প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, অতঃপর দুনিয়ার জীবন থেকে আখিরাতের পথে যাত্রা

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০
অ- অ+

ইসলামের দৃষ্টিতে মৃত্যু মানুষের জীবনের সমাপ্তি নয়; বরং দুনিয়ার জীবন থেকে আখিরাতের জীবনে প্রবেশের একটি ধাপ। কোরআন ও সহিহ হাদিসে মৃত্যুর অনিবার্যতা, নির্ধারিত সময়, মৃত্যুর পরের জীবন এবং মানুষের আমলের পরিণতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫)

একই আয়াতে জানানো হয়েছে, কিয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষকে তার কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে। অর্থাৎ মৃত্যু ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা কিংবা আলেম-সাধারণ—কাউকেই ছাড়বে না।

মৃত্যুর সময় নির্ধারিত

মানুষের মৃত্যু একটি নির্ধারিত সময়েই ঘটে। আল্লাহ বলেন, “কোনো প্রাণীই আল্লাহর অনুমতি ছাড়া মৃত্যুবরণ করতে পারে না; প্রত্যেকের মৃত্যুর সময় নির্ধারিত।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৪৫)

আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, প্রত্যেক জাতির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। সেই সময় এসে গেলে তা এক মুহূর্তও পিছিয়ে বা এগিয়ে দেওয়া যায় না। (সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:৩৪)

মৃত্যু থেকে পালানোর সুযোগ নেই

মানুষ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে অবস্থান করুক না কেন, মৃত্যু তাকে একসময় পেয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন, “তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদের পাকড়াও করবে।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৭৮)

এমনকি মানুষ সুদৃঢ় দুর্গের মধ্যেও অবস্থান করলেও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই।

মৃত্যুর সময় রূহ কবজ করা হয়

কোরআনে মৃত্যুর ফেরেশতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, “তোমাদের ওপর নিযুক্ত মৃত্যুর ফেরেশতা তোমাদের প্রাণ গ্রহণ করবে; তারপর তোমাদের তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।” (সূরা আস-সাজদাহ, ৩২:১১)

এ ছাড়া সূরা আয-যুমারের ৪২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ জানান, তিনি মৃত্যুর সময় মানুষের প্রাণ কবজ করেন এবং যারা মারা যায় তাদের প্রাণ নিজের কাছে রেখে দেন।

মৃত্যুর সময় কষ্ট অনুভূত হয়

কোরআনে মৃত্যুর কষ্টের কথাও উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ বলেন, “মৃত্যুর যন্ত্রণা সত্যিই এসে উপস্থিত হবে; এটাই সেই বিষয়, যা থেকে তুমি পালাতে চাইতে।” (সূরা কাফ, ৫০:১৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর সময়ও মৃত্যুযন্ত্রণা হয়েছিল বলে সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তাই মৃত্যুর কষ্ট হওয়াকে কোনো ব্যক্তির খারাপ হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

মৃত্যুর পর বারযাখের জীবন

ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, মৃত্যুর পর মানুষ সরাসরি কিয়ামতের চূড়ান্ত বিচারে প্রবেশ করে না। বরং কিয়ামত পর্যন্ত একটি মধ্যবর্তী অবস্থায় থাকে, যাকে বারযাখ বলা হয়।

আল্লাহ বলেন, “তাদের সামনে রয়েছে একটি পর্দা (বারযাখ), পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত।” (সূরা আল-মুমিনূন, ২৩:৯৯-১০০)

অর্থাৎ মৃত্যু ও কিয়ামতের মাঝেও মানুষের জন্য একটি বিশেষ পর্যায় রয়েছে।

মৃত্যুর পর সঙ্গে থাকে শুধু আমল

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মৃত ব্যক্তিকে তিনটি জিনিস অনুসরণ করে—তার পরিবার, তার সম্পদ এবং তার আমল। দু’টি ফিরে যায় এবং একটি তার সঙ্গে থেকে যায়। তার পরিবার ও সম্পদ ফিরে যায়, আর তার আমল তার সঙ্গে থেকে যায়।” (সহিহ আল-বুখারি, ৬৫১৪)

এই হাদিসে মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। মৃত্যুর পর পরিবার ও সম্পদ দুনিয়াতেই থেকে যায়; মানুষের সঙ্গে থাকে তার কর্ম।

মৃত্যুর পরও যেসব আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকে

মৃত্যুর সঙ্গে মানুষের নতুন আমল করার সুযোগ শেষ হয়ে যায়। তবে কিছু আমলের সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি ছাড়া—সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহিহ মুসলিম, ১৬৩১)

এ কারণে জীবিত অবস্থায় এমন কাজ করে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, যার উপকার মৃত্যুর পরও মানুষের মধ্যে অব্যাহত থাকে।

দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী

আল্লাহ বলেন, “দুনিয়ার জীবন তো প্রতারণাময় সামগ্রী ছাড়া আর কিছু নয়।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫)

এর অর্থ দুনিয়ার জীবন একেবারেই মূল্যহীন নয়। বরং ইসলাম দুনিয়াকে পরীক্ষার স্থান এবং আখিরাতকে স্থায়ী জীবনের স্থান হিসেবে তুলে ধরে। মানুষের সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি ও পদমর্যাদা দুনিয়াতেই থেকে যায়; তার সঙ্গে যায় তার আমল।

মৃত্যুর পর পুনরুত্থান ও হিসাব

মৃত্যুর পর মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায় না। কিয়ামতের দিন আল্লাহ মানুষকে পুনরুত্থিত করবেন। কোরআনে বলা হয়েছে, “তারপর তোমাদের অবশ্যই কিয়ামতের দিন পুনরুত্থিত করা হবে।” (সূরা আল-মুমিনূন, ২৩:১৬)

এ সময় মানুষের আমলের হিসাব নেওয়া হবে। আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে; আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করবে, সেও তা দেখতে পাবে।” (সূরা আয-যিলযাল, ৯৯:৭-৮)

মৃত্যুর আগে মানুষের বড় আফসোস

মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে মানুষ আরেকটু সময় পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করবে। আল্লাহ বলেন, কেউ মৃত্যুর মুখোমুখি হলে বলবে, “হে আমার রব! আমাকে যদি আর কিছু সময়ের জন্য অবকাশ দিতেন, তাহলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।” (সূরা আল-মুনাফিকূন, ৬৩:১০)

কিন্তু তখন আর ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। তাই জীবিত থাকতেই তওবা করা, নামাজ কায়েম করা, সদকা করা, মানুষের হক আদায় করা এবং নেক আমল করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া ইসলামের শিক্ষা।

মৃত্যুর মূল শিক্ষা

কোরআন ও হাদিসের আলোকে মানুষের জীবনকে সংক্ষেপে এভাবে সাজানো যায়—জন্ম → দুনিয়ার জীবন → মৃত্যু → বারযাখ → কিয়ামত → পুনরুত্থান → হিসাব → জান্নাত অথবা জাহান্নাম।

মৃত্যু কখন আসবে, তা মানুষ জানে না। তবে মৃত্যুর পর তার সঙ্গে কী যাবে, তা নির্ধারণের সুযোগ জীবিত অবস্থাতেই রয়েছে। তাই মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে গুনাহ, লোভ-লালসা, অন্যায় ও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন থেকে বিরত থাকার প্রেরণা দিতে পারে।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে মৃত্যুর আগে তওবা করার, নেক আমল করার এবং সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

(ঢাকাটাইমস/২৯ সেপ্টেম্বর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেক বৈঠক চলছে
আদাবরে বাড়ি দখলের চেষ্টা: পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার ১০, গুলিতে আহত ২
গুলশানে এনসিসি ব্যাংক ভবনের ৭ তলায় বিদেশি মদের গুদাম, ৬১ লাখ টাকার বিদেশি মদ উদ্ধার
তারেক রহমানের নেতৃত্বে ক্ষমতা এখন জনগণের আঙিনায়: কাদের গনি চৌধুরী