রোগী বাণিজ্যই টার্গেট

এক এলাকাতেই অর্ধশতাধিক হাসপাতাল, অভিযোগও শত শত

অভিজিত রায় কৌশিক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৯ মে ২০২২, ১৫:০০ | প্রকাশিত : ২৭ মে ২০২২, ১৬:৪৫

রাজধানীর অলিগলিতে যেনতেনভাবে যেসব হাসপাতাল গড়ে উঠেছে সেসবের বেশিরভাগেরই চিকিৎসার মান নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন। গোটা রাজধানীর কথা বাদ দিলেও কেবল মোহাম্মদপুরের শ্যামলী কলেজগেট এলাকাতেই গজিয়ে উঠেছে বৈধ-অবৈধ অর্ধশতাধিক হাসপাতাল।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বড় হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে ওঠা এসব হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা বা অপচিকিৎসা দেওয়া হয়। দালালদের মাধ্যমে রোগী বা রোগীর স্বজনদের ভালো চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে এসব হাসপাতালে রোগী ভর্তি করা হয়।

নিবন্ধন না থাকায় অনেক হাসপাতাল-ক্লিনিক বন্ধের নির্দেশও জারি হয় উচ্চ আদালত থেকে। তবে পরবর্তীতে নিবন্ধন নিয়ে আবারও চালু করে প্রতারিত করা হচ্ছে সাধারণ রোগীদের। কথিত হাসপাতালগুলোর রমরমা বাণিজ্যের ফাঁদে পড়ে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে জনস্বাস্থ্যের।

এদিকে প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীর শ্যামলী কলেজগেট এলাকায় কেন এত হাসপাতাল? রাজধানীর শেরে বাংলা নগর এলাকায় রয়েছে সরকারি বেশ কয়েকটি বড় হাসপাতাল। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং পঙ্গু হাসপাতালকে ঘিরেই গড়ে তোলা হয়েছে বৈধ-অবৈধ হাসপাতালগুলো।

মূলত দূর-দূরান্ত থেকে সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে আসা গরিব রোগীদের দালালের মাধ্যমে ভাগিয়ে নিয়ে ফাঁদে ফেলে ব্যবসা হিসেবে ব্যবহার করছে এসব হাসপাতাল। এর আগে ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের হাইকোর্ট বেঞ্চ রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় লাইসেন্সবিহীন ১৪টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক বন্ধ করতে নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষ লাইসেন্স দেখাতে ব্যর্থ হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে দ্রুত এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়।

কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এদের অধিকাংশই নতুন করে আবারও নিবন্ধন নিয়ে সচল রেখেছে এসব ব্যবসা।

বন্ধের নির্দেশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল: ক্রিসেন্ট হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্স, বিডিএম হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্স, সেবিকা জেনারেল হাসপাতাল, জনসেবা নার্সিং হোম, লাইফ কেয়ার নার্সিং হোম, রয়্যাল মাল্টি স্পেশালিটি হসপিটাল, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা মেন্টাল হসপিটাল, মনমিতা মেন্টাল হসপিটাল, প্লাজমা মেডিকেল সার্ভিস অ্যান্ড ক্লিনিক, শেফা হসপিটাল, ইসলামিয়া মেন্টাল হসপিটাল, মক্কা-মদিনা জেনারেল হাসপাতাল, নিউ ওয়েল কেয়ার হসপিটাল ও বাংলাদেশ ট্রমা স্পেশালাইজড হসপিটাল।

আদেশের পর অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আইন অনুসারে লাইসেন্স ছাড়া হাসপাতাল পরিচালনা অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কারণ হাসপাতালের সঙ্গে মানুষের জীবন-মৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে ওই সব বেআইনি হাসপাতাল ও ক্লিনিক বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে জনস্বার্থে গত ৯ সেপ্টেম্বর রিট আবেদন করা হয়।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোড, বাবর রোড ও খিলজি রোডের আশপাশে অসংখ্য বৈধ ও অবৈধ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। রাস্তা ধরে হাঁটতেই চেনা-অচেনা নানান নামের হাসপাতালের বিলবোর্ড। ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় প্রায় প্রতিটা হাসপাতাল ও ক্লিনিকই সচল রয়েছে। মোটামুটি রোগীর উপস্থিতি আছে বললেও ভুল হবে না। আর এই রোগীদের উপস্থিতি দেখলেই স্বভাবতই প্রশ্ন জাগতে পারে রাজধানীর বাইরে দূর-দূরান্ত থেকে আসা এ সকল রোগী এই সব হাসপাতালের খোঁজ পান কেমন করে।

নাটোর থেকে ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে এসেছিলেন কবিরুল ইসলাম। কিন্তু দালালের ফাঁদে পড়ে ভাইকে ভর্তি করতে হয়েছে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। তিনি বলেন, ভাইকে নিয়ে সরকারি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে আসার পরে একজন আমাদের বলে এখানে চিকিৎসা ভালো হবে না। সরকারি হাসপাতাল এখানে ডাক্তার গুরুত্ব দিয়ে দেখে না। এর থেকে ভালো চিকিৎসা হবে বলে তিনি আমাদের এই ক্লিনিকে নিয়ে আসেন। কিন্তু তার পর থেকে এখানে চিকিৎসা করাচ্ছি। কিন্তু ভাইয়ের কোনো উন্নতি নাই। এমনই অভিযোগ রয়েছে আরও অনেকের।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, এ দালালরা সরকারি এসব হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে ক্লিনিকে নিতে পারলে মোটা অঙ্কের বকশিশ পেয়ে থাকেন। আর এসব বকশিশ পেয়ে থাকেন বেসরকারি এসব ক্লিনিক থেকে। যেটা পরবর্তীতে চিকিৎসার ব্যয়ের মাধ্যমে রোগীদের কাঁধে গিয়ে চাপে।

এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে ডাক্তার না হয়েও অনেকে ডাক্তর সেজে এবং নার্স বা ওয়ার্ডবয়েরা রোগী দেখেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও প্রায় প্রতিনিয়তই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ভুয়া ডাক্তার ও হাসপাতালকে ঘিরে দালাল চক্র আটকের খবর শোনা যায়। কিন্তু কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না এসব।

এদিকে এর আগে গত ২ জানুয়ারি সাভার থেকে অসুস্থ দুই যমজ শিশুকে নিয়ে শ্যামলীর একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন এক নারী। পরে দালালরা তাকে সেখান থেকে ভাগিয়ে বেসরকারি ‘আমার বাংলাদেশ’ হাসপাতালে ভর্তি করান। দুইদিনে তার বিল করা হয় লাখ টাকা। ৪০ হাজার টাকা পরিশোধ করার পর আর বিল দিতে পারবেন না জানালে তাকে ঘটনার দিন রাতে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে হাসপাতালের বাইরে এক শিশুর মৃত্যু হয়। ঘটনার পর ওই নারী ঢাকা মেডিকেলে যান। সেখানে তিনি মৃত শিশুকে এক কোলে এবং অসুস্থ এক শিশুকে আরেক কোলে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছিলেন। ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও র‌্যাবের গোয়েন্দাদের নজরে আসে। এরপর শ্যামলীর ওই হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে মালিককে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব ।

র‌্যাব জানায়, সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে আমার বাংলাদেশ হাসপাতালে ভর্তি করার পর বিলের ফাঁদে জিম্মি করা হতো। আদায় করা হতো মোটা অঙ্কের টাকা। বনিবনা না হলে বের করে দেওয়া হতো। আর অভিযোগ উঠলে বন্ধ করে ‘অন্য নামে’ হাসপাতাল খুলতেন ‘আমার বাংলাদেশ’ মালিকপক্ষ।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানিয়েছিলেন, গোলাম সরোয়ার ১৯৯২ সালে প্রাণিবিদ্যায় স্নাতকোত্তর করেন। ২০০০ সালের দিকে তিনি ঢাকায় ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলে ব্যবসা শুরু করেন। এরপর ২১ বছরে তিনি ভিন্ন ভিন্ন নামে ছয়টি (রাজারবাগ, বাসাবো, মুগদা, মোহাম্মদপুর ও শ্যামলী এলাকায়) হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলে ব্যবসা করেছেন। একটি হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তিনি সেটি বন্ধ করে নতুন নামে হাসপাতাল খোলেন। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালদের মাধ্যমে রোগী এনে তিনি মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেন। সর্বশেষ ‘আমার বাংলাদেশ’ হাসপাতালটি চালু করেন গত বছরের জানুয়ারিতে।

(ঢাকাটাইমস/২৭মে/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজধানী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :