চালের বাজারে কারসাজি

আড়াই মাসে ভোক্তার গচ্চা ১৮শ কোটি টাকা

এম এস নাঈম, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২২, ০৯:৫১ | প্রকাশিত : ০৩ অক্টোবর ২০২২, ০৮:১৪

নানান অজুহাতে কারসাজির মাধ্যমে গত আড়াই মাস ধরে বাড়ানো হচ্ছে চালের দাম। দাম বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীরা ধানের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ কম এবং জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির অজুহাত দেখালেও বাস্তবতা ভিন্ন। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির আগেও অসৎ ব্যবসায়ীদের একটি চক্র সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়িয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত আড়াই মাসেম তারা ভোক্তার পকেট থেকে অতিরিক্ত ১ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা এই মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক কোনো কারণ খুঁজে পাননি। অযৌক্তিক এ দামবৃদ্ধির ফলে গড় ৪ টাকা করে হলেও প্রতিদিন ভোক্তার পকেট থেকে অতিরিক্ত গেছে ২৭ কোটি ৫৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এ হিসেবে ৬৫ দিনে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও মিল মালিকরা তুলে নিয়েছেন ১ হাজার ৭৯৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। অতিরিক্ত এই টাকা হাতিয়ে নেয়ার পর এখন চালের দাম কিছুটা কমাতে শুরু করেছেন। কিন্তু এর মধ্যে ভোক্তার কাছ থেকে বাড়তি যা নেয়ার নিয়েছেন।

বাজারের তথ্য অনুযায়ী, আমদানির হুমকিতে সেপ্টেম্বরের প্রথম ১০ দিন বাদে গত আড়াই মাসের মধ্যে লাগাতর বেড়েছে চালের দাম। এ সময়ে বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল মিনিকেট চালের। যার দাম ৭০ টাকা থেকে ৭৫ টাকায় ঠেকেছে। এছাড়া মোটা চালের দাম কেজিতে ৩ টাকা বাড়ে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, একজন মানুষের প্রতিদিন গড়ে ৪১৬ গ্রাম চাল দরকার হয়। সে হিসাবে দেশে বর্তমানে ১৬ কোটি ৫৮ লাখ ৫১ হাজার মানুষের জন্য দৈনিক চালের চাহিদা ৬ কোটি ৮৯ লাখ ৯৪ হাজার ১৬ কেজি। দেশে মোট উৎপাদিত চালের পরিমাণ ৩ কোটি ৫৬ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। অপরদিকে চাহিদা রয়েছে ৩ কোটি ৬৮ লাখ মেট্রিক টন চালের। ঘাটতি থাকছে ১১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল। অসৎ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এই ঘাটতির সুযোগটা বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগায়। তারা কখনো বা চালের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বাজারে দাম বাড়িয়ে দেয়। সরকার ব্যবসায়ীদের এই কারসাজি বুঝতে পেরে চালের ঘাটতি পূরণে বিদেশ থেকে চাল আমদানির ঘোষণা দিয়েছে। আর সরকারের পক্ষ থেকে এমন সিদ্ধান্তের পর চালের দাম কিছুটা কমতে শুরু করে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সপ্তাহ ব্যবধানে সব ধরনের চালের দাম ৩ টাকা পর্যন্ত কমেছে। মিলারদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে চাল রয়েছে। আগে অর্ডার দিলে ১ থেকে ২ সপ্তাহ পর চাল পাওয়া গেলেও এখন অর্ডার দেওয়া মাত্রই পাওয়া যাচ্ছে। চালের দাম কমার বিষয়ে পাইকারি বিক্রেতারা জানান, আগামীতে চালের দামবৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। মাস দেড়েক পর বাজারে নতুন চাল এলে চালের দাম আরও কমে আসবে। বিক্রি কমার সঙ্গে সঙ্গে খোলা বাজারে চাল বিক্রির প্রভাবে চালের দাম কমতে শুরু করেছে বলে দাবি করেন খুচরা বিক্রেতারা। ভোক্তভোগী ক্রেতারা বলছেন, তদারকির অভাবেই করপোরেট হাউজ এবং মিলারদের লোভের মাশুল গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।

এদিকে চাল সিন্ডিকেটের বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ঢাকাটাইমসকে বলেন, 'জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা তথা চালের রিজার্ভের (মজুদ) বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আমরা কাজ করছি। চালের যে কোনো ধরনের সংকট কাটাতে সরকার বদ্ধপরিকর। বাজারে কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এরই মধ্যে সংকট সৃষ্টিকারী ও কারসাজিতে জড়িতদের চিহ্নিত করতে কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, অতিমাত্রায় মুনাফালোভীদের কারণেই অস্থিতিশীল হয়েছিল চালের বাজার। যার কারণে ভোক্তার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণের এই অর্থ হাতিয়ে নেয় অতি মুনাফালোভীরা। এমন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটতো না।

তবে এখনও পর্যন্ত কোনো ব্যবসায়ীকে সেভাবে শাস্তির আওতায় আনা যায়নি জানিয়ে ক্যাব সভাপতি বলেন, প্রতিযোগিতা কমিশন সম্প্রতি কয়েকজন অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীকে শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। প্রতিযোগিতা কমিশন যদি কার্যকর হয় তাহলে সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়ে ভোক্তার পকেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ নিতে পারতো না মুনাফালোভীরা।

উল্লেখ্য, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও চালকলের মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফা গ্রহণের কারণেই দুই মাস আগে অস্থির হয়ে ওঠেছিল চালের বাজার। তখন বাজার স্বাভাবিক রাখতে ১০ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। বাজার নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং জোরদারের পাশাপাশি দু'দফা চালের আমদানি শুল্ক কমানো এবং স্বল্পমূল্যের ওএমএসের প্রভাবে চালের বাজার স্থিতিশীল হয়।

এদিকে, সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, সরকারের ওপর মহলের নির্দেশে প্রতিযোগিতা কমিশন চাল সিন্ডিকেটসহ বাজার ব্যবস্থাপনায় অরাজকতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে প্রতিযোগিতা কমিশন। এরই মধ্যে ১৪২ জন ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে এই কমিশন। মিনিকেট চালের নামে যে জালিয়াতি হচ্ছে তা বন্ধেও কাজ করছে কমিশন। মিনিকেট চাল নামে যে চাল বাজারে বিক্রি হচ্ছে তার নমুনা দাখিল করতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।

(ঢাকাটাইমস/০৩অক্টোবর)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :