পুলিশ হেফাজত ও কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ এনসিপির সাবেক নেতা গাজী সালাউদ্দিন তানভীরের

পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ও কারাবাসে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীর।
তিনি বলেছেন, আমার শরীরে অসংখ্য ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে। এসব কিসের ইনজেকশন তা আমি জানি না। অন্তত ৭০-৮০টি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে আমাকে।
গাজী সালাউদ্দিন তানভীর বলেন, সারাক্ষণ জ্বর থাকত, আর তারা আমাকে ইনজেকশন দিত। একদিন হাত পা কাঁপতেছিল, ডাক্তার এসে ইনজেকশন দিল এবং আমার ডান হাত আর ডান পা অবশ হয়ে গেল, বাধ্য হয়ে (বগুড়ার) শহিদ জিয়া মেডিক্যালে নিয়ে গেল। ডাক্তার সেখানে বলেছে, আমার স্ট্রোক হয়েছে; কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ বলল, না স্ট্রোক করেনি- কিছুই হয়নি।
শুক্রবার রাজধানীর সেগুবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিযোগ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর ও মানহানিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় গত ৫ অগাস্ট ঢাকার পূর্ব মনিপুর এলাকা থেকে তানভীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ১০ অগাস্ট তাকে দিনের রিমান্ডে পায় বগুড়া সদর থানা পুলিশ।
গাজী সালাউদ্দিন তানভীর বলেন, ৫ অগাস্ট যেদিন প্রথম জেলে নেওয়া হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে সবাইকে ভালো খাবার দেওয়া হলো; কিন্তু আমাকে দুইদিনের পচা খাবার দেওয়া হলো। কারাগারে এমন পচাবাসি খাবারদাবার দেওয়া হতো, খাওয়ার অযোগ্য।
তিনি বলেন, একপর্যায়ে আমার ডায়রিয়া হয়ে যায়। চিকিৎসার জন্য শহিদ জিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় আমাকে। সেখানে যে ওষুধ লিখেছেন ডাক্তার সেটা আমাকে দেওয়া হয়নি, খুলে দেওয়া অজানা ওষুধ আমাকে খেতে হয়েছে।
এনসিপির সাবেক নেতা তানভীর বলেন, মেডিক্যালে আমার সিটি স্ক্যান করানো হল, রিপোর্ট কী এলো জানি না; কারা কর্তৃপক্ষ বলল কোনও সমস্যা নাই, সব ঠিক আছে। পরে বলল এমআরআই করাতে হবে, শহিদ জিয়া মেডিক্যালের এমআরআই মেশিনটা নষ্ট, তার পরও সেখানে আমাকে ঢুকাল।
তিনি বলেন, আমি ওটার ভেতরে থাকা অবস্থায় বিকট আওয়াজ হয়ে সেটি বন্ধ হয়ে গেল। আমার কোমর থেকে পা পর্যন্ত প্যারালাইজড হয়ে গেল। আমি ১০/১২ ঘণ্টা অজ্ঞান ছিলাম। পরে দেখি শহীদ জিয়া মেডিক্যালের প্রিজন সেলে এবং আমার শরীরে প্রস্রাব-পায়খানা। একজন কোনোরকমে পরিষ্কার করে দিল। পরে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে ঢাকায় আনা হলো।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, কেরাণীগঞ্জে যেখানে রাখা হলো, ওটাও খুবই খারাপ সেল। পিজি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আনা হলো, এদিক সেদিক ঘুরায় শুধু। এখানে ডাক্তার দেখিয়ে জেলে নেওয়ার সময় গাড়িতে হঠাৎ সাদা পোশাকে কয়েকজন লোক উঠে আসে, তারা আমাকে টর্চার করে।
তানভীর অভিযোগ করে বলেন, কারাগারে গিয়েও সেল থেকে আরেকটি অন্ধকার কক্ষে নিয়ে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। সেখানে টর্চারের সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং সালাহউদ্দিন আম্মারের নাম ধরে ধরে বলা হতো- জুলাইয়ের সবাইকে এরকম নির্যাতন করা হবে বলা হতো।
তিনি বলেন, ওখানে যে কক্ষে আমাকে রাখা হয়েছিল আওয়ামী লীগের লোকজন কীভাবে আছে তা দেখা যেত। তারা রাজার হালে জেলখানায় আছে, ফোনে কথা বলে ভালো খাবারদাবার খায় পরিবারের লোকজনের সঙ্গে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ করে। রাতের বেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের গাড়িতে করে বাইরে নেওয়া হয় এবং ভোরে আনা হয়, এটা আমি দেখেছি। এই দেখাটাই হয়তো আমার জন্য কাল হয়েছে।
গ্রেপ্তার দিন ৫ অগাস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কারাগারে ও পুলিশ হেফাজতে ‘চরম নির্যাতন’ করা হয় অভিযোগ করে এনসিপির সাবেক নেতা তানভীর বলেন, “হুমকি দেওয়া হয়েছে নির্যাতনের কথা বাইরে বললে আমার পরিবারের সদস্যদের গুম করে ফেলা হবে। এর পরও আপনাদের সামনে সত্যটা তুলে ধরতে এসেছি, আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না, সত্য সবার সামনে তুলে ধরতে চাই।
“বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের মাঝে, সরকারের মধ্যে খুনি ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলের কালো ছায়া আগের মতোই হুবহু রয়ে গেছে, জেলে গিয়ে তার প্রমাণ আমি পেয়েছি।”
বগুড়া সদর থানা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফুতুন আহমেদ খান গত ২ অগাস্ট মামলাটি করেন। এরপর ৫ অগাস্ট তানভীরকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে বগুড়ায় নেওয়া হয়।
গাজী সালাউদ্দিন তানভীর বলেন, “৫ অগাস্ট আমাকে বগুড়ায় কারাগারের এমন একটি সেলে নেওয়া হয়, যেটি চরম অপরিচ্ছন্ন এবং আলোবাতাসহীন। কারেন্টও নেই একটা ফ্যানও নেই। কারারক্ষীরাও আওয়ামী লীগের।
“তাদের বেশিরভাগই সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের এবং তারা আমাকে জুলাই জঙ্গি বলে গালিগালাজ করত, আশপাশের কয়েদিরাও সন্ত্রাসী সংগঠন আওয়ামী লীগের আসামি। তারাও যা তা বলে সম্বোধন করত।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়া জেলা কারাগারের জেল সুপার আসাদুর রহমান বলেন, “কারাগারে ওই বন্দিকে কোনো ইনজেকশন দেওয়া হয়নি। অসুস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে ওষুধ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে তার নিজের ওষুধও ছিল। এছাড়া বগুড়ার শহিদ জিয়া মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসাপত্র অনুযায়ী তার চিকিৎসা করানো হয়েছে।”
বাসি খাবার দেওয়া এবং অন্য বন্দি ও কারারক্ষীদের বাজে আচরণের যে অভিযোগ তিনি করেছেন তা সঠিক নয় বলে দাবি করেন জেল সুপার আসাদুর। তিনি বলেন, “জেলে ওনার সেবার কোনো কমতি ছিল না।”
পাঁচ অগাস্টের পর কারাগারে থাকা বন্দিদের অনেকেই আগের সরকারের ‘সুবিধাভোগী’ এবং ‘ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের’ মন্তব্য করে আসাদুর রহমান বলেন, “তাদের সংখ্যা বিবেচনায় ওই বন্দিকে আলাদা রাখার পাশাপাশি বিশেষভাবে দেখভালের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। উনি যেসব অভিযোগ করেছেন, সেগুলো সঠিক নয়।”
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












