ধামরাইয়ে ফসলি জমির মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়, কমছে আবাদ

আহমাদ সোহান সিরাজী, সাভার (ঢাকা)
 | প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারি ২০২২, ২০:০৯

ঢাকার ধামরাইয়ে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে খননযন্ত্র (এক্সকেভেটর) দিয়ে ফসলি জমির মাটি কেটে ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জমির উপরের অংশ অর্থাৎ টপ সয়েল ইটভাটায় যাওয়ায় জমির উর্বরতা হারাচ্ছে। এতে করে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা করছে কৃষি বিভাগ। দ্রুত ইটভাটার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না নিলে আগামীতে খাদ্য ঘাটতিসহ ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৩ বলছে, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও ফসলি জমির এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। এ ছাড়া কোনো সড়ক ও মহাসড়ক থেকে অর্ধকিলোমিটার দূরত্বে ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। কিন্তু ধামরাইয়ের প্রায় সব ইটভাটা আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেছে। প্রশাসন এই ভাটাগুলোকে কিভাবে ছাড়পত্র দেয়- এই প্রশ্ন তুলছে ধামরাইবাসী।

সরজমিনে দেখা যায়, উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের শতাধিক জায়গার মাটি কেটে ইট ভাটায় নেয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চলছে এই মাটির ব্যবসা। পাশের জমির মাটি কেটে ফেলায় ভেঙে যাচ্ছে অন্য জমি। এতে বাধ্য হয়ে অন্যরা মাটি বিক্রি করছেন। প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও এর সুরাহা মিলছে না। ফসলি জমি পুকুরে রূপান্ত‌রিত হচ্ছে। কৃষকের আহাজারিতে ভারি হচ্ছে ধামরাইয়ের বাতাস।

ধামরাই উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১৬টি ইউনিয়নে প্রায় দুই শতাধিক ইটভাটা রয়েছে। যার অধিকাংশেরই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। ইট তৈরির প্রধান কাঁচামাল মাটি। ফসলি জমির মাটি ইট তৈরিতে সুবিধা। এছাড়া হাতের নাগালে হওয়ায় কৃষকদের বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে অথবা ভয়ভীতি দেখিয়ে এ মাটি কিনে নেয় একটি পক্ষ। এরপর তারা বেশি দামে ইটভাটায় সরবরাহ করেন।

সামাজিক সংগঠন ‘সচেতন নাগরিক সমাজ ধামরাই’-এর সভাপতি ইমরান হোসেন বলেন, মাটি বিক্রি করায় ফসলি জমির উপরিভাগের মাটিতে যে জিপসাম বা দস্তা থাকে তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া মাটিতে অনুজীবের কার্যাবলী আছে, তা সীমিত হয়ে যাচ্ছে। এতে করে দিন দিন ফসলি জমিতে উৎপাদন ক্ষমতা কমছে। মাটির জৈব শক্তি কমে গিয়ে দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতির মুখে পড়বে। আর এভাবে ফসলি জমির মাটি ইটভাটায় যেতে থাকলে আস্তে আস্তে ফসল উৎপাদন ব্যহত হবে।

একদিকে ফসলি জমি নষ্ট হচ্ছে অন্যদিকে এক উপজেলায় ২০০ ইটভাটা থাকায় পরিবেশ রয়েছে হুমকির মুখে। হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুস ক্যান্সার, কিডনি রোগসহ অন্যান্য রোগের প্রকোপ বাড়ছে এই উপজেলায়।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র জাহিদ হাসান বলেন, একদিকে মাটি কেটে ফসলি জমি পুকুরে রূপান্ত‌রিত হচ্ছে অন্যদিকে ইট ভাটার মাটির ট্রাক চলাচলে রাস্তাগুলো ভেঙে যাচ্ছে। আর রাস্তার পাশের মানুষ ধুলাবালির কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ভাঙা রাস্তা দিয়ে বয়স্ক মানুষের চলাচল কষ্টকর। এছাড়া গর্ভবতী নারীসহ অন্যান্য অসুস্থ মানুষকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এই ভাঙা রাস্তা। ইটভাটার আধিক্যের কারণে ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গাছের ফলগুলো এখন আর আগের মতো ফলে না। কিংবা আকৃতিও অদ্ভুতভাবে ছোট হয়ে যাচ্ছে।

ধামরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরিফুল হাসান বলেন, ‘ফসলি জমির উপরিস্তরের ছয় ইঞ্চি গভীরতায় মাটি কেটে নিলে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়। এরপর যে মাটি থাকে, তাতে ফলন ভালো হয় না। প্রতি বছর এই কারণে অনেক আবাদযোগ্য জমি কমে যাচ্ছে।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও প্রতিনিয়ত ইট ভাটার ক্ষতিকারক দিক এবং ধামরাইয়ের ফসলি জমি বাঁচাতে অনলাইনে আন্দোলন গড়ে তুলছে এলাকাবাসী। ফেসবুকে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে উল্লেখ করে পোস্ট দিয়েও এই সমস্যা প্রশাসনের নজরে আনা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন সংবাদকর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী।

এলাকাবাসীর দাবি, প্রশাসন সঠিকভাবে নজরদারি করলে এবং অবৈধ ইটভাটা পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। এভাবে নিয়মাবলী না মেনে মাটি কাটার অর্থাৎ জমির শ্রেণি পরিবর্তনের কোনো সু্যোগ নেই। জমির শ্রেণি পরিবর্তন করতে হলে বিভাগীয় কমিশনারের লিখিত অনুমতি প্রয়োজন হয়। মূলত প্রশাসন ম্যানেজ করেই চলছে এই কারবার।

এ ব্যাপারে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকি বলেন, এসব ইটভাটার কোনো অনুমোদন নেই। তবুও আমাদের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে চালানো হচ্ছে ইটভাটা। এরা কৃষি জমি কেটে মাটি সংগ্রহ করে ভাটায় ব্যবহার করছে। এতে করে আমাদের ধান-চালের আবাদ কমে যাচ্ছে। সর্বনাশ হচ্ছে সাধারণ কৃষকের। বিভিন্ন সময় আমরা এসব ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করলেও তা যথেষ্ট নয়।

(ঢাকাটাইমস/২৩জানুয়ারি/কেএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :