামের লোক আসতেন কবিরাজ দাদার কাছে। প্রথমে ভাবলাম, মনে হয় রোগী এসেছে। পরক্ষণেই মনে হলো, দাদা তো দিনেও রোগী দেখেন, তবে রাতে কেন। আর এত চুপচাপ কেন, এত সব চিন্তা করতে করতে হঠাৎ মনে হলো রক্ত। আমি তখন সেই ঘরের ভেতর যাই। ঘরের ভেতর গিয়ে দেখি, তিনজন লোকের সারা শরীর রক্ত দিয়ে মাখা। এখনো সমানে রক্ত বের হচ্ছে। তাদের সঙ্গে বন্দুক, সবাই তাদেরকে নিয়ে ব্যস্ত। এসব দেখে আমি ভয়ে কাঁপছি। কিছুক্ষণ থাকার পর আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে বাইরে চলে যাই। বাইরে হয়ে কিছুক্ষণ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকি। তখনও পর্যন্ত আমি বুঝতে পারিনি তারা কারা, কেন তাদের এই অবস্থা। এসব ভাবতে ভাবতে আমি ঘরের ভেতর চলে যাই। অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমি চুপ হয়ে শুয়ে আছি। এক সময় মা এসে আমাকে বাইরে ডেকে নিয়ে যায়। বাইরে নিয়ে গিয়ে বলছেন, তুমি যা দেখেছ তা যেন কেউ না জানতে পারে। আজকের রাতে তুমি যা দেখেছ, কোনো দিন তা নিয়ে মুখ খুলবে না। এসো, ওই ঘরটা পরিষ্কার করে ফেলি। সকাল হয়ে যাচ্ছে, তাড়াতাড়ি করতে হবে। লোকজন উঠে গেলে তা জানাজানি হয়ে যাবে। আর এসব জানাজানি হয়ে গেলে খুব বেশি বিপদে পড়ে যাব। আমি বেশ কিছুক্ষণ চুপ হয়েছিলাম। কেন যেন আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। মা বারবার ডাকার পর আমি ছোট করে জিজ্ঞাসা করি, মা, তারা কারা। প্রথমে মা কোনো উত্তর না দিয়ে চলে গেছেন। কি যেন মনে করে আবার ফিরে এসে মায়ের মুখের কাছে আমার কানটি নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, তারা মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ করতে গিয়ে পাকিস্তানিদের গুলিতে তারা আহত হয়েছেন। তাদের চিকিৎসা করে ভালো করতে হবে। এ কথা শুনে আমার একটু সাহস হলো। ঘরটা লেপার জন্য মাটি আর পানি নিয়ে আমি ওই ঘরের ভেতর চলে যাই। গিয়ে দেখি, একজন এখনো আছেন। তার আঘাতটা বেশি হওয়াতে তিনি হাঁটতে পারছেন না, তাই রয়ে গেছেন। আমি কিছু না বলে তাড়াতাড়ি করে ঘর লেপে ঘর থেকে বের হয়ে যাই।

তখন থেকেই তার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমার ভেতর একটা জোর আগ্রহ ও ইচ্ছা কাজ করছে। সময় সুযোগ মতন সেই ঘরে যাব এবং সব আমি জানবো। দুপুরে বাড়ি অনেকটা খালি। সেই সুযোগে আমি সেই ঘরে যাই এবং তার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, যুদ্ধের সময় গুলি লাগাতে তিনি হাঁটতে পারছেন না। একটু ভালো হলেই চলে যাবেন। তিনি আমাকে খুব সাবধান করে দেন যেন একথা আমি কাউকে না বলি।

পরদিন সন্ধ্যায় দেখি, আব্বা কোদাল আর শাবল এনে ওই ঘরের কাছে রেখেছেন। আমি তখন থেকেই নজর রাখছি যে, ঘটনাটা কি। সন্ধ্যার পর আব্বাসহ আরও দুজন ওই ঘরের ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। পরে শব্দ শুনি, মাটি কাটার শব্দ। আমি তখন ঘরের ভেতরে ঢুকি। দেখি, তারা বড় একটা গর্ত করছে। আমি জিজ্ঞাসা করি, কেন এই গর্ত করা হচ্ছে। তখন আব্বা বলেন, পাকিস্তানিদের হাত থেকে জান বাঁচানোর জন্য এই গর্ত। যখন দেখবে বা শুনবে পাকিস্তানিরা এসে হামলা করছে, তখন এই গর্তের ভেতরে লুকিয়ে থাকবে। পুরো ঘরটাই অনেক বড় করে গর্ত করে ফেলা হয়। তাদের সঙ্গে আামিও তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করি। এভাবে প্রতি রাতেই কয়েকজন করে মুক্তিযোদ্ধা আসেন। খাওয়া-দাওয়া, একটু বিশ্রাম করে ফিরে যান। আবার আহত মুক্তিযোদ্ধা আসেন, তাদেরকে চিকিৎসাসহ সেবা-যত্ন করি, ভালো হলে চলে যান।

এভাবে প্রায় দুই-আড়াই মাস চলে যায়। ভালোই যাচ্ছে দিন। এসব কি আর গোপন থাকে। একদিন এসব জানাজানি হয়ে যায়। হঠাৎ একদিন বিকেলে আমাদের গ্রামের একজন লোক আমাদের বাড়িতে আসে। এসে চারপাশে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে আবার চলে গেছে। ঘণ্টা দুই-এক পর ফিরে আসে। তখন আমরা অনেক ছেলেমেয়ে খেলা করছি, সে এসে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ। তার নাম ছিল হালিম। আমরা তাকে হালিম চাচা বলে ডাকতাম। এমনিতে বেশ রসিক ছিল। আমাদেরকে আদরও করতো। কিন্তু কিছুক্ষণ থাকার পর আবার চলে যায়। পাঁচ-সাত মিনিট পর আবার ফিরে আসে। কখন কোথায় গেছে, আবার কোথা থেকে এসেছে, কিছুই দেখিনি। এসেই পানি খেতে চেয়েছে। আমরা তখন সবাই খেলা করছি, এমন সময় বারবার এসে এটা-সেটা জিজ্ঞাসা করছে, তাতে আমরা খুব বিরক্ত হচ্ছি। পাশেই ছিল কুয়া, কেউ একজন মনে হয় পানিও দিয়েছিল, সঠিক আমার মনে নেই। আমরা খেলা করছি, সে দাঁড়িয়েই ছিল।

আমাদের খেলা শেষ হলে আমাকে ডাকেন এবং খুব কৌশলে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, প্রতি রাতে তোমাদের বাড়িতে কারা আসে, কেন আসে, আমরা কি দিয়ে তাদেরকে খাওয়াই। তারা কখন আসে, কখন যায়। প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি। তারপর বুঝতে পেরে আমি একটাই উত্তর দেই। আমি কাউকে বাড়ি আসতে দেখি না। আর কেউ আসে বলেও তো মনে হয় না। যদি কেউ আসতো তাহলে তো দেখতাম। আর যদি আসে তবে আপনাকে বলবো কেন। এই কথা বলার পর সেই লোকটা চলে যায়। জানি না সে আমার সেই কথা বিশ^াস করেছিল কি না। ভালো-মন্দ না বলে সে চলে যায়। এ ঘটনা আমি বাড়িতে গিয়ে বলি। এ কথা শুনে আমার বাড়ির লোকজন খুব ভয় পেয়ে যায় এবং সবাই সবাইকে সাবধান করে দেয়। আমি প্রায় সময়ই খুঁজি কিন্তু তাদেরকে আর দেখতে পেলাম না।

ঠিক তার পাঁচদিন পর হঠাৎ তিনজন লোক আমাদের বাড়িতে আসে। সেদিনও আমার সঙ্গেই দেখা হয়। তারা আমার সঙ্গে ভালোমন্দ কথা বলেন। এক সময় জিজ্ঞাসা করেন, আমি কোথায় থাকি, কি করি, এখন কোথায় যাব। আমিও সহজভাবে তাদের সঙ্গে কথা বলি। তারা আরও কথা বলতে চেয়েছিল। আমি তখন বলি, এখন আমি অন্য জায়গায় যাচ্ছি, পরে কথা বলবো। তারপর তারা জিজ্ঞাসা করেন, কোথায় যাচ্ছি। কেন যেন মুখ ফসকে বের হয়ে এলো, মামার বাড়িতে। এই বলে আমি চলে যাই। আমি দুজনকে চিনতাম। একজন অপরিচিত ছিল।

পর দিন মঙ্গলবার ছিল। বেলা সাড়ে দশটা-এগারোটা বাজে। আমাদের বাড়ির সকলের নাস্তা-পানি খাওয়া শেষ হলো মাত্র। এমন সময় বাড়ির পূর্ব দিক থেকে মনে হয় কয়েক শ মিলিটারি এসে পুরো বাড়ি ঘিরে ফেলে। এমনভাবে এসেছে যে, আমরা কেউ কোনো টের পাইনি। আর যারা বাড়ির ভেতর ছিল তারা পালাতে পারেনি। বেশি ছিল মহিলারা বাড়িতে। পুরুষরা তো এমন সময় সাধারণত বাড়িতে থাকেন না। মিলিটারি যখন কাছাকাছি চলে এসেছে, তখন যে দেখেছিল সে চিৎকার করে বলছে, পালাও পালাও। কিন্তু তখন আর পালাবার কোনো সুযোগই ছিল না। আমি আর পাশের বাড়ির একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। তার নাম ছিল লাইলী। আমরা কোনো দিশা না পেয়ে পাশেই ছিল খড়ের পাড়া, সেই খড়ের পাড়ার ওপরে উঠে যাই। আর কেউ কোথাও পালাতে পারেনি।

মিলিটারিরা বাড়ির ভেতরে এসেই খুব দ্রুত প্রতিটি ঘরের ভেতরে ঢুকে যায়। মনে হচ্ছে কিছু একটা খুঁজছে। বাড়ির ছোট-বড়, নারী-পুরুষ যারা ছিল তাদেরকে ধরে ফেলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের খোঁজাখুঁজি শেষ হয়। তারপর পট পট করে কয়েকটা গুলি করল। আট-দশজনের লাশ পড়ে গেছে। রক্তের বন্যা বইছে। খড়ের পাড়ার ওপর থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি। গুলি করে মেরে মিলিটারিরা আবার প্রতিটি ঘরের ভেতরে যায়। তারপর তারা চলে যায়। আর এতগুলো লাশ পড়ে আছে মাটিতে। রক্ত বয়ে যাচ্ছে বন্যার পানির মতন। এসব দেখে আর স্থির থাকতে পারিনি। কখন যে বেহুঁশ হয়ে যাই কিছুই বলতে পারবো না। গুলির শব্দে গ্রাম থেকে সব মানুষ পালিয়ে গেছে। সন্ধ্যার দিকে আস্তে আস্তে বাড়িতে লোকজন আসা শুরু করেছে। এক সময় সবাই ফিরে আসে বাড়িতে।

বাড়িতে এতগুলো লাশ পড়ে আছে, তবুও কোনো কান্নাকাটি নেই। লাশগুলো কি করবে না করবে তারও কোনো পরিকল্পনা নেই। সবাই এখানে সেখানে চুপচাপ বসে আছে, কোনো শব্দ নেই। মিলিটারিদের ভয়ে ছোট বাচ্চারাও মায়ের কাছে যাওয়ার কথা ভুলে গেছে। তারাও মাটিতে চুপচাপ বসে আছে। দুধের জন্যও কোনো কান্নাকাটি নেই। সে যে কেমন একটা পরিবেশ ছিল তা আমি বুঝাতে পারবো না। আমরা নামতে পারছি না। এক সময় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। যখন অন্ধকার নেমে এসেছে তখন কুপি বাতি জ¦ালিয়ে লাশগুলো টেনে টেনে কোথায় যেন নিয়ে গেছে। তখন বাড়ির অবস্থা এমন ছিল যে, কারো কাছে কিছু জিজ্ঞাসা করবো, তারও কোনো পরিবেশ ছিল না। অনেক পরে জানতে পারি, আমাদের বাড়ির পিছনে একটা আন্ধা কুয়া ছিল, তার ভেতরে ফেলে দিয়েছে। কোনো গোসল করানো হয়নি; কাফন, দাফন কিছুই করা সম্ভব হয়নি। শুধু লাশগুলো ফেলে দিয়েছে। যে যেভাবে ছিল, সেভাবেই শুধু ফেলে দেওয়া হয়েছে।

সেদিন রাত তো চলে গেছে। কিন্তু বাড়িতে আর থাকা সম্ভব ছিল না। তাই বাড়ির সবাই ঠিক করে, দু-একদিনের মধ্যেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু দু-একদিন সময়ও আমরা পাইনি। পরদিন সকালে কয়েকজন মিলিটারি এসেই সরাসরি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। আমরা তখন দৌড়াদৌড়ি করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। তখন মিলিটারিরা আমাদেরকে তাড়া করে আমরা যার যার মতন করে পালিয়ে যাই। দুদিন আমি এদিক-সেদিক থাকি। দুদিন পর বাড়িতে আসি। এসে দেখি, তখনো ধোঁয়া উড়ছে, বাড়ি পুড়ছে। চোখের সামনে এত বড় বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে কোনো কিছুই আনতে পারিনি। শুধু পরনের যা যা ছিল তাই ছিল।

আমি আসার অনেকক্ষণ পর আমার এক চাচা এলেন। চাচা আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। জানতে পারি, আব্বাকে মিলিটারিরা ধরে নিয়ে গেছে। আমাদেরকে দেখে গ্রামের আরও দুই চারজন এলো। তারা কেউ কেউ বলে আব্বাকে মেরে ফেলেছে। কেউ কেউ বলে, ধরে নিয়ে গেছে। কোনটা যে সঠিক ছিল তা আজও জানতে পারিনি। তার পর থেকে আব্বার সন্ধান আজও পাইনি।

চাচার সঙ্গে আমি চলে যাই। প্রথমে চাচার শ^শুর বাড়িতে যাই। কয়েকদিন ওখানে থাকার পর এক সময় ওই বাড়িও আর নিরাপদ না থাকায় আমরা চলে যাই চাচীর এক আত্মীয়ের বাড়িতে। ওখানে গিয়ে জানতে পারি, আমার আম্মার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এই বাড়িতেও আর থাকা সম্ভব নয়। তখন আবার অন্য জায়গায় চলে যাই। সেটা ছিল নদীর ওপারে। নদীর নাম কি তা তো আর জানি না। তখন নদীর নাম এসব জানার সময় ছিল না। তখন মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ছিল যে, কীভাবে মান-ইজ্জত রক্ষা করে জান বাঁচাবো। নদীর ওপারে গিয়ে দেখি শত শত মানুষ, কিন্তু কোনো ঘরবাড়ি নেই। আসলে ওটা ছিল নদীর চর। চারদিকে পানি আর পানি, মাঝখানে অল্প জায়গায় মাটি। সেই চরে শত শত মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। খোলা আকাশের নিচে থাকছে, নেই কোনো ঘর, নেই থাকার জায়গা, নেই খাবার। গোসল, বাথরুম করার কোনো ব্যবস্থাই নেই। শুধু একেক পরিবারের লোক এক জায়গায় গোল হয়ে বসে থাকে। খোলা আকাশের নিচে শুয়ে থাকে। কেউ কেউ আবার কলাপাতা, কেউ আবার শাড়ি দিয়ে, যে যেভাবে পারছে ঘরের মতন করে থাকছে। সেই চরে আমরা বাকি সময় থাকি। সময় সুযোগ মতন গ্রাম থেকে ভাত, ভর্তা রান্না করে নিয়ে আসতেন। যা আনা হতো তাই ভাগাভাগি করে খেতাম। বেশি আনতেন চিড়া-মুড়ি। ওই চরে অসুখে, বিনা চিকিৎসায় অনেক মানুষ মারা গেছে। সব লাশ পানিতে ভাসিয়ে দিতেন। কোথায় কেমন করে দাফন-কাফন করবে। কাপড় লাগবে, গোসল করাতে হবে। কোথায় পাবে কাপড়, কোথায় কীভাবে গোসল দিবে। কবর খুঁড়তেও তো লাগবে জিনিস, কোথায় পাবে। তাই নদীতে ভাসিয়ে দিতেন সবাই।

অনেক কষ্টের পর এক সময় জানতে পারি আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। দেশ এখন মুক্ত। এই খবর শোনার পর আমাদের আনন্দ দেখে কে। কত স্বপ্ন, কত আশা, কত ভাবনা নিয়ে আমরা ফিরে আসি যার যার বাড়িতে। অন্যদের কথা বলতে পারবো না। আমাদের বাড়ির কোনো অস্তিত্বই ছিল না, সব পুড়ে ছাই। শুধু তাই নয়, পোড়া ভিটা বাড়িটাও অন্যেরা দখল করে নিয়েছে। আমাদের পরিবারের অন্য সদস্যরা কোথায় তা-ও জানি না। তখন কে কার খোঁজ নেয়। নিজেদের খোঁজ নিজেরাই নিতে পারছে না। আমাদের পরিবারটা ধ্বংস হয়ে গেছে। যে বাড়িতে এতগুলো লোক ছিল, একটা ঝড়ে সব তছনছ করে দিয়ে গেছে। ঝড় থেমেছে ঠিকই, কিন্তু এই ক’দিনে যা হারিয়েছি তা তো আর ফিরে পাবার নয়, ফিরেও পাইনি। নেই বাবা-মাসহ বাড়ির আরও অনেকে। নেই বাড়িঘর, বেঁচে থাকাটা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ এই আত্মীয় বাড়িতে, দু-চারদিন অন্য কোনো আত্মীয় বাড়িতে, এভাবে আর কত দিন। কয়েক মাস এভাবেই কেটেছে। এই খবর মামার বাড়িতে যায়। তখন মামা এসে আমাকে নিয়ে যায়। তার পর থেকে মামার বাড়িতেই থাকতে থাকি। এখানে থেকেই বিয়ে হয়, এখানেই আমার সব।

এই নয় মাসের কত স্মৃতি, কত ঘটনা আছে, মনে পড়ে, বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু এমন ছোট করে বলে কিছুই শেষ করা যাবে না। কোন ঘটনা রেখে, কোনটা বলবো।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :