ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ করতে সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি

মো. আবদুল মান্নান
  প্রকাশিত : ২৩ মে ২০২৬, ১২:১৮
অ- অ+

কুরবানির ঈদ আমাদের ধর্মীয় জীবনের অন্যতম বৃহৎ উৎসব। এই উৎসব কেবল পশু কুরবানি কিংবা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সম্প্রীতির এক মহামিলন।

ঈদের ছুটিতে রাজধানীসহ বড় বড় শহর থেকে লাখ লাখ মানুষ নাড়ির টানে গ্রামে ফিরে যান। কর্মব্যস্ত নগরজীবনের ক্লান্তি পেছনে ফেলে মানুষ ছুটে চলে শৈশবের উঠোনে, বৃদ্ধ মা-বাবার কাছে, আত্মীয়-স্বজনের সান্নিধ্যে। এই যাত্রা শুধু ভ্রমণ নয়- এটি আবেগের, ভালোবাসার এবং শিকড়ে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য আয়োজন। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।

আগামীকাল রবিবার থেকে সরকারি, বেসরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সব ধরনের অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষিত হয়েছে আগেই। ইতিমধ্যে মানুষ ঘরমুখী হতে শুরু করেছে। সামনের কদিন বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও ব্যক্তিগত যানবাহনে লাখ লাখ মানুষ গ্রামমুখী হবেন।

এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে সরকার নিশ্চয়ই পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা ভালো না আমাদের। ঈদ এলেই আতঙ্ক বাড়ে। সড়কে দীর্ঘ যানজট, ভাঙাচোরা রাস্তা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অদক্ষ চালক, বেপরোয়া গতি, ফেরিঘাটে বিশৃঙ্খলাসব মিলিয়ে ঈদযাত্রা অনেক সময় পরিণত হয় দুর্ভোগের অন্য নামে।

এই বাস্তবতায় নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং স্থানীয় সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতা-কর্মীরা যদি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে মাঠে নামেন, তাহলে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি সম্ভব।

ঈদযাত্রাকে অনেক সময় কেবল একটি প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি একটি গভীর মানবিক বিষয়। একজন শ্রমিক সারা বছর কারখানায় কাজ করে ঈদের ছুটিতে পরিবারের কাছে ফিরতে চান। একজন প্রবাসফেরত মানুষ গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মায়ের হাতে রান্না খেতে চান। একজন বৃদ্ধ বাবা স্টেশনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন তার সন্তানের জন্য। এই আবেগের সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যখন কোনো মা তার সন্তানকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকেন, যখন অসুস্থ রোগী যানজটে আটকে কষ্ট পান, যখন দুর্ঘটনায় একটি পরিবার মুহূর্তে নিঃস্ব হয়ে যায়, তখন সেটি শুধু একটি দুর্ঘটনা থাকে না; সেটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। তাই ঈদযাত্রা নিরাপদ রাখা মানে শুধু যানবাহন সচল রাখা নয়; মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও অনুভূতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের উন্নয়নের নানা সূচক নিয়ে আমরা গর্ব করি। বড় বড় সেতু হয়েছে, এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ হয়েছে, মেট্রোরেল চালু হয়েছে। কিন্তু দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো গ্রামীণ সড়কের ওপর নির্ভরশীল। বাস্তবতা হলো, শহর থেকে মানুষ যত সহজে জেলা শহরে পৌঁছান, সেখান থেকে গ্রামের বাড়িতে যেতে গিয়ে তত বেশি দুর্ভোগে পড়েন।

অনেক গ্রামের সড়ক বহু বছর সংস্কার হয়নি। কোথাও ইট উঠে গেছে, কোথাও পিচ ঢালাই ভেঙে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। কিছু এলাকায় সড়কের দুই পাশ ভেঙে সরু হয়ে গেছে। রাতে এসব রাস্তায় চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আবার কোথাও অবৈধ দখল, হাট-বাজার কিংবা অপরিকল্পিত নির্মাণের কারণে সড়ক সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ঈদের সময় এসব সড়কে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফলে ছোট একটি ত্রুটিও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সাময়িক সংস্কার নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তবে ঈদের আগে অন্তত জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো মেরামত করা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ দুর্বল ব্যবস্থাপনা। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল। ঈদের সময় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, লাইসেন্সবিহীন চালক, অতিরিক্ত যাত্রী বহনএসব যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়। অনেক পরিবহন মালিক ঈদের আগে বাড়তি মুনাফার আশায় পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ গাড়িও রাস্তায় নামান। আবার কিছু চালক দীর্ঘসময় বিরামহীন গাড়ি চালান। ক্লান্তি ও অসাবধানতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে।

ফেরিঘাট ও মহাসড়কের ব্যবস্থাপনাও প্রায়ই বিশৃঙ্খল থাকে। কোথাও ট্রাফিক সমন্বয় নেই, কোথাও যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। ফলে মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের দায়িত্ব অনেক বেশি। হাইওয়ে পুলিশ, জেলা প্রশাসন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ- সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রভাব অনেক বেশি। স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা চাইলে অনেক সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব। একটি রাস্তার গর্ত ভরাট, অবৈধ দখল সরানো, যানজট নিরসন, যাত্রীদের সহযোগিতা- এসব কাজ স্থানীয় উদ্যোগেই অনেকাংশে করা যায়। ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যদি স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন যে ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে সবাইকে মাঠে থাকতে হবে, তাহলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তখন বিষয়টিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে নেবেন। দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত রাজনীতি। ঈদের সময় জনগণের কষ্ট লাঘব করতে পারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্যও একটি বড় মানবিক অর্জন হতে পারে।

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, কাউন্সিলরএরা জনগণের সবচেয়ে কাছের প্রতিনিধি। কিন্তু অনেক সময় স্থানীয় সমস্যাগুলো তাদের সক্রিয় উদ্যোগের অভাবে দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকে। ঈদের আগে প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলায় জরুরি সড়ক পরিদর্শন করা যেতে পারে। কোথায় গর্ত আছে, কোথায় ঝুঁকি বেশি, কোথায় যানজট তৈরি হতে পারে- এসব চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা যৌথভাবে কাজ করলে অন্তত সাময়িকভাবে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করে গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা যেতে পারে। রাতের বেলায় দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড লাগানো যেতে পারে।

ঈদযাত্রার সময় গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কোথায় যানজট, কোথায় রাস্তা ভেঙে গেছে, কোথায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি- এসব তথ্য নিয়মিত প্রচার করলে মানুষ সচেতন হতে পারেন। শুধু সমস্যা তুলে ধরা নয়, সমাধানের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। ইতিবাচক উদ্যোগগুলোও প্রচার করা উচিত। কোথাও স্থানীয় যুবকেরা রাস্তা মেরামত করছেন, কোথাও প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে- এসব খবর মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। গুজব কিংবা আতঙ্ক ছড়ানো নয়, বরং সঠিক তথ্য প্রচার করা উচিত। সব দায় সরকার বা প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। জনগণকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে ঝুঁকি নেওয়া, ছাদে চড়া, বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য করা- এসব থেকে বিরত থাকতে হবে।

অনেক সময় দেখা যায়, যাত্রীরা দ্রুত বাড়ি পৌঁছানোর জন্য চালকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। পরিবারে নিরাপদে পৌঁছানোই সবচেয়ে বড় বিষয়- এই সচেতনতা সবার মধ্যে তৈরি করতে হবে। প্রতিবছর ঈদের পর সংবাদমাধ্যমে দুর্ঘটনায় নিহত মানুষের সংখ্যা প্রকাশিত হয়। কোথাও বাস খাদে পড়ে পরিবার শেষ হয়ে গেছে, কোথাও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তরুণ প্রাণ ঝরে গেছে। ঈদের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকে। এই চিত্র আর দেখতে চায় না দেশ।

উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন মানুষের জীবন নিরাপদ হবে। একটি রাষ্ট্রের সফলতা শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে নয়; সাধারণ মানুষের যাত্রা কতটা নিরাপদ, সেটিও বড় সূচক। সরকার চাইলে অল্প সময়েও অনেক কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। যেমনজরুরি ভিত্তিতে ভাঙাচোরা সড়ক মেরামত, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে মনিটরিং, হাইওয়ে পুলিশ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার, ফেরিঘাট ও টার্মিনালে শৃঙ্খলা নিশ্চিত, বিশ্রাম ছাড়া দীর্ঘসময় গাড়ি চালানো বন্ধে ব্যবস্থা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা, স্বেচ্ছাসেবী টিম গঠন, জনগণকে সচেতন করতে গণমাধ্যম প্রচারণা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা অসম্ভব নয়। প্রয়োজন সদিচ্ছা, সমন্বয় ও দায়িত্ববোধ।

একটি উৎসবকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের মানবিক সক্ষমতারও পরীক্ষা হয়। মানুষ দেখতে চায়দুর্ভোগের সময় প্রশাসন কতটা পাশে দাঁড়ায়। শুধু কাগুজে নির্দেশনা নয়, বাস্তব মাঠপর্যায়ে কার্যকর উপস্থিতিই মানুষের আস্থা তৈরি করে। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রকৌশলী- সবাই যদি আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে অনেক সমস্যা কমে আসবে। জনপ্রতিনিধিরাও যদি জনগণের পাশে দাঁড়ান, তাহলে ঈদযাত্রা অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক হতে পারে।

ঈদ মানে আনন্দ, মিলন আর ভালোবাসা। এই আনন্দ কোনো দুর্ঘটনা, অব্যবস্থাপনা কিংবা অবহেলার কারণে ম্লান হোক- এটি কেউ চায় না। লাখো মানুষ যখন পরিবার-পরিজনের কাছে ফেরার জন্য পথে নামবেন, তখন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ জনগণ- সবাই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন, তাহলে একটি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা সম্ভব।

আমরা আশা করতে চাই, এবার আর মানুষকে দুর্ভোগের বিভীষিকা নিয়ে ঈদযাত্রা করতে হবে না। দেশের প্রতিটি সড়ক হোক নিরাপদ, প্রতিটি যাত্রা হোক নির্বিঘ্ন, প্রতিটি পরিবার পৌঁছে যাক আপনজনের কাছে সুস্থ ও নিরাপদভাবে।

পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের সবার জীবনে বয়ে আনুক শান্তি, সহমর্মিতা ও মানবিক দায়িত্ববোধের নতুন বার্তা।

লেখক: সংবাদকর্মী।

(ঢাকাটাইমস/২৩মে/মোআ)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
কালকিনিতে মহিলা মাদ্রাসায় হাতবোমা বিস্ফোরণে আহত ৪ শিক্ষার্থী
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের আংশিক কমিটিতে যারা পেলেন দায়িত্ব
বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ, সব সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত
ডিএমপির অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৫৯ জন গ্রেপ্তার, মামলা ৪৪
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা