মিরপুরে ‘চাঁদাবাজ’ পাপেলের পৃষ্ঠপোষক কে?

রাজধানীর মিরপুর ও গাবতলী এলাকায় গদি, ঘাট, আড়ত, পরিবহন ও দোকান ঘিরে চাঁদাবাজির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক নেতা মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেলের বিরুদ্ধে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিএনপির কয়েকজন নেতার অভিযোগ, এসব খাত থেকে মাসে কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করা হয়। এই নেটওয়ার্কে পাপেলের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন নেতা ও তাদের অনুসারীরা যুক্ত।
স্থানীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গাবতলী ও মিরপুরের বিভিন্ন অবৈধ আয়ের খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন পাপেল ও তার ঘনিষ্ঠরা। তাদের বিরুদ্ধে গদি, পণ্যবাহী ট্রাক, নৌযান, পশুর হাটের সামনের দোকান, আড়ত ও পরিবহনকেন্দ্রিক চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু গাবতলীর ইট-বালুর গদি, পণ্যবাহী ট্রাক ও পশুর হাটের সামনের দোকান থেকে মাসে প্রায় সাড়ে ৩৫ লাখ টাকা আদায় হয়। মিরপুর-১ নম্বরে শাহ আলী মাজারের আড়ত কমপ্লেক্স ও বাইরের জায়গা থেকে আদায় হয় আরও ৩০ লাখ টাকার বেশি। এ ছাড়া নৌপথে শুল্কের নামে এবং বাস টার্মিনাল ও অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড ঘিরেও টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব হিসাব সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সূত্রের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে করা; প্রকৃত আদায়ের পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পাপেলের ঘনিষ্ঠ কারা
স্থানীয় বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা ও ব্যবসায়ীর অভিযোগ, পাপেলের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মধ্যে রয়েছেন শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়া ও হাফিজুল হাসান ওরফে শুভ্র। তাদের অনুসারীদের মাধ্যমে পশুর হাট, কাঁচাবাজার, ঘাট, গদি ও পরিবহনকেন্দ্রিক বিভিন্ন স্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং চাঁদা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত মাসে মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায়ও পাপেলসহ এই ব্যক্তিদের কয়েকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। ওই ঘটনায় করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হানিফ। দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে শুভ্রকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, কোনো সাংগঠনিক কমিটিতে পদ না থাকায় পাপেল ও লেলিনের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে পুলিশ তাদের খুঁজছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গাবতলী থেকে কল্যাণপুর পানির পাম্প বা স্লুইসগেট পর্যন্ত বেড়িবাঁধ সড়কের দুই পাশে শতাধিক ইট, বালু ও পাথরের গদি রয়েছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জানিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতিটি গদি থেকে মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। এই হিসাবে শুধু গদি থেকেই মাসে অন্তত ২০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া পণ্যবাহী ট্রাক থেকে গাড়ির আকারভেদে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন অন্তত ১৫০টি ট্রাক ওই এলাকায় পণ্য নিয়ে আসে। গড়ে প্রতিটি ট্রাক থেকে ৩০০ টাকা করে নেওয়া হলে মাসে এই খাতে আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ টাকা।
গাবতলী পশুর হাটের সামনের অর্ধশতাধিক দোকান থেকেও মাসে তিন থেকে চার হাজার টাকা করে আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে গাবতলী এলাকায় গদি, ট্রাক ও দোকানকেন্দ্রিক চাঁদা আদায়ের পরিমাণ মাসে প্রায় সাড়ে ৩৫ লাখ টাকা বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাব।
অন্যদিকে, গাবতলী ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে সিন্নিরটেক হয়ে আশুলিয়াগামী নৌপথে পণ্যবাহী নৌযান থেকে শুল্কের নামে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, পাপেল ও তার ঘনিষ্ঠদের নিয়ন্ত্রণে কয়েকজন ব্যক্তি এ কার্যক্রম তদারক করেন। নৌযানের আকার অনুযায়ী এক থেকে দেড় হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে আদায়কারীদের একজন জানিয়েছেন। তবে নৌযানের চালক ও কর্মীদের অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
ঢাকা নদীবন্দরের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে ওই নৌপথে নতুন ইজারাদার নিয়োগ করা হয়নি। আগের ইজারার টাকা পরিশোধের দাবি থাকলেও চলন্ত নৌযান থেকে এভাবে শুল্ক আদায়ের সুযোগ নেই বলে তিনি জানান।
পৃষ্ঠপোষকতার প্রশ্ন
স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, পাপেল ও তার ঘনিষ্ঠরা সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ ওরফে মিষ্টির অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনার পর দলীয় প্রধানের নির্দেশে ফেরদৌসী আহমেদ সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনার পর পাপেল ও তার ঘনিষ্ঠদের কয়েকজন আত্মগোপনে গেলেও থেমে নেই তাদের চাঁদাবাজি। এছাড়া ‘চাঁদাবাজ’ পাপেলের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত এক নারী নেত্রীর নামও জোরেশোরে শোনা যায়।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব এলাকায় দখল ও চাঁদা আদায়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল তৎকালীন সংসদ সদস্য আসলামুল হক ও তার অনুসারীদের হাতে। তার মৃত্যুর পর যুবলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান ওরফে নিখিলের অনুসারীদের প্রভাব বাড়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের একাংশের নেতাদের মধ্যে এসব খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এ সময় পাপেল ও তার ঘনিষ্ঠরা প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
যা বলছে পুলিশ
পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার বলেন, পরিচয়-নির্বিশেষে চাঁদাবাজ ও দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মিরপুরে কেউ অশান্তি সৃষ্টি করলে কিংবা আগে অশান্তি সৃষ্টির অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগে দায়িত্বরত একজন কর্মকর্তা বলেন, মিরপুর এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ ছাড়া আরও যারা যারা এসব অপকর্মে জড়িত তাদের বিষয়ে আমরা কাজ করছি। চাঁদাবাজির সঙ্গে কারা জড়িত, কারা অর্থ আদায় করছেন এবং এর পেছনে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, চাঁদাবাজির মতো অপরাধের সঙ্গে যারই সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, এক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করা হবে না।
এদিকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে পাপেলকে মুঠোফোনে কল করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












