দেশের রপ্তানিমুখী আয়ের প্রধান খাত বাঁচাতে হবে

আলী হাসান
| আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৩, ০৯:২৪ | প্রকাশিত : ০৯ নভেম্বর ২০২৩, ১৫:৪৫

গাজীপুর, সাভার ও ঢাকার মিরপুরের পোশাক তৈরির কারখানাগুলো মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক আন্দোলনের মুখে পড়ে প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। প্রতিদিনই আন্দোলনের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তার সাথে পাল্লা দিয়ে কারখানা ও গাড়ি ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও ও পুলিশের সাথে সংঘাত-সংঘর্ষও বেড়ে চলছে। এর মধ্যে গতকাল শ্রমিক বিক্ষোভে এক নারী শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এর আগেও একাধিক শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটেছে। চলমান এই আন্দোলন এখন এতটাই তীব্র আকার ধারণ করেছে যে, প্রতিদিনই নতুন করে বিভিন্ন পোশাক কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন ফ্যাক্টরির মালিকরা। অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানা তো আগে থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে, এখন যদি বাকি কারখানাগুলোও শ্রমিক বিক্ষোভের মুখে একে একে বন্ধ হতে থাকে তাহলে বৈদেশিক আয়ের এই প্রধান খাতটি শুধু হুমকির মুখেই পড়বে না তা পুরোপুরি ধ্বংসও হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ন্যূনতম ২৩০০০ টাকা মজুরির দাবিতে পোশাক শ্রমিকরা প্রায় এক মাস ধরে আন্দোলন করার পরে গত মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত মজুরিবোর্ড শ্রমিকদের জন্য ১২,৫০০ টাকা মজুরি নির্ধারণ করে। কিন্তু শ্রমিকরা এই মজুরি প্রত্যাখ্যান করে তাদের চলমান আন্দোলনকে চালিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। এরই জের ধরে শ্রমিক বিক্ষোভ এখন আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে।

গত মাসে গাজীপুর মহানগরীতে এই শ্রমিক বিক্ষোভ শুরু হলেও তা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে সাভার, আশুলিয়া এবং রাজধানীর মিরপুরে। ধীরে ধীরে শ্রমিক বিক্ষোভের আওতা সম্প্রসারিত হলেও এ ব্যাপারে গার্মেন্টস মালিক পক্ষ এবং সরকার বেশ কিছুদিন কোনো সমঝোতায় আসতে ব্যর্থ হয়। সর্বশেষ শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী তাদের ন্যূনতম মজুরি সাড়ে বারো হাজার টাকা প্রত্যাখ্যান করায় শ্রমিক অসন্তোষ আরও তীব্রতা পেয়েছে এখন।

সাধারণ বিবেচনায় অনুধাবন করতে কষ্ট হয় না যে, শ্রমিকদের দাবিগুলো কোনোভাবেই যৌক্তিকতার বাইরে নয়। বর্তমান জীবনযাপনের যাবতীয় উপকরণের বাজারমূল্য অনুযায়ী তাদের বেতনবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করতে পারবে না কেউ-ই। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- মজুরি বোর্ড গঠন করে ন্যূনতম ২৩ হাজার টাকা মজুরি ঘোষণা; নতুন মজুরি ঘোষণার আগে ৬০ শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতা চালু; চাল, ডাল, তেল ও শিশু খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি রেশন কার্ডের মাধ্যমে বিতরণের লক্ষ্যে স্থায়ীভাবে রেশনিং ব্যবস্থা চালু; চিকিৎসা-শিক্ষা নিশ্চিতে সরকার ও মালিকদের উদ্যোগ গ্রহণ; বাধ্যতামূলক অংশীদারত্বমূলক প্রভিডেন্ট ফান্ড চালুকরণ; প্রতি বছর মূল মজুরির ১০ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধি ইত্যাদি। ২০১৮ সালের পর থেকে আর পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো হয়নি। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর বেতনবৃদ্ধির যে বিধান রয়েছে মূলত তারই ন্যূনতম ২৩,০০০ টাকা বাস্তবায়ন চাচ্ছে তারা। ২০১৮ সালে শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি ১৬ হাজার টাকা দাবি করলেও সেসময় মজুরি নির্ধারণ করা হয় মাত্র আট হাজার টাকা। সেটাই এই গত পাঁচ বছর ধরে চলে আসছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সবকিছুর বাজারমূল্য অনুযায়ী ন্যূনতম এই মজুরির টাকায় কোনোভাবেই তাদের চলা সম্ভবপর ছিল না। কিন্তু তাদের বর্তমান দাবি অনুযায়ী ন্যূনতম মজুরি ২৩ হাজার টাকা এখন মেনে নিতে রাজি নন মালিক পক্ষ- তারা দিতে চেয়েছিলেন ১০,৪০০ টাকা কিন্তু মজুরিবোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হবে ১২,৫০০ টাকা। নতুন নির্ধারিত এই বেতন মালিকপক্ষ মেনে নিলেও শ্রমিকরা মেনে নেয়নি। এই স্বল্প পরিমাণ টাকা বাজার ব্যবস্থাপনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে কি না তাও ভেবে দেখার মতো বিষয়। এক্ষেত্রে আবার নতুন করে শ্রমিক-মালিক ও সরকারের সমঝোতামূলক আলোচনার কোনো বিকল্প আছে কি? উদ্ভূত পরিস্থিতির পেক্ষাপটে একটি গঠনমূলক ও যৌক্তিক আলোচনার মাধ্যমে অনতিবিলম্বে সমাধানের একটি যৌক্তিক পরিণতি দেওয়া হোক। এটা না হলে বিস্ফোরণোন্মুখ এই পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে অসন্তোষ-বিক্ষোভের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেবে। এটা অস্বীকার করার কোনো জো নেই যে, একদিকে বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর হচ্ছে; অন্যদিকে কিছু কিছু শ্রমিক সংগঠন শ্রমিক অসন্তোষকে গোপনে গোপনে আরও উসকে দিচ্ছে।

জানা যায়- আগে থেকেই ঘোষিত মজুরি কাঠামো নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ থাকলেও সরকারঘেঁষা কিছু শ্রমিক সংগঠনের সাথে সরকারের বোঝাপড়ার কারণে জাতীয় নির্বাচনের আগে তারা কোনো জোরদার আন্দোলনে যেতে পারেনি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে করে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় তখন পোশাক কারখানা এবং শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকাগুলোর ওপর কড়া নজরদারিও আরোপ করেছিল সরকার। কিন্তু সব কিছুর পরেও এখন শ্রমিক অসন্তোষ ভয়াবহতার দিকেই যাচ্ছে।

এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের তুলনায় তো বটেই, এমনকি দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের চেয়েও কম মজুরি দিচ্ছে শীর্ষ রপ্তানি আয়ের এই পোশাক তৈরি খাত। প্রত্যেকবার মজুরি বাড়ানোর সময় বিভিন্ন অজুহাতে মালিকপক্ষ একেবারেই কম মজুরি বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় যা অনেকটাই অযৌক্তিক বলে মনে হয়। পোশাক আমদানিকারক দেশগুলোতে আইন হচ্ছে, শ্রমিকদের বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় মজুরি দিতে হবে। তাই শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরির ব্যাপারে সরকার ও শিল্প মালিকদের আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, শ্রমিকরাই এই শিল্পে আয়ের প্রধান মাধ্যম।

আবার এটাও সত্যি যে, শ্রমিক আন্দোলনের প্রথম থেকেই কিছু কিছু গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলনের নামে উচ্ছৃঙ্খলতার পরিচয় দিচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। গার্মেন্টস ভাঙচুর, গাড়ি ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও করে তারা কোন অধিকার আদায় করতে চায়। ৪০ লাখ পোশাকশ্রমিকের শ্রমে ও ঘামে গড়ে ওঠা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান এই শিল্প খাতটি তাদেরই কিছু উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিকের ধ্বংসাত্মক আচরণের কারণে হুমকির মুখে পড়বে- এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান এই খাতটি নিয়ে বিভিন্ন অপপ্রচারসহ দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্রের কথা কারোই অজানা নয়। এছাড়া দেশের গার্মেন্টস সেক্টরে শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার নামে নামসর্বস্ব অসংখ্য সংগঠন গড়ে উঠেছে। এসব সংগঠনের বেশিরভাগেরই নিবন্ধন পর্যন্ত নেই। সংগঠনগুলোর নেতাদের বেশিরভাগই গার্মেন্টস কারখানার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্তও নন। শ্রমিকদের উসকে দিয়ে, ট্রেড ইউনিয়ন করার চাপসহ বিভিন্নভাবে গার্মেন্টস সেক্টরে অসন্তোষ তৈরি করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার কোনো গোপন চেষ্টা চলছে কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। অবিলম্বে বন্ধ হয়ে যাওয়া গার্মেন্টস কারখানাগুলো খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আর সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের গঠনমূলক ও কার্যকর আলোচনা সাপেক্ষে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি কত হতে পারে তা পুনঃনির্ধারণে মজুরি বোর্ডের কাছে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার পরিচয় আশা করে সকলে। তবে বর্তমানে বাজারদর অনুযায়ী বেঁচে থাকতে শ্রমিকদের বেতন যে ১২,৫০০ টাকা থেকে আরও বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই, এটা সাধারণ যেকোনো বিবেচনাবোধসম্পন্ন মানুষও মনে করে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস এই তৈরি পোশাক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ুক, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আশা করি, তৈরি পোশাক খাতের চলমান এই সংকট থেকে উত্তরণে মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠনগুলো ও সরকার তাদের সর্বোচ্চ সহনশীল ও ইতিবাচক মানসিকতার পরিচয় দিবে।

আলী হাসান : সাংবাদিক, কলাম লেখক, সংস্কৃতিকর্মী

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :