রেলওয়ের জায়গা যেন দখলদারদের পৈত্রিক সম্পত্তি

চব্বিশের গণঅভূত্থানের পর বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের গেট সংলগ্ন রেলওয়ের জায়গাকে পৈত্রিক সম্পত্তি মনে করে দখলে নিয়েছে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। সেখানে তারা রেললাইনের দুই পাশে দোকানঘর নির্মাণ করে বাণিজ্যিক চুক্তিতে ভাড়া দিয়েছেন ফাস্টফুড, চা, ফুচকা-চটপটি ও ভাজাপোড়া দোকানিদের কাছে। অবৈধ এসব দোকানপাট উচ্ছেদে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় দখলদাররা অব্যাহত রেখেছে তাদের দখল।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অবৈধভাবে গড়ে তোলা ওইসব দোকানপাটগুলোর কারণে ভ্রাম্যমান ফাস্টফুড দোকানিরাও সেখানে ভিড় করছে। স্থায়ী এবং ভ্রাম্যমান এসব দোকানের কারণে আড়ালে পড়ে গেছে উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজিজুল হক কলেজের মূল ভবন ও ক্যাম্পাস। এছাড়া রেললাইন ঘেঁষে গড়ে ওঠা এসব দোকানগুলোতে প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত শত শত মানুষের সমাগম তৈরি করছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। কারণ, এই সময়ের মধ্যেই ওই রেলপথ দিয়ে চলাচল করে একাধিক মেইল ও লোকাল ট্রেন।
এ বিষয়ে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রেলওয়ের জমিতে গড়ে ওঠা দোকানগুলোর বৈধ লাইসেন্স নেই। তারা খুব দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করবেন।
কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী গণমাধ্যমকর্মী প্রতীক ওমর বলেন, একদল দখলদার আজিজুল হক কলেজের সামনের রেলওয়ের জায়গা অবৈধভাবে দখল করে দোকানঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এতে কলেজের সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সরকারি সম্পত্তি থেকে রাজস্ব আয়ও ব্যাহত হচ্ছে। আমি অবিলম্বে এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে রেলওয়ের জমি উদ্ধার এবং দখলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সরকারি সম্পত্তি দখল করার সাহস না পায়।
কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী বগুড়া জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট দিলরুবা নুরী বলেন, আজিজুল হক কলেজের মূল গেট হিসেবে এখন যেটি ব্যবহৃত হয় সেটি রেললাইন ক্রস করে যেতে হয়। আগে কামারগাড়ীর ওদিককার গেটটি মূল গেট হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ওই গেটের দুই পাশে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্থাপনা। এসব স্থাপনার কারণে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এ কারণে যদি কোনো শিক্ষার্থীর প্রাণহানি ঘটে, তার দায়ভার কে নেবে? কলেজ কর্তৃপক্ষ, নাকি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ?
সরকারি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ মো. মাহফুজুল ইসলাম বলেন, রেললাইনের দুই পাশে দোকানপাট বসায় চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে কলেজে যাতায়াত, বাস ঘোরানো এবং রেলক্রসিংয়ে দায়িত্ব পালনকারী কর্মীদের কাজেও সমস্যা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সিএনবি সড়ক থেকে রেললাইন পার হয়ে কলেজে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু দোকানপাটের কারণে বড় বাস ঘোরানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি রেলক্রসিংয়ে দায়িত্ব পালনকারী কর্মীর সিগন্যাল ওঠানো-নামানোর জন্য দাঁড়ানোর জায়গাও নেই।
অধ্যক্ষ মো. মাহফুজুল ইসলাম বলেন, সরকারি আজিজুল হক কলেজে প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন। শিক্ষক-কর্মচারীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষকে প্রতিদিন এই পথে চলাচল করতে হয়। নিয়মিত ট্রেন চলাচলের মধ্যে দোকানপাটের কারণে সৃষ্ট সংকীর্ণতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া এসব স্থাপনার কারণে সড়ক থেকে কলেজটি সহজে দেখা যায় না।
তিনি আরও বলেন, আমরা রেলওয়ের কাছ থেকে রেললাইনের পাশ থেকে কলেজ পর্যন্ত জায়গাটুকু বাগান করার জন্য লিজ নেওয়ার চেষ্টা করছি। জায়গাটি পাওয়া গেলে সেখানে বাগান করে সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি পরিবেশও সুন্দর করা সম্ভব হবে। কিন্তু যারা সেখানে দোকানপাট বসিয়েছেন, তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে বিষয়টি মোকাবিলা করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
বগুড়া রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার সাজেদুর রহমান সাজু বলেন, রেললাইনের পাশে এভাবে দোকানপাট থাকায় ট্রেন চলাচল ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ট্রেন নিরাপদে চলাচলের স্বার্থে রেললাইনের পাশে এসব দোকানপাট থাকার কোনো বৈধতা নেই।
তিনি বলেন, বিষয়টি জানিয়ে বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে লিখিতভাবে বার্তা পাঠিয়েছি। এর আগে একবার বার্তা দেওয়ার পর উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে শেষ হয়নি। এখন দোকানপাট আরও বেড়েছে।
স্টেশন মাস্টার আরও বলেন, বিশেষ করে বিকেল ও সন্ধ্যায় সরকারি আজিজুল হক কলেজের ফটকের সামনে শত শত মানুষের চলাচল থাকে। এ সময় রেলপথে অনেক ট্রেন চলাচল করে। মানুষের এমন আনাগোনার মধ্যে দোকানপাট থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
বগুড়া রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী/কার্য আসলাম হোসেন বলেন, এসব স্থাপনার কোনো বাণিজ্যিক লাইসেন্স নেই। রেলওয়ের জমি জোরপূর্বক দখল করে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করা হচ্ছে। এতে রেলওয়ে কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না।
তিনি বলেন, এসব স্থাপনার কারণে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এতে ট্রেনের যাত্রী ও সাধারণ মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা একাধিকবার এসব স্থাপনা উচ্ছেদের চেষ্টা করেছি। এর আগে একবার উচ্ছেদ অভিযানও চালানো হয়েছিল। কিন্তু পরে বিভিন্ন মহলের ছত্রচ্ছায়ায় আবারও সেখানে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়। ফলে একই সমস্যা বারবার তৈরি হচ্ছে।
প্রকৌশলী আসলাম হোসেন আরও বলেন, রেলওয়ের জমি অবৈধভাবে দখল করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্থাপনা উচ্ছেদের সুযোগ রয়েছে। রেলওয়ের মাস্টারপ্ল্যানেও এ ধরনের স্থাপনার অনুমোদন নেই। রেললাইনের পাশের এই জায়গায় অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বা ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই।
বগুড়া রেলওয়ের ফিল্ড কানুনগো মো. রাজীবুজ্জামান বলেন, ছায়ফুল ইসলাম গংয়ের নামে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দেওয়া দুটি লাইসেন্স রয়েছে। উচ্ছেদ কার্যক্রমের সময় তারা হাইকোর্টের দুটি স্থগিতাদেশ দেখানোয় ওই দোকান দুটির বিরুদ্ধে উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। তবে বাকি দোকানগুলোর সবই অবৈধ। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। তারা শিগগিরই বগুড়া শহরে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার আশ্বাস দিয়েছেন।
তিনি জানান, লাইসেন্সধারীদের কাছে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরিত কাগজ রয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে রাজস্বও আদায় করা হয়েছিল। পরে তারা আদালতের স্থগিতাদেশ নেন। স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ায় চলতি বছর তাদের কাছ থেকে আর রাজস্ব আদায় করা হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফিল্ড কানুনগো আরও বলেন, তিনি যোগদানের পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে রেলওয়ের জমি দখল করে অবৈধ দোকানপাট নির্মাণকারী মাহমুদুল হক ও জহুরুল হক নামে দুজনকে আসামি করে সদর থানায় এজাহার দায়ের করেছেন। তারা রেলওয়ের ২০০০ বর্গফুট জায়গায় অবৈধভাবে স্থাপনা তৈরি করেছেন।
(ঢাকা টাইমস/১৫অক্টোবর/এসএ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












