আভিভা ইকুইটির ব্রোকারেজ হাউজের লেনদেন বন্ধে ক্ষতি বিনিয়োগকারীদের, লাভ কার?

আভিভা ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ব্রোকারেজ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫ হাজার বিনিয়োগকারী। বিশেষ করে মার্জিন ঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা গ্রাহকেরা শেয়ার কেনাবেচা ও অন্য ব্রোকারেজ হাউজে শেয়ার স্থানান্তর করতে না পারায় আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, স্টক-ব্রোকার ও স্টক-ডিলার সনদ নবায়নের আবেদন করা হলেও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তা নবায়ন না করায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে শেয়ারবাজারে দরপতনের মধ্যে তাদের বিনিয়োগ আটকে গেছে।
তবে ডিএসইর নথিতে বলা হয়েছে, আভিভা ইকুইটি ম্যানেজমেন্টের স্টক-ব্রোকার ও স্টক-ডিলার নিবন্ধন সনদের মেয়াদ ১৫ সেপ্টেম্বর শেষ হয়ে যায়। এরপর সনদ নবায়ন না হওয়ায় ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিষ্ঠানটির স্টক-ব্রোকার ও স্টক-ডিলার হিসেবে কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
ডিএসইর প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার পক্ষে এজিএম ও মনিটরিং অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স বিভাগের প্রধান মো. রাবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত ১৬ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক-ডিলার, স্টক-ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি) বিধিমালা, ২০০০-এর বিধি ৩ অনুযায়ী বৈধ নিবন্ধন সনদ ছাড়া কোনো স্টক-ডিলার, স্টক-ব্রোকার বা অনুমোদিত প্রতিনিধি সিকিউরিটি কেনাবেচা বা এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন না। এ কারণে আভিভা ইকুইটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
নবায়নের আবেদন করেও সাড়া মেলেনি, দাবি আভিভার
তবে আভিভা ইকুইটি সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২ জুলাই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিএসইসির কাছে স্টক-ব্রোকার ও স্টক-ডিলার সনদ নবায়নের আবেদন করা হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফি ও কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত বিষয় সম্পন্ন করার পরও সনদ নবায়ন করা হয়নি।
তাদের আরও দাবি, প্রতিষ্ঠানটির কনসোলিডেটেড কাস্টমার অ্যাকাউন্ট (সিসিএ) সারপ্লাস এবং স্টক রিকনসিলিয়েশনসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো ঠিকঠাক থাকার পরও নবায়ন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা করা হয়েছে।
আভিভা-সংশ্লিষ্ট পক্ষ আরও দাবি করেছে, ২৪ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া একটি নির্দেশনার পরও সনদ নবায়ন করা হয়নি। তবে ওই নির্দেশনার বিষয়বস্তু এবং আভিভার সনদ নবায়নের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্কের বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আভিভা ইকুইটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫ হাজার বিনিয়োগকারীর একটি বড় অংশ মার্জিন ঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে দরপতনের কারণে অনেক বিনিয়োগকারীর শেয়ারের মূল্য কমে গেছে। বিপরীতে ঋণের পরিমাণ আগের মতো থাকায় তাদের ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে।
এ অবস্থায় ব্রোকারেজ হাউজের লেনদেন বন্ধ থাকায় তারা শেয়ার বিক্রি করে ঋণ সমন্বয় করতে পারছেন না। অন্য ব্রোকারেজ হাউজে শেয়ার স্থানান্তর করেও স্বাভাবিকভাবে লেনদেন করতে পারছেন না বলে অভিযোগ বিনিয়োগকারীদের।
ফলে দীর্ঘ সময় লেনদেন বন্ধ থাকলে বিনিয়োগকারীদের লোকসান আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
আনোয়ারুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
আভিভা ইকুইটির লেনদেন বন্ধ ও সনদ নবায়ন নিয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট পক্ষ।
তাদের অভিযোগ, আনোয়ারুল ইসলাম বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন এবং মার্কেট ইন্টারমিডিয়ারি–সংক্রান্ত দায়িত্বে থেকে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করছেন। কোনো কোনো ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানে চিঠি দেওয়া, ফোন করে বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া এবং জরিমানা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ভয় দেখানোর অভিযোগও করেছেন তারা।
বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সমস্যা নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তাদের কাছে অনৈতিক সুবিধা চাওয়া হয়েছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও বিএসইসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে অর্থ দাবির অভিযোগও করা হয়েছে।
তবে এই অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি ঢাকাটাইমস। একইসঙ্গে মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলামের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
আভিভা-সংশ্লিষ্টরা আরও অভিযোগ করেছেন, আগের সরকারের সময়ে আনোয়ারুল ইসলাম প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং সাবেক বিএসইসি চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম ও সাবেক কমিশনার তারিকুজ্জামানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাদের দাবি, আগের সরকারের সময়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্বার্থ রক্ষায় তিনি ভূমিকা রেখেছেন এবং বর্তমান সময়েও একইভাবে প্রভাব বিস্তার করছেন।
ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের অভিযোগ আভিভা ইকুইটির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও কমপ্লায়েন্স সম্পন্ন থাকার পরও বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের সনদ নবায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। পরে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ট্রেডিং কার্যক্রম স্থগিত করা হচ্ছে।
তাদের দাবি, এর ফলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।
আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে আগের সরকারের সময়ের কর্মকাণ্ড নিয়েও অভিযোগ তুলেছে আভিভা-সংশ্লিষ্ট পক্ষ। তাদের দাবি, তিনি তৎকালীন বিএসইসি কমিশনার তারিকুজ্জামানের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন। এমনকি ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ও টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচিতেও তার অংশ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ছবি ও সংবাদ প্রতিবেদন তাদের কাছে রয়েছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিএসইসির ২৩ কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতির জন্যও আনোয়ারুল ইসলাম দায়ী এমন অভিযোগ করা হয়েছে।
ডিএসইর চিঠিতে যা বলা হয়েছে
১৬ সেপ্টেম্বর আভিভা ইকুইটিকে দেওয়া ডিএসইর চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির স্টক-ব্রোকার ও স্টক-ডিলার সনদের মেয়াদ ১৫ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে এবং এরপর তা নবায়ন হয়নি। এ কারণে ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে বিধি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। অর্থাৎ ডিএসইর অবস্থান অনুযায়ী, বৈধ সনদ না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির লেনদেন বন্ধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে আভিভা ইকুইটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সনদ নবায়নের আবেদন আগেই করা হয়েছিল এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রও জমা দেওয়া হয়েছিল। ফলে আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া এবং এরপর ট্রেড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সমস্যায় পড়েছেন।
আভিভা ইকুইটির বিনিয়োগকারীদের মূল প্রশ্ন এখন সনদ নবায়নের আবেদন কেন নিষ্পত্তি হলো না এবং লেনদেন বন্ধ থাকাকালে তাদের শেয়ার, অর্থ ও মার্জিন হিসাব কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে।
আভিভা-সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি, দ্রুত প্রতিষ্ঠানটির লেনদেন চালু না হলে মার্জিন ঋণে থাকা বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হতে পারে।
তারা আভিভা ইকুইটির কার্যক্রম দ্রুত চালুর পাশাপাশি যেসব ব্রোকারেজ হাউজের লেনদেন বন্ধ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়েও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে বিএসইসির কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













