বিসিএস-ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে নেত্রকোনায় প্রাথমিকের শিশুদের পড়াচ্ছেন বুয়েটের নায়লা

উচ্চ বেতনের চাকরি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা ক্ষমতার মোহ—সাফল্যের প্রচলিত সংজ্ঞায় এগুলোই অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে কেউ কেউ বেছে নেন ভিন্ন এক পথ। অর্থ কিংবা পদমর্যাদার চেয়ে মানুষের ভালোবাসা, আত্মতৃপ্তি ও সমাজের জন্য কাজ করাকেই প্রাধান্য দেন তারা।
এমনই এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করা নায়লা শারাফ। প্রকৌশলী কিংবা ব্যাংকার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নিয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা। বর্তমানে নেত্রকোনা সদরের পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিশুদের পাঠদান করছেন তিনি।
বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর নায়লা শারাফ এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি পান। তবে কর্মপরিবেশ ও কিছু বিষয়ে আপস করতে না পেরে অল্পদিনের মধ্যেই চাকরি ছেড়ে দেন। পরে জনতা ব্যাংকে এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু ব্যাংকের যান্ত্রিক কর্মজীবনও তাকে আকৃষ্ট করেনি। এমনকি ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও সরকারি চাকরিতে যোগ দেননি তিনি।
এরপর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন নায়লা। গত সাত বছর ধরে তিনি প্রাথমিকের শিশুদের পড়াচ্ছেন।
নিজের জীবনযাপন ও পেশা সম্পর্কে নায়লা শারাফ বলেন, অর্থ কিংবা খ্যাতির প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণ নেই। সাধারণ জীবনযাপন করেই তিনি সন্তুষ্ট। তার কাছে শিশুদের ভালোবাসা ও কাজের মাধ্যমে পাওয়া আত্মতৃপ্তিই বড় প্রাপ্তি।
শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নৈতিকতা, সততা ও সাহসের শিক্ষাও দেন নায়লা। অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করা এবং নিজের কাজের সঠিকতা নিয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করার শিক্ষা দেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের দেওয়া নিজের একটি বার্তার কথা উল্লেখ করে নায়লা বলেন, কোনো কাজ করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—সেই কাজটি সবার সামনে স্বীকার করার মতো সাহস ও সততা নিজের মধ্যে আছে কি না। যদি কোনো কাজ সবার সামনে বলতে সংকোচ হয়, তাহলে সেই কাজ না করার শিক্ষাই তিনি শিশুদের দেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লীলা রানী ভৌমিক নায়লা শারাফের প্রশংসা করে বলেন, তিনি বিদ্যালয়ের একজন অমূল্য সম্পদ। বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেও প্রান্তিক পর্যায়ের শিশুদের নিজের সন্তানের মতো করে পড়ানো বিরল দৃষ্টান্ত।
প্রধান শিক্ষকের ভাষ্য, নায়লা শুধু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দায়িত্ব পালন করেই থেমে থাকেন না। শিশুদের পাঠ সহজ করতে নিজেই ছবি আঁকেন, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করেন এবং বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত সময় দিয়ে পাঠ প্রস্তুত করেন। শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও সততা শেখাতেও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
নিজে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন নায়লা। তাই তিনি চান, প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া পরিবারের শিশুরাও যেন শহরের নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মতো মানসম্মত শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায়।
শিক্ষার্থীদের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে নায়লা বলেন, অন্য কোনো পেশায় থাকলে হয়তো অনেক বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারতেন। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি যে ভালোবাসা পান, সেটিই তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের ভালোবাসার প্রকাশ তাকে শিক্ষকতার পেশায় আরও বেশি অনুপ্রাণিত করে।
বুয়েট থেকে পড়াশোনা করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করায় পরিচিতজনদের কাছ থেকে নানা মন্তব্যও শুনতে হয়েছে তাকে। তবে এসবকে গুরুত্ব দেন না নায়লা। তার লক্ষ্য, তিনি যে শিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন, প্রান্তিক পরিবারের শিশুরাও যেন একইভাবে নিজেদের যোগ্য ও দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
প্রাথমিক শিক্ষায় মেধাবী ও নিষ্ঠাবান তরুণদের আরও বেশি এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে নায়লা বলেন, প্রতিদানের প্রত্যাশা না করে শিশুদের জন্য কাজ করার মানসিকতা নিয়েই এ পেশায় আসা উচিত। দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক বাড়লে প্রাথমিক শিক্ষার মানও আরও উন্নত হবে বলে মনে করেন তিনি।
উচ্চশিক্ষা ও প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ারের একাধিক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নায়লা শারাফের প্রাথমিক শিক্ষকতাকে বেছে নেওয়ার গল্প তাই ব্যতিক্রমী। শত শত শিশুর শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে তিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন—পেশার মর্যাদা শুধু পদ বা বেতনে নয়, মানুষের জীবনে সেই কাজের প্রভাবেও নিহিত।
(ঢাকাটাইমস/৫ অক্টোবর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













