মানবিক ডা. আশরাফুল হক সিয়াম ও একটি ঝড়ের সন্ধ্যা

প্রকাশ | ৩০ মে ২০২৩, ২৩:১২ | আপডেট: ৩০ মে ২০২৩, ২৩:৫৩

মেহেদী হাসান, শরীয়তপুর

জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সার্জনস সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক  ডা. আশরাফুল হক সিয়াম তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন। পরে এটি ভাইরাল হয়ে যায়। পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। প্রচণ্ড বৃষ্টি ঝড়। হঠাৎ হাসপাতাল থেকে ফোন আজকে ৩ নম্বর অপারেশন করা একটা রোগীর রক্তক্ষরণ হচ্ছে এখনই আবার অপারেশন থিয়েটারে ঢুকতে হবে সাথে সাথে গাড়িটি ঘুরিয়ে হাসপাতালে যেতে বল্লাম।

ফোনে শুধু রোগীর খোঁজ নিচ্ছি ওপাশ থেকে বলছে প্রেশার কমে যাচ্ছে রক্তক্ষরন এর কারনে। বৃষ্টির কারনে প্রচণ্ড ট্রাফিক।

আমি রোগীর আশঙ্কাজনক অবস্থা অনুধাবন করতে পারছি আর আল্লাহকে মনে মনে ডাকছি যে একটু সময় যেন তিনি দেন। একই জায়গায় ৪৫ মিনিট কেটে গেল।

যেখানে প্রতিটা মিনিট তার জীবনের জন্য গুরত্বপূর্ণ।পাঠাও খোঁজলাম তাও পাচ্ছি না।

হঠাৎ গাড়িটির পাশেই একটা হুন্ডা পেছনের সিট খালি দেখতে পেলাম। লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে তাঁকে নিজের পরিচয় দিয়ে অবস্থা বলে সাহায্য চাইলাম সে শুধু বলল আমার এক্সট্রা হেলমেট নাই।

আমি বললাম ,আমার দরকার নেই, ভিজে গেলে অসুবিধা নেই। মুশুলধারে বৃষ্টি হচ্ছে আর আমি আল্লাহকে ডাকছি।

তিনি আমাকে আমার গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দিলেন। আমিও সময় মতো রোগীর সেবা দিয়ে তাকে বাঁচাতে পারলাম। যাওয়ার সময় তাকে কিছু টাকা দিতে চাইলাম তিনি নিতে অস্বীকার করলেন। আপনারা আছেন বলেই দেশটা এতো সুন্দর।

উল্লেখ্য, স্বদেশের কার্ডিওভাসকুলার ও থোরাসিক সার্জারির অঙ্গন প্রায় একক প্রচেষ্টায় গুছিয়ে এনেছেন তরুণ ডাক্তার আশরাফুল হক সিয়াম শরীয়তপুরের কৃতী সন্তান ডা. আশরাফুল হক সিয়াম। বাবা প্রকৌশলী মো. আবুল হাসেম মিয়া। মা বেগম আশরাফুন্নেসা, রত্নগর্ভা স্বীকৃতি পেয়েছিলেন ২০০৪ সালে। পরিবারে রয়েছে তিন ভাই ও এক বোন।

বড় ভাই এ কে এম এনামুল হক শামীম, বাংলাদেশ সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মেজ ভাই মেজর জেনারেল আমিনুল হক স্বপন আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহা পরিচালক । একমাত্র বোন শামীম আরা হক কাকলী ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে একটি বেসরকারী ব্যাংকে কর্মরত।

আশরাফুলের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন তার চোখে বসিয়েছিলেন তাঁর মা। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। মা বরাবরই প্রেরণা জোগাতেন ডাক্তার হওয়ার জন্য।মায়ের প্রেরণা আর স্বপ্নপূরণের চেষ্টায় পরিশ্রম করেছেন তিনি। ঢাকার খিলগাঁও সরকারি স্কুল থেকে এসএসসি, ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। এরপর এমবিবিএস পড়া অবস্থায় ২০০২-২০০৪ এর দিকে যখন দেখেন এদেশে মাত্র বাইপাস সার্জারি স্বল্প পরিসরে শুরু হয়েছে এবং দেশের বেশিরভাগ মানুষই এই রোগের চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন, তখন থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখেন একজন কার্ডিয়াক সার্জন হয়ে দেশের মানুষের সেবা করার। এমবিবিএস শেষ করার পর তিনি ল্যাবএইড হাসপাতালের প্রধান কার্ডিয়াক সার্জন ডা. লুতফর রহমানের তত্ত্বাবধানে তিন বছর কাজ করেন। ইতোমধ্যে কার্ডিয়াক সার্জন হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে এমএস ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের অধ্যাপক ও প্রধান কার্ডিয়াক সার্জন ডা. ফারুক আহমেদের সঙ্গেও কাজ করেন।

সাল ২০০৫, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন আশরাফুল হক সিয়াম। এরপর এমএস করার জন্য বেছে নেন কার্ডিওভাসকুলার অ্যান্ড থোরাসিক সার্জারি। ২০১৬ সালে তিনি কার্ডিওভাসকুলার অ্যান্ড থোরাসিক সার্জারিতে এমএস শেষ করে কার্ডিয়াক সার্জন হিসেবে যখন তিনি চিকিৎসা ক্যারিয়ার শুরু করেন তখন তার বয়স পঁয়ত্রিশ। কার্ডিয়াক সার্জন হিসেবে ইউনিট চিফ বা প্রধান হওয়া অত্যন্ত সম্মানের। এরপর ২৬তম ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব থোরাসিক অ্যান্ড কার্ডিওভাসকুলার সার্জনস অব এশিয়া’ কনফারেন্সে সবচাইতে তরুণ কার্ডিয়াক সার্জন হিসেবে স্বীকৃতি স্বরূপ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্মাননা পান। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের আবাসিক সার্জন হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। সেখানেই তিনি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান।

কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের ইউনিট-৯ এর চিফ বা প্রধান হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন শুরু করেন আগস্ট, ২০১৭ থেকে তখন তার বয়স ছত্রিশ। বাংলাদেশে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জনের মতো চিফ কার্ডিয়াক সার্জন/ইউনিট চিফ রয়েছেন। তন্মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ আশরাফুল হক সিয়ামের তরুণ বয়সেই এই এগিয়ে চলা বেশ আলোচিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঘটনাটিকে ইতিহাস বলে আখ্যায়িত করাই যায়। তাছাড়া দেশে তো বটেই, গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেও এত কম বয়সে কার্ডিয়াক সার্জন চিফ হওয়া নজির বিরল।

ডা. আশরাফুল হক সিয়াম বলেন, ‘কার্ডিয়াক সার্জারি অত্যন্ত জটিল একটি বিষয় যা একটি টিম ওয়ার্ক। বাইপাস সার্জারি, ভাল্ব সার্জারি, হৃৎপিণ্ডের জন্মগত ত্রুটিসহ অনেক জটিল অপারেশন করার জন্য দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, ধৈর্য এবং মেধার প্রয়োজন। এ জন্য একজন কার্ডিয়াক সার্জন ইউনিট চিফ হতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বয়স ৪৫ বছর ছুঁয়ে ফেলেন।’কর্মজীবনে হৃদরোগের জটিল সার্জারিতে দারুণ সফল, এই তরুণ চিকিৎসক। পুরো ক্যারিয়ারে ৫০০-এর বেশি কার্ডিয়াক সার্জারিতে অংশগ্রহণ করেছেন। ২০১৬ সাল থেকে প্রায় কয়েক হাজার সার্জারি করেছেন, যার মধ্যে মৃত্যুহার  মাত্র ১ শতাংশ এর ও নিচে এবং যা পৃথিবীর আন্তর্জাতিক সেমিনারে উপস্থাপিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তার সফল সার্জারিগুলো সকলের কাছেই ভূঁয়সী প্রশংসা পেয়েছে।

তার দক্ষতা ও সফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বাংলাদেশের কার্ডিয়াক সার্জনদের একমাত্র নিবন্ধিত সংগঠন ‘কার্ডিয়াক সার্জনস সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত করা হয়। এখন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক ও আবাসিক সার্জন হিসেবে কাজ করছেন তিনি।

বাংলাদেশে প্রথম ফুটো করে ২ টি ভাল্ব প্রতিস্থাপন করেন তিনি। তিনি নিয়মিত ফুটো করে হার্টে অপারেশন করে থাকেন । ফুটো করে হার্টের অপারেশন করার জন্য এই তরুণ সার্জন দেশ বিদেশ এ অত্যন্ত স্বনামধন্য। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক চিকিৎসক তার অধীনে তার কাজ দেখতে বাংলাদেশে এসেছেন।

(ঢাকাটাইমস/৩০মে/এআর)