তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে, আতঙ্কে নদীপাড়ের মানুষ

প্রকাশ | ০৪ অক্টোবর ২০২৩, ২০:০৮

আব্দুর রশিদ শাহ্, নীলফামারী

ভারতের উত্তর সিকিমে ভয়াবহ বন্যা ও বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাংলাদেশ অংশে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। বুধবার বিকাল ৪টা থেকে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের অনেক বসতবাড়িতে পানি উঠেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা ও ভাঙন আতঙ্কে দিন পার করছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। এদিকে নদী পার্শ্ববর্তী এলাকার সর্বসাধারণের সতর্কতা অবলম্বনে মাইকিং করছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।

বুধবার বিকাল ৫টার দিকে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানিপ্রবাহের উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ মিটার ২৫ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার (বিপৎসীমা ৫২ মিটার ১৫ সেন্টিমিটার) ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। 

এর আগে বিকাল ৪টায় একই পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

এদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, তিস্তার উৎসে ব্যাপক বৃষ্টিপাতের কারণে চুংথাং হ্রদে পানি বেড়ে গেছে। হ্রদের পানি আটকে রাখতে ব্যর্থ হয়ে বাঁধ খুলে দেওয়া হলে ভাটিতে নদীর পানির স্তরের উচ্চতা ২০ থেকে ২৫ ফুট পর্যন্ত বেড়ে যায়।

ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশনের বরাত দিয়ে পাউবো জানায়, ভারতের গজলডোবা পয়েন্টে তিস্তার পানির সমতল গত মধ্যরাতে প্রায় ২৮৫ সেন্টিমিটার বেড়েছে। দোমুহুনী পয়েন্টে বুধবার সকালে প্রায় ৮২ সেন্টিমিটার বেড়েছে এবং তা অব্যাহত আছে।

পাউবো আরও জানায়, তিস্তা নদীর পানি সমতল ডালিয়া পয়েন্টে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ বিকাল ৪টার দিকে ডালিয়া পয়েন্টের পানি সমতল বিপদসীমার ৫ সেন্টি মিটার ওপরে অবস্থান করছে। ডালিয়া পয়েন্টে পানিসমতল আজ রাত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৫০ সেন্টি মিটার ওপর পর্যন্ত উঠতে পারে। এর ফলে লালমনিরহাট ও নীলফামারি জেলার তিস্তা নদী তীরবর্তী এলাকাসমূহ প্লাবিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এরপর মধ্যরাত পর্যন্ত কিছুটা হ্রাস পেয়ে পরবর্তীতে পুনঃরায় পানিসমতল বৃদ্ধি পেতে পারে। 

বুধবার বিকাল ৩ টার তথ্য অনুযায়ী তিস্তা নদী কাউনিয়া পয়েন্টের পানি সমতল বিপদসীমার ৪৭ সেন্টি মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কাউনিয়া পয়েন্টে পানিসমতল বৃহস্পতিবার ভোর নাগাদ বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে আগামী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা জেলার তিস্তা নদী তীরবর্তী এলাকাসমূহ প্লাবিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

এদিকে পানি প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরের অনেক বসতবাড়িতে পানি উঠেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এছাড়া ফসলের ক্ষেত পানিতে ডুবে গিয়ে ফসলহানির শঙ্কায় চিন্তিত কৃষকরা। হঠাৎ পানি বাড়ার ফলে গবাদি পশুপাখির খাবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয়রা।

ডিমলা উপজেলার ঝারসিংঙ্গেশ্বর গ্রামের বাসিন্দা সোলায়মান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, সকালবেলা নদীতে পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে দুপুরের দিকে এমনভাবে পানি বাড়ছে যা বলার বাহিরে। মূহর্তের মধ্যে চরের ধান ক্ষেত তলিয়ে গেল।

একই গ্রামের বাসিন্দা নুর কাইয়ুম ঢাকা টাইমসকে বলেন, সকালের দিকে চরে গরু বেঁধে আসলাম। সেখান থেকে আসার ঘন্টাখানেক পরেই এতো পানি বৃদ্ধি পেল যে চরগুলো চোখের পলকে পানিতে তলিয়ে গেল।

ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ ঢাকা টাইমসকে বলেন, আমরা যখন পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে তথ্য  পেয়েছি তখনই স্থানীয় মসজিদ এবং এলাকার ডেকোরেটরের মাইক ভাড়া করে সতর্কবার্তা প্রদান করছি।

ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহিন বলেন, একদিকে উজানের ঢল, অন্যদিকে অবিরাম বৃষ্টি হওয়ায় মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। উত্তর খড়িবাড়ী গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। নিম্নাঞ্চলের মানুষকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। 

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি পরিমাপক নুরুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, উজানে বাঁধ ভাঙার কারণে দোমোহনী হয়ে তিস্তায় পানি প্রবেশ করছে সেজন্য তিস্তায় পানি বেড়েছে। বর্তমানে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুরে আলম সিদ্দিকী ঢাকা টাইমসকে বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকাল থেকেই সতর্কতা জারি করে প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়েছে। বন্যা কবলিত দুর্গত এলাকা পরিদর্শনও করেছি। এখন পর্যন্ত কোনো ধরণের ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ পাওয়া যায়নি।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদ্দৌলা ঢাকা টাইমসকে বলেন, উজানে ভারি বর্ষণের কারণে তিস্তাসহ আশেপাশের নদী গুলোতে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সতর্কতা জারি করে নিম্নাঞ্চলের মানুষকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় আমরা মানুষকে সচেতন করেছি। কোথাও কোনো সমস্যা হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড তা মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে।

(ঢাকা টাইমস/০৪অক্টোবর/এসএ)