ইতালি নেওয়ার প্রলোভন, মিশরে নিয়ে নির্যাতন ও দেহব্যবসায় বাধ্য করার অভিযোগ, মূলহোতা গ্রেপ্তার

ইতালি নেওয়ার কথা বলে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে প্রথমে শ্রীলঙ্কা ও পরে মিশরে পাঠাত একটি মানবপাচার চক্র। সেখানে তাদের আটকে রেখে নির্যাতন এবং অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে চক্রটির বিরুদ্ধে। এই চক্রের অন্যতম মূলহোতা মোহাম্মদ আরজু রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি।
এসআরবি জানিয়েছে, প্রায় ১২ বছর ধরে মানবপাচারের সঙ্গে যুক্ত আরজু। এই সময়ে দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে ইউরোপে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিভিন্ন থানায় অভিযোগও রয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৪ এর পদাতিক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, গতকাল সোমবার বিকাল চারটার দিকে রাজধানীর বনানীর সি ব্লক এলাকা থেকে এসআরবি-৪ ও এসআরবি-১ এর যৌথ অভিযানে মোহাম্মদ আরজু রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এসআরবি কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের ১৬ জুলাই মানবপাচারের শিকার কামরুন্নাহার ফাতেমা মিশর থেকে এনএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, ইতালি নেওয়ার কথা বলে একটি চক্র তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের মিশরে নিয়ে আটকে রেখেছে। এরপর এনএসআই গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করে। আরজু তখন মিশরে ছিলেন। গত তিন–চার দিন আগে তিনি বাংলাদেশে আসেন। আগামী বৃহস্পতিবার আবার মিশরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে জানান তিনি।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, কামরুন্নাহার ফাতেমা ও তার পরিবারের মোট পাঁচ সদস্যকে ইতালি নেওয়ার কথা বলে আরজু ৮৫ লাখ টাকা নেন। পরে ‘বাংলাদেশ থেকে ভিসা হবে না’ বলে তাদের শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
নির্যাতনের পর পরিবারের তিন ছেলে সদস্য কোনোভাবে সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। পরিবারের দুই নারী সদস্য কামরুন্নাহার ফাতেমা ও আঞ্জুমান আরার মধ্যে আঞ্জুমান আরা পালিয়ে শ্রীলঙ্কার কোনো একটি এলাকায় অবস্থান করছেন বলে জানানো হয়।
আর কামরুন্নাহার ফাতেমাকে পরে শ্রীলঙ্কা থেকে মিশরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে নির্যাতন করে অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হতো বলে জানান এসআরবি কর্মকর্তা। এসব কাজে রাজি না হলে তাকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয়। এমনকি শরীরের বিভিন্ন স্থানে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে এসআরবি জানায়, আরজু প্রায় ১২ বছর ধরে মানবপাচারের সঙ্গে যুক্ত। এ সময়ে দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে একইভাবে বিদেশে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে পালিয়ে আসা ৩০ থেকে ৩৫ জন ভুক্তভোগী গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত এসআরবির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
এসআরবি জানায়, আরজুর নিজের কোনো লাইসেন্স নেই। তিনি ‘আরজু ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ ও ‘নাফিস এয়ার ইমিগ্রেশন লিমিটেড’সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে ইউরোপে নেওয়ার প্রলোভন দেখাতেন। পরে তাদের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।
এসআরবি-৪-এর অধিনায়ক বলেন, আরজুর মোবাইল ফোনে পাওয়া ব্যাংক স্টেটমেন্টে গত এক বছরে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার বেশি লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
মানবপাচারবিরোধী অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, ২০২৫–২৬ সালে এসআরবির অভিযানে এ পর্যন্ত ২২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কামরুন্নাহার ফাতেমা ও আঞ্জুমান আরাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। তারা শ্রীলঙ্কা ও মিশর থেকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তাদের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন।
গ্রেপ্তার আরজুকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ভাটারা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তার সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে এসআরবি।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













