নায়ক ফারুককে কি মনে আছে? এখন কেমন আছেন তিনি?

আরিফুজ্জামান, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২০ মে ২০২২, ০৯:৪০ | প্রকাশিত : ২০ মে ২০২২, ০৭:৫২

দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে তিনি ‘মিয়া ভাই’ নামে পরিচিত। তিনি চিত্রনায়ক আকবর হোসেন পাঠান ফারুক। ছিলেন প্রভাবশালী অভিনেতা। তার আরও বড় পরিচয় তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছেন ‘সারেং বউ’-এর নায়ক। বর্তমানে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই সংসদ সদস্য।

অভিনেতার বর্তমান শারীরিক অবস্থা এখন কেমন, দেশে ফিরবেনই বা কবে, সেসব বিষয়ে ফারুকের স্ত্রী ফারহানা পাঠানের সঙ্গে আলাপ হয় ঢাকাটাইমসের। ফারহানা বলেন, ‘আপনাদের মিয়া ভাই আগের চেয়ে অনেক ভালো আছেন। তাকে দুই মাসের বেশি সময় ধরে সাধারণ কেবিনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শারীরিক জটিলতাও অনেক কমেছে। এখন চিকিৎসায় পুরোপুরি সাড়া দিচ্ছেন। ভালোভাবে কথা বলছেন, হাটছেন, সব ধরনের খাবারও খাচ্ছেন।’

গত বছরের ৮ মার্চ থেকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন নায়ক ও সাংসদ ফারুক। পেরিয়ে গেছে এক বছর দেড় মাস। এই পুরোটা সময়জুড়ে অভিনেতার সর্বক্ষণের সঙ্গী তার স্ত্রী ফারহানা পাঠান। এই দীর্ঘ সময়ে ফারুকের চিকিৎসা বাবদ অনেক টাকা ব্যয় হয়েছে।

ফারুকের ছেলে রওশন হোসেন পাঠান শরত দেশেই থাকেন। শরৎ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আব্বুর চিকিৎসার জন্য আমাদের বারিধারার দুটি ফ্ল্যাট গত জানুয়ারিতে বিক্রি করতে হয়েছে। যেখানে আমরা থাকিনি। এছাড়া আব্বুর ব্যাংক অ্যাকাউন্টও শূন্য হয়ে গেছে। আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার-দেনা পর্যন্ত করতে হয়েছে।’

এরপরও তার বাবার চিকিৎসায় হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান শরৎ। তিনি বলেন, ‘আব্বু বেশি দিন থাকলে আরও ধার-দেনা করা লাগতে পারে। তার সুস্থতার জন্য আমরা শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করব।’ আর কতদিন হাসপাতালে থাকতে হবে ফারুককে? ছেলে শরৎ বলেন, ‘সেটা আব্বুর সুস্থতার ওপর নির্ভর করছে। তবে এখন যেভাবে তার শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে যাচ্ছে, তাতে এ বছরই আব্বুকে দেশে ফেরানো সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে।’

শরৎ জানান, তার বাবার চিকিৎসার জন্য সরকারের সহযোগিতা মিললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তবুও যেটুকু সহযোগিতা পেয়েছেন তার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞতা জানান নায়কপুত্র শরৎ।

গত বছরের মার্চে নিয়মিত চেকআপের জন্য মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে গিয়েছিলেন ফারুক। সে সময় চেকআপের পর তার রক্তে ইনফেকশন ধরা পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। পরে জানা যায় তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ মার্চ তার খিঁচুনি উঠলে তাকে নেওয়া হয় আইসিইউতে। ২১ মার্চ হঠাৎ জ্ঞান হারালে তাকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়।

ওই সময় এক মাস ছয় দিন একেবারে অচেতন ছিলেন ফারুক। চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছিলেন না। ফলে এপ্রিলের শুরুতে ছড়িয়ে পড়ে তার মৃত্যুর গুজব। সে সময় এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিনেতার ছেলে শরৎ বলেছিলেন, ‘বাবার মৃত্যুর খবর জানতে চেয়ে সাংবাদিক ও আত্মীয়রা বারবার ফোন করছেন। আমরা খুবই বিরক্ত। সবার কাছে অনুরোধ, না জেনে গুজব ছড়াবেন না।’

ঠিক এক বছরের মাথায় গত ১০ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় গুজব ওঠে, ফারুক মারা গেছেন। রীতিমতো একটি পোস্টার শেয়ার করা হয় ফেসবুকে। সেখানে লেখা হয়, ‘শোক সংবাদ, চিত্রনায়ক ও ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক পাঠান আর নেই। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।’

দ্বিতীয় দফার এ গুজবের অবসান ঘটান চিত্রনায়ক জায়েদ খান। তিনি অভিনেতা ফারুকের সঙ্গে তোলা একটি ছবি নিজের ফেসবুকে পোস্ট করে লেখেন, ‘আমাদের সবার প্রিয় মিয়া ভাই সুস্থ আছেন, ভালো আছেন। কেউ দয়া করে গুজব ছড়াবেন না। সবাই তার জন্য দোয়া করবেন।’

এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে অভিনেতা ফারুকের স্ত্রী ফারহানা পাঠানও মুখ খোলেন। তিনি দেশের সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘ফারুককে এখন হাসপাতালের সারারণ কেবিনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার অবস্থা অনেক ভালো। তাকে নিয়ে কোনো ধরনের গুজব না ছড়াতে সবার প্রতি অনুরোধ করা হলো।’

এর আগে ২০২০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়েছিলেন ফারুক। বিশ্বজুড়ে তখন চলছিল করোনাভাইরাসের তাণ্ডব। লকডাউনের কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সব দেশের ফ্লাইট ছিল বন্ধ। ফলে কার্গো বিমানের এক বিশেষ ফ্লাইটে সে সময় সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছিল ফারুককে।

ওই বছরের মাঝামাঝি করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন সাংসদ-অভিনেতা। এক মাসেরও বেশি ধরে তিনি প্রথমে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসাপাতালে এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা করান। এরপর তার করোনা নেগেটিভ হয়। তবে শারীরিক জটিলতা যাচ্ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই যেতে হয়েছিল সিঙ্গাপুরে। সে সময় সুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন ‘মিয়া ভাই’।

তারও আগে ২০১২ সালের জুলাইয়ে এক মাস ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ফারুক। সে সময় তিনি কিডনির রোগে ভুগছিলেন। ব্যাংককে কয়েক মাস চিকিৎসা করিয়ে ২০১৩ সালের ৩০ আগস্ট ভর্তি হন সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে। সেখানে কয়েক মাস চিকিৎসা শেষে ২০১৪ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরে আসেন।

তবে এবার বছর পার হয়ে গেলেও দেশে ফেরার খবর নেই ফারুকের। অপেক্ষা বাড়ছে তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী ও অনুরাগীদের। তবে এখন অভিনেতার শারীরিক অবস্থার উন্নতি যেভাবে হচ্ছে, তাতে আশায় বুক বেঁধে আছেন সবাই। সবারই প্রত্যাশা, শিগগিরই সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসবেন ‘মিয়া ভাই’।

ফারুকের প্রকৃত নাম আকবর হোসেন পাঠান দুলু। ১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওরে তার জন্ম। চলচ্চিত্রে এসেছিলেন ১৯৭১ সালে এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ সিনেমার মাধ্যমে। অভিনয় করেছেন শতাধিক চলচ্চিত্রে। উল্লেখযোগ্য সিনেমা ‘লাঠিয়াল’, ‘সুজন সখী’, ‘নয়নমনি’, ‘সারেং বৌ’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সাহেব’, ‘আলোর মিছিল’, ‘মিয়া ভাই’।

এর মধ্যে ‘লাঠিয়াল’ সিনেমাটিতে অভিনয়ের জন্য ১৯৭৫ সালে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন ফারুক। ২০১৬ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে তাকে দেওয়া হয় আজীবন সম্মাননা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি সবচেয়ে সফল ও সেরা নায়কদের একজন হিসেবে স্বীকৃত।

ছাত্রজীবন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ফারুক। ১৯৬৬ সালে যোগ দেন ছয় দফা আন্দোলনে। সে সময় তার নামে ৩৭টি মামলা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসন থেকে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ফারুক।

(ঢাকাটাইমস/২০মে/এএইচ/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :