‘বন্দুকযুদ্ধে’ একরাম হত্যার তদন্তই হয়নি

আশিক আহমেদ
 | প্রকাশিত : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:৫২
মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে গত বছরের মে মাসে কক্সবাজারের টেকনাফে কাউন্সিলর একরামুল হকের মৃত্যুর ঘটনায় তুমুল আলোচনা হলেও এর তদন্ত করেনি সরকার। একরামকে হত্যার আগে মোবাইল ফোনালাপের অডিও রেকর্ড ফাঁসের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জোর দিয়ে বলেছিলেন, তদন্ত হবে, ইচ্ছা করে কেউ হত্যা করলে পার পাবে না।
 
 
কিন্তু কথা রাখেনি সরকার। প্রায় সাড়ে আট মাসেও তদন্তের কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। বাবাহারা একরামের দুই মেয়ে আর স্বামীহারা স্ত্রীর চাপা কান্না থামছেই না।
 
এর মধ্যে একরামুলের স্ত্রী গণমাধ্যমে বলেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে যেতে চান। কেউ যেন সেই সুযোগ করে দেয়। তিনি সরকারপ্রধানকে বলতে চান, তার স্বামীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে দুটি মেয়েকে যারা পিতৃহারা করেছে, তাদের যেন শাস্তি হয়।
 
গত বছরের মে মাসে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যে ২৬ মে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কে টেকনাফ পৌরসভার মেয়র যুবলীগের নেতা একরামুল হকের মৃত্যুর খবর আসে। তত দিনে সন্দেহভাজন মাদক কারবারিদের মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর এই মৃত্যু নিয়ে বাড়তি কোনো আলোচনা ছিল না।
 
তবে ছয় দিন পর এই যুবলীগ নেতার স্ত্রী আয়েশা বেগম কক্সবাজারে সংবাদ সম্মেলন করে তার স্বামীর মৃত্যুর আগের মুহূর্তে মোবাইল ফোনে তার সঙ্গে কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড প্রকাশ করেন। এতে কথিত বন্দুকযুদ্ধের যে বর্ণনা দিয়েছিল র‌্যাব, তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। একরামুলের কথা বলতে বলতে হঠাৎ গুলির শব্দের পর তার জীবনের চাকা থেমে যাওয়ার অডিও রেকর্ডটি ছিল একেবারেই মর্মান্তিক। এরপর তার স্ত্রী-কন্যাদের কান্নার রোল ছুঁয়ে যায় গোটা দেশবাসীকে।    
 
এই ঘটনা কক্সবাজার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদেরও ক্ষুব্ধ করে। জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কক্সবাজারের পৌর মেয়র মাহাবুবুর রহমান চৌধুরী সে সময় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি দিয়ে আকুতি জানান। শেখ হাসিনাকে মা সম্মোধন করে তিনি লেখেন, ‘মা, এখনো সময় আছে, লাগাম টেনে ধরো তাদের।’ 
১ জুন রাজধানীতে এক ইফতার পার্টিতে এ বিষয়ে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। জানান অডিওটির তদন্ত হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
 
কীভাবে তদন্ত হবে, সেটিও জানান সেদিন মন্ত্রী। বলেন, ‘বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে তা তদন্ত করা হয়। একরামের ঘটনার ব্যাপারেও ঠিক একইভাবে তদন্ত করা হবে। ম্যাজিস্ট্রের যদি কোনো আলামত পেয়ে থাকেন, ম্যাজিস্ট্রেট যদি মনে করেন ইনকোয়ারি করা দরকার, তাহলে ইনকোয়ারি হবে, জুডিশিয়াল তদন্ত থেকে শুরু করে যা যা দরকার সবই হবে।’
 
‘যদি এ ধরনের ঘটনা ইচ্ছা করে ঘটানো হয়ে থাকে বা যদি কেউ কোনো স্বার্থে এই ঘটনা ঘটায় বা যদি কেউ প্রলুব্ধ করে থাকে, তাহলে এর তদন্ত হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। অন্যায় হলে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান আছে। সবার জন্য আইন সমান।’
 
তবে সেই তদন্ত এখনো শুরুই হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন। ঢাকা টাইমসকে তিনি বলেন, ‘কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটিই গঠন করা হয়নি। ওই ঘটনা যেমন ছিল তেমনই রয়েছে।’ 
 
একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম দুই শিশুকন্যা তাহিয়া হক ও নাহিয়ান হককে নিয়ে চট্টগ্রামে বাবার বাসায় থাকেন। মাঝেমধ্যে এলাকায়ও আসেন। তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়ায় তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
তবে সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে তার বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি আর কিছু চাই না, শুধু একবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাই। রহস্যটা জানতে চাই। কী ছিল আমার স্বামীর অপরাধ? কী অপরাধ করেছিল আমার অবুঝ দুটি বাচ্চা? আমি কী অপরাধ করেছিলাম? কেন আমার নিরপরাধ স্বামীকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হত্যা করা হলো? একবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এই প্রশ্নগুলোর জবাব চাই।’ 
 
জানতে চাইলে টেকনাফ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) দোহা ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘একরামের নামে থানায় কোনো মাদক বা জিআর মামলা নেই। তবে ঘটনার পর র‌্যাব বাদী হয়ে হত্যা, অস্ত্র, ইয়াবাসহ তিনটি মামলা করেছে। এর চেয়ে বিস্তারিত বলতে পারব না।’
 
একরামুলের স্ত্রী তার অডিও রেকর্ডটি প্রকাশের পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক টেকনাফে নিহত কাউন্সিলরের বাসায় গিয়েছিলেন। তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘তখন আমরাও সরকারকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে বলেছিলাম। তবে কী করেছে সেটা আমার জানা নেই। তখন যেহেতু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য বলেছিলেন, তাই আপনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাউকে জিজ্ঞাসা করুন।’
 
সরকারের পাশাপাশি সে সময় এই ঘটনা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছিল র‌্যাবও। বাহিনীটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান গত ১ জুন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘একটি অডিও প্রকাশিত হয়েছে। অডিওটা শুনেছি। সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরে বিস্তারিত বলতে পারব।’
 
র‌্যাব কী তদন্ত করেছে জানতে মুফতি মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে গতকাল তিনি বলেন, ‘এটা অনেক আগের কথা তো। আমার ঠিক খেয়াল নেই।’
একরামুলের মৃত্যুর পর যে বর্ণনা দেয় র‌্যাব
 
একরাম নিহত হয়েছিলেন র‌্যাব-৭-এর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’। আর তার মৃত্যুর পর র‌্যাবের কক্সবাজার ক্যাম্পের অধিনায়ক মেজর রুহুল আমিন জানান, কক্সবাজারের টেকনাফ থানাধীন নোয়াখালীপাড়া এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে র‌্যাব-৭-এর একটি দলের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পরে ঘটনাস্থল থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক কারবারি একরামুল হকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে ১০ হাজার পিস ইয়াবা, একটি পিস্তল, একটি ওয়ান শ্যুটারগান, ছয় রাউন্ড গুলি ও পাঁচটি খালি খোসা উদ্ধার করা হয়।
 
একরামুলের স্ত্রীর যে অভিযোগ 
কক্সবাজার প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে একরামুলের মৃত্যুর আগে তার সঙ্গে কথোপকথনের চারটি অডিও রেকর্ড সাংবাদিকদের শোনান স্ত্রী আয়েশা বেগম। সব মিলিয়ে ১৪ মিনিট ২২ সেকেন্ডের হৃদয়বিদারক অডিওতে কয়েকজনের কণ্ঠ, গুলির শব্দ আর চিৎকার শোনা যায়। এই রেকর্ড শুনিয়ে একরামের স্ত্রী অভিযোগ করেন, তার স্বামীকে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ‘পরিকল্পিতভাবে’ হত্যা করা হয়েছে।
অডিওতে যা ছিল
ফোনে কথা চলছে...
পুরুষ কণ্ঠ: আম্মু! অপর প্রান্ত থেকে, জে..।
পুরুষ কণ্ঠ: তোমার আম্মু কোথায়?
অপর প্রান্ত থেকে: আছে।
পুরুষ কণ্ঠ: মেজর সাহেবে ডাকছিল। অস্পষ্ট কথা......। তোমার আম্মুকে বলিও।
অপর প্রান্ত থেকে: আসতে দেরি হবে যে?...এরপর ফোনের লাইন কেটে যায়।
আবার ফোন রিং হয়-
মেয়ের কণ্ঠ: হ্যালো আব্বু, তুমি কেথায়?
পুরুষ কণ্ঠ: আমি টিএনও অফিসে যাচ্ছি তো, আমি চলে আসব আম্মু।
মেয়ের কণ্ঠ: কতক্ষণ লাগবে?
পুরুষ কণ্ঠ: বেশিক্ষণ লাগবে না। আমি চলে আসব ইনশাল্লাহ। ঠিক আছে? রাখলাম...। এরপর ফোনের লাইন কাটার শব্দ।
আবার ফোন....
মেয়ে: হ্যালো আব্বু! 
পুরুষ কণ্ঠ: জি আম্মু। আম্মু আমি হ্নীলা যাচ্ছি।
মেয়ে: কেন?
পুরুষ কণ্ঠ: জরুরি কাজে যাচ্ছি।......মেয়ে আবার জিজ্ঞেস করে, কেন?
পুরুষ কণ্ঠ: যাচ্ছি আম্মু.....(কান্নার স্বরে কথা)।
মেয়ে: যাচ্ছ, তুমি কান্না করতেছ যে...?
এরপর মেয়ের কাছ থেকে ফোন নিয়ে...নারীর কণ্ঠ: হ্যালো... হ্যালো...লাইন কেটে যায়।
এরপর আবার ফোন
নারী কণ্ঠ: ফোন রিং হচ্ছে আর কথা বলছে... আল্লাহ একবার মোবাইলটা দে, আল্লাহ একবার মোবাইল দিয়া কথা কইতে দে...আল্লাহ। ফোন রিসিভ হওয়ার পর..হ্যালো কে (নারী কণ্ঠ)? হ্যালো কে? ওপাশ থেকে অনুচ্চস্বরে কথাবার্তা...
 
হ্যালো আমি কমিশনারের সাথে কথা বলতে চাচ্ছি। হ্যালো কে ওইটা...ফোন রিসিভ করছে ওইটা কে...অপর পাশ থেকে অনুচ্চস্বরে কথা। আমি ওনার মিসেস বলতেছি।
অপর পাশ থেকে আওয়াজ আসছে...এটা বলছ....জি। জড়িত, না?...জি...অনুচ্চ কথা...ট্রিগার টানার শব্দ....গুলির আওয়াজ...ও করে চিৎকারের শব্দ...গোঙানির আওয়াজ.....আবার গুলির শব্দ।
 
এ সময় ফোনের এপাশ থেকে ও আল্লাহ বলে চিৎকার করে ওঠেন নারী। কান্না করে চলছেন মা-মেয়ে...আমার জামাই কিছু করে নাই। আমরা বিনা দোষী। আমার হাজব্যান্ড কিছু করে নাই। ফোনের অপর পাশ থেকে অস্পষ্ট কথাবার্তা।....শুয়োরের বাচ্চা বলে গালাগালি...বাঁশির শব্দ...ওই কুত্তার বাচ্চা ধর...ওই ধর ওই ধর...
এপাশে নারী কান্না করে বলে চলছেন...আপনারা কোথায়...আমার জামাই কিছু করে নাই...।
 
অডিও রেকর্ডের বাকি আওয়াজে সাইরেনের শব্দ আর অস্পষ্ট এবং অনুল্লেখযোগ্য নানা কথাবার্তা আছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

অপরাধ ও দুর্নীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :