সীমান্তে সারের বদলে ইয়াবার কারবার!

কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নস্থ সীমান্তবর্তী এলাকায় কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার পাচারের অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের দাবি, একটি সংঘবদ্ধ চক্র সীমান্তপথে বাংলাদেশ থেকে সার পাচার করে, বিনিময়ে মিয়ানমার থেকে নিয়ে আসছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক। সীমান্তের কথিত এই অবৈধ বাণিজ্যের প্রভাব পড়েছে এখন কৃষকের ঘাড়ে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, আমন ধানের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জমিতে প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করতে না পারলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ফলনও কমে যেতে পারে।
রহমতেরবিল, আঞ্জুমানপাড়ার বাসিন্দা এবং মালভিটাপাড়ার কামাল বলেন, আজও অনেক দোকান ঘুরে সার পাইনি। সীমান্তঘেঁষা সব এলাকায় কৃষকরা সার নিয়ে উৎকন্ঠায় রয়েছে। তারা বলেন, যথা সময়ে সার প্রয়োগ করতে না পারলে ধানের অবস্থা কী যে হতে পারে জানি না।
স্থানীয় কৃষক নুরুল আলম বলেন, ধানের জমিতে এখন সার প্রয়োজন। কিন্তু বাজারে প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে যদি সার পাচার হতে থাকে, তাহলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং ফলনও কমে যেতে পারে।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরীও সার পাচারের অভিযোগটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন পদ-পদবি দেওয়ার সুযোগ নিয়ে কিছু মাদক ব্যবসায়ী প্রভাবশালী ব্যবসায়িতে পরিনত হয়ে উঠেছে এবং তাদের একটি অংশ সীমান্ত দিয়ে সার পাচারের সঙ্গে জড়িত। তবে তাঁর এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সার সংকটের কথা জানিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও ফলিয়াপাড়া এলাকার কৃষক জাফর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, অবসর নেওয়ার পর এখন কৃষিকাজ করি। জমির জন্য সার কিনতে আহমদ কবির সার ডিলারের দোকানে দুই-তিনবার গিয়েছি। কিন্তু সার না পেয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। প্রয়োজনের সময় সারই যদি না পাই, তাহলে কৃষিকাজ করব কীভাবে?
অপরদিকে সার পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উখিয়া উপজেলা বিসিআইসি সার ডিলারদের সভাপতি প্রকাশ আহমদ কবির সওদাগর। তিনি বলেন, সম্প্রতি উখিয়ায় জব্দ হওয়া সার ও আটক ব্যক্তিরা কক্সবাজার জেলার বাইরের লোক। উখিয়ার কোনো সার ডিলারের কাছ থেকে এসব সার নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, একটি মহল সার ডিলার ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, আমন মৌসুমে কৃষকরা একসঙ্গে সার নেওয়ায় সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। দুই-তিন দিনের মধ্যে সার চলে আসবে। এরপর আর সার সংকট থাকবে না।
তবে সীমান্ত এলাকায় সার পাচারের অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে না উপজেলা কৃষি বিভাগ। উখিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশীষ সরকার বলেন, মিয়ানমারে সার পাচারের অভিযোগ রয়েছে। পাচার বন্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিজিবি, পুলিশ ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। সম্ভাব্য পাচার রুটগুলোতে বিশেষ নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তা আরও জানান, আজ সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) থেকে উখিয়ায় নতুন করে সার সরবরাহ শুরু হবে। যেসব কৃষক এখনো একেবারেই সার পাননি, তাঁদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর আশ্বাস, কোনো কৃষক সার থেকে বঞ্চিত হবেন না।
এদিকে সীমান্তবাসীর প্রশ্ন, কৃষকের জমিতে দেওয়ার জন্য বরাদ্দ সার যদি সত্যিই সীমান্তপথে পাচার হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনে কারা কাজ করছে এবং কীভাবে তা সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে? আবার ডিলারদের দাবি অনুযায়ী যদি সার পাচারের সঙ্গে স্থানীয় কোনো ডিলারের সম্পৃক্ততা না থাকে, তাহলে জব্দ হওয়া সার কোথা থেকে এবং কীভাবে সীমান্ত এলাকায় পৌঁছাচ্ছে, সেটিও তদন্তের বিষয়।
স্থানীয়দের মতে, সীমান্তে মাদক ও চোরাচালান বন্ধে কার্যকর নজরদারি জোরদার করা না হলে কৃষি উপকরণ পাচারের ঝুঁকিও বাড়বে। তাই সার সংকটের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ ও তদন্ত প্রয়োজন।
কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার কৃষকের জমিতেই পৌঁছাবে, এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। একই সঙ্গে সার পাচারের অভিযোগ সত্য হলে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
(ঢাকা টাইমস/২৮সেপ্টেম্বর/এসএ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













