সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা

ঘরে ফিরতে চায় ক্ষতিগ্রস্তরা

মোয়াজ্জেম হোসেন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২২, ১১:২৫ | প্রকাশিত : ০৫ জুলাই ২০২২, ০৯:০০

টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ডুবেছে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা। অনেক মানুষ এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে। বর্তমানে শুধু সুনামগঞ্জেই ২৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২৮ হাজারের মতো মানুষ অবস্থান করছে। তারা এখন ঘরে ফিরতে চায়। কিন্তু বন্যার পানিতে বাড়িঘরের সবকিছু ভেসে গেছে তাদের। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হলে বাড়ি গিয়ে তাদের ভোগান্তিই শুধু বাড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।

সরকারি হিসেবে এ জেলায় ৪৫ হাজারের মতো ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেসরকারি সমীক্ষা বলছে, সংখ্যাটা ৬০ হাজারের বেশি। এছাড়া বন্যার কারণে সারা দেশে মারা গেছেন ১০২ জন। এর মধ্যে সিলেটেই মারা গেছেন ৫৬ জন, রংপুর বিভাগে ১০ জন এবং ৩৫ জন ময়মনসিংহ বিভাগে।

বন্যার কারণে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ১১ হাজার ৬৬২ জন। এর মধ্যে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ৭ হাজার ৪৮৬ জন। সুনামগঞ্জে গতকাল থেকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ হাজার পরিবারের মাঝে দশ হাজার টাকা করে বিতরণ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোকে ঘরে ফেরানো। বন্যায় ভেসে গেছে তাদের ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, পুকুরের মাছ, গোলায় রাখা ধান, আঙিনার সবজি। কিছু মানুষের ঘরবাড়ি থেকে পানি নামলেও সহায়-সম্বল হারিয়ে তারা এখন নিঃস্ব। নতুন একটা ঘর বাঁধার সামর্থ নেই অনেকেরই। আগে যেখানে সাজানো সংসার ছিল, সেখানে এখন সবকিছু শূন্য।

ঢাকাটাইমসের সিলেট অঞ্চলের প্রতিনিধিরা জানান, ‘বানভাসি মানুষগুলো ঘরে ফিরতে চায়। সহযোগিতা চায় সরকারের।’

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘অনেক এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। কিন্তু এখনো অনেক এলাকা পানির নিচে ডুবে আছে। তবে নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে। আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি পানি নেমে যাবে।’

সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি মেরামত করার জন্য আপাতত পাঁচ হাজার পরিবারকে দশ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে বলে জানান জেলা প্রশাসক। বলেন, ‘আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা পৌঁছি দিচ্ছি। পর্যায়ক্রমে আরও পরিবারের মাঝে তালিকা করে এ সহযোগিতা দেওয়া হবে।’

বন্যায় সিলেট ছাড়াও নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর, উত্তরবঙ্গের কুঁড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর এলাকাও প্লাবিত হয়েছে। তবে উত্তরবঙ্গের বন্যার কারণ আর সিলেট এলাকার বন্যার কারণ আলাদা। গত মাসের মাঝামাঝিতে ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে ব্যাপক বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যার প্রভাব পড়ে দেশের সিলেট অঞ্চলজুড়ে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নদীর গতিপথ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি উপচে জনপদে উঠেছে। কেউ কেউ আবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতিকেও দুষছেন। বন্যার শুরু থেকেই সরকারি, ব্যাক্তিগতভাবে এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে।

সুনামগঞ্জ

গত ১৬ জুন থেকে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়া সুনামগঞ্জের ৯৫ ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। প্রায় অর্ধলক্ষ বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগের সব ক্ষয়ক্ষতির রেকর্ড অতিক্রম করেছে। বন্যার পানি কিছুটা কমলেও বাড়িঘর সবচেয়ে বেশি বিধ্বস্ত হওয়ায় এখনো বিপুল সংখ্যক মানুষ নিজের ভিটায় ফিরতে পারছেন না।

কষ্টের গড়া নিজ ঘরে অবস্থান করতে না পারা শ্রমজীবী, দরিদ্র মানুষেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। এছাড়াও সড়ক, মাছ ও গৃহপালিত পশু-পাখির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে এখনো অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছে বানভাসি মানুষ।

সরকারি হিসাবে জেলার ১২টি উপজেলার চার হাজার ৭৪৭টি বসতঘর সম্পূর্ণ ও ৪০ হাজার ৫৪১টি বসতঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানি সম্পূর্ণ কমে গেলে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হবে বলে জানান সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো জেলার বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি ও ত্রাণ তৎপরতা সম্পর্কিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করেন তিনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্যায় জেলায় ২৫ হাজার ২০৪টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এক হাজার ৬৪২টি গবাদিপশু মারা গেছে। জেলায় এ পর্যন্ত ৩৮৪ কিলোমিটার সড়ক, ১৫৫টি সেতু কালভার্টের সংযোগ সড়ক এবং চারটি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুনামগঞ্জের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জানান, সুনামগঞ্জে এখনো ২৫০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা আছে। পাশাপাশি ১২৩টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।

হাওরবেষ্টিত তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী আহমদ মোরাদ বলেন, ‘আমার ইউনিয়নটি হাওর বেষ্টিত থাকায় এবার আমার ইউনিয়নের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। হাওর পাড়ের কৃষক পরিবারের অবস্থা এখন খুবই করুণ।’

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, ‘এবার বন্যায় জেলায় সড়ক, পশু-পাখি, বসতবাড়ি, ফসলের ও মাছ চাষিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আর ক্ষতির পরিমাণ হাওর এলাকায় বেশি। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য আমি আমার সাধ্যমত সর্বোচ্চ মহলে কথা বলব ও সহায়তার চেষ্টা চালিয়ে যাব।’

সিলেট

বন্যায় সিলেট মহানগরীর অধিকাংশ এলাকা, ১৩টি উপজেলা বন্যা কবলিত হয়। জানা গেছে, সিলেট জেলায় মোট ১ হাজার ৪৭৭টি প্রাইমারি স্কুলের মধ্যে বন্যায় কবলিত হয়েছে ৫৬৫টি। এর মধ্যে ২৬৭ স্কুলের ক্লাসরুমে পানি ঢুকেছে আর আঙিনায় পানি উঠেছে ২৯৮টির। আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ১৪৩টি ও পাঠদান বন্ধ রয়েছে ৪৮০টি স্কুলে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক মোহাম্মদ কাজী মুজিবুর রহমান বলেন, চলমান বন্যায় সিলেট জেলায় বোরো জমি, আউশ বীজতলা ও সবজি ক্ষেত ডুবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সিলেটের তাদের অধিনস্ত ৭২ কিলোমিটার রাস্তা পানিতে তলিয়ে গেছে। এর বাইরে আরও ৪৫ থেকে ৫০ কিলোমিটার সড়ক আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মৌলভীবাজার

সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারে বন্যায় ৩৫টি ইউনিয়নের ১৬ হাজার ৩৩৯টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের তালিকা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন। পাশাপাশি মৌলভীবাজারে চার হাজার ৬৮০ হেক্টর ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসার মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, জেলায় পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ৬৬ হাজার ৭৪৫টি। আর ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা তিন লাখ ১৩ হাজার ৫৫২ জন।

হবিগঞ্জ

হবিগঞ্জেও বন্যায় কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাউবো সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় হবিগঞ্জ সদর উপজেলার গোপালপুরে ২০ মিটার, বানিয়াচঙ্গের সুজাতপুর এলাকায় ৬০ মিটার খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙেছে। অন্যদিকে আজমিরিগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর বাঁধের নিকলীরঢালায় ২০ মিটার, বদলপুর বাজারের নিকটে ১০ মিটার দীর্ঘ এবং নবীগঞ্জের চরগাঁওয়ে বিবিয়ানা নদীর বাঁধের ৮০ মিটার অংশ ভেঙে গেছে।

হবিগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল জানান, হবিগঞ্জ, বানিয়াচঙ্গ, আজমিরিগঞ্জ, নবীগঞ্জ উপজেলায় এ পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ১৮৭ কিলোমিটার রাস্তা, ৬৮ মিটার ব্রিজ ও কালভার্ট বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মো. আশেক পারভেজ জানান, বন্যায় ১৫ হাজার ৬২৮ হেক্টর আউশ, ১৪ হাজার ৬৩০ হেক্টর বোনা আমন ধান, ১ হাজার ৭৪৩ হেক্টর শাকসবজি ও ৪৫ হেক্টর অন্যান্য ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৮৮ হাজার ৫৪ মেট্রিক টন ধান ও সবজি এবং ২২৫ মেট্রিক টন অন্যান্য ফসল বিনষ্ট হয়েছে। জেলায় ১ লাখ ৩ হাজার ১৩০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

জেলায় ১৭৮টি গবাদিপশুর খামারের ১ হাজার ৩০৮টি পশু, ৭৩টি খামারের ৫৪ হাজার ৪৬৭টি হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলা মৎস্য সম্পদ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, ৭ হাজার ৯০১টি পুকুর-দীঘি ও খামার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ৩৭০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্যায় প্লাবিত হয়। ৯৪ স্কুল-কলেজ মাদ্রাসা বন্যাকবলিত হয়। এর মধ্যে ৭১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা আশ্রয় নিয়েছেন।

নেত্রকোণা

এদিকে বন্যায় নেত্রকোনার ১০টি উপজেলার রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহজান সিরাজ জানান, এ জেলায় ৪৮৬ হেক্টর জমির আউস ধান, ৫৮৮ হেক্টর জমির সবজি ও ১৩৬ হেক্টর জমির পাট ক্ষতি হয়েছে। এখানকার ক্ষতিগ্রস্ত মাছ চাষির সংখ্যা ১৫ হাজার ৮২৬ জন।

শেরপুর, জামালপুর উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর এলাকায় বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এখানকার এলাকার মানুষজনও বিপাকে পড়েছে।

(ঢাকাটাইমস/০৫জুলাই/এমএইচ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :