কারাগারের রোজনামচা: অবহেলা আর ভুলে ভুলে সয়লাব

ড. মোহাম্মদ আমীন
 | প্রকাশিত : ০৬ জুলাই ২০২২, ১৩:৪৩

বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থের লেখক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গ্রন্থটি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম অভিধান প্রণয়ন, বিভিন্ন গবেষণা ও প্রকাশনা’ শিরোনামের প্রকল্পের আওতায় বাংলা একাডেমি থেকে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশ করা হয়। প্রকল্পটির পরিচালক ছিলেন বাংলা একাডেমির পরিচালক জনাব মোবারক হোসেন। তখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন জনাব শামসুজ্জামান খান।

গ্রন্থটির ২৯৮ পৃষ্ঠায় দুটি ছবির ক্যাপশনে বঙ্গমাতার নাম লেখা হয়েছে বেগম ফজিলাতুন্নেছা’, অথচ ভূমিকায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘ফজিলাতুননেছা’। খ্যাতিমান ঐতিহাসিক ব্যক্তির পরিচিতিমূলক টীকায় জাতীয় নেতা ‘এ এইচ এম কামারুজ্জামান’-এর নাম লেখা হয়েছে ‘এ এইচ এম কামরুজ্জামান’।

‘বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামের অধ্যায়ে লেখা হয়েছে, ‘‘১১৯৬৯ সালে এদেশের জনগণ গভীর ভালোবাসায় শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে।’’ সালটি ১১৯৬৯ নয়, ‘১৯৬৯’। একটি পঙ্ক্তিতে লেখা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু ১৯৩৪ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁর হৃদপিণ্ড এবং চোখ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে’।

আরেক পঙ্ক্তিতে লেখা হয়েছে, তাদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী নির্ধারণ তাঁর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখানে, হৃদপিণ্ড, নির্বাচকমণ্ডলী এবং উদ্বেগের ভুল বানান। শুদ্ধ বানান যথাক্রমে, হৃদপিণ্ড, নির্বাচকমণ্ডলী ও উদ্বেগের।

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানের পরিশিষ্ট গ-য়ে বাংলা তারিখ ও সময় লেখার নিয়ম বিষয়ে বলা হয়েছে, অ্যাক বৈশাখ, অ্যাগারো জ্যৈষ্ঠ, শোলো ডিসেম্বর, পোঁচিশে বৈশাখ প্রভৃতি উচ্চারণ অশুদ্ধ। শুদ্ধ ও মান্য রীতি: পয়লা বৈশাখ, অ্যাগারোই জ্যৈষ্ঠ, শোলোই ডিসেম্বর, পোঁচিশে বৈশাখ প্রভৃতি। গ্রন্থটি তারিখ লেখার ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা কোথাও অনুসরণ করেছে, কোথাও করেনি। ২৮১ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে ১৫ আগস্ট এবং ২৩ জুন; একই পৃষ্ঠায় আবার লেখা হয়েছে ২৬শে সেপ্টেম্বর। পুরো বইয়ে এ ধরনের অসংগতি রয়েছে ভূরি ভূরি। ২৮৮ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, প্রত্যুপন্নমতিতা’, শুদ্ধ বানান: প্রত্যুৎপন্নমতিতা’।

কোথাও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ক্রিয়াপদ সম্পন্ন হয়েছে সম্মানজনক সম্বোধনে, আবার কোথাও স্বাভাবিক সম্বোধনে। একটি বাক্যে লেখা হয়েছে ‘‘যৌবনের প্রারম্ভিক বছরগুলোয় শেখ মুজিবুর রহমান মুসলিম সেবা সমিতি’র সচিব হিসেবে সমাজসেবায় অংশ নেয়।” ‘হিসাব’ আর ‘হিসেবে’ বানানেও দেখা যায় অসংগতি ও দূষণীয় প্রয়োগ। ৩১ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে: চিঠিপত্র লিখে দেয়, হিসাব রাখে; আবার পরক্ষণে লেখা হয়েছে: কয়েদিদের খালাসের সময় হিসেব করে (পৃ: ৩১)। মাল গুদামের হিসেব রাখে। অথচ ‘হিসাব’, ‘হিসেব’ শব্দের সাধু রূপ। একই গ্রন্থের একই অধ্যায়ের লেখায় সাধু-চলিত মিশ্রণ দূষণীয়। বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম পুস্তিকার ২.৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রে ‘ষ’ ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। কিন্তু গ্রন্থটির ৩৭ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে ‘ম্যাজিষ্ট্রেট’, আবার ৩৩ পৃষ্ঠায় ‘ম্যাজিস্ট্রেট’।

‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ পুস্তিকার ২.১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সকল অতৎসম অর্থাৎ তদ্ভব, দেশি, বিদেশি ও মিশ্র শব্দে কেবল ই, উ এবং এদের কার-চিহ্ন ব্যবহৃত হবে।” গ্রন্থটিতে তা অনুসরণ করা হয়নি। ৩৫ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে ফ্যাক্টরী, আবার ২৮ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে: ফ্যাক্টরি। সংগত বানান: ফ্যাক্টরি। ৩৭ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, আসামী, সংগত বানান: আসামি। ৪১ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে: আপীল, সংগত বানান: আপিল। এ ছাড়া এমন আরও অনেক অসংগতি রয়েছে।

একই বাক্যে একই উদ্দেশ্যে লেখা একই ক্রিয়াপদের বানান দুরকম লেখা হয়েছে। আমার বাগানে সে ঝাড়ু দিতো মাঝে মাঝে; গাছেও মাঝেমধ্যে পানি দিত।’ সংগত বানান: দিত। টীকাংশেও রয়েছে প্রচুর অসংগতি ও তথ্যবিভ্রাট। কোথাও লেখা হয়েছে ভাষা আন্দোলন’ আবার কোথাও লেখা হয়েছে ভাষাআন্দোলন’ না ভাষা-আন্দোলন’?। ২৯১ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে: পূর্ব-বাংলা’, কিন্তু ২৯২ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে: পূর্ব বাংলা’।

সংবাদটি শেয়ার করুন

ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :